০৫:৫২ পি.এম
পরিবার আছে, পরিচয় আছে এবং ভারতীয় পাসপোর্টও রয়েছে। এইসব থাকা সত্ত্বেও, জীবনের শেষ ঠিকানায় প্রবীর মণ্ডল পৌঁছাতে পারেননি।
মৃত্যুর প্রায় পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর মরদেহ এখনো রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের হিমঘরে নম্বরবন্দি অবস্থায় পড়ে রয়েছে। প্রবীর মণ্ডলের শেষকৃত্যের বিষয়টি স্বজনদের অনাগ্রহ, সীমান্ত ও কূটনৈতিক জটিলতায় এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অদূরত্বে আটকে রয়েছে।
প্রবীর মণ্ডল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নিমচা মৈত্রী স্ট্রিটের এম আলম বাজার এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ৪১ বছর এবং বাবার নাম মহাদেব মণ্ডল।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
সূত্র জানাচ্ছে, ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর থেকে প্রবীর মণ্ডলের মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে সংরক্ষিত আছে। দীর্ঘ এই সময়ে মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। একইসাথে আইনি ও প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া মরদেহের সৎকারও করা যাচ্ছে না।
পুলিশ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা মরদেহ গ্রহণে আগ্রহ দেখায়নি, এমনটাই জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মরদেহ হস্তান্তর কিংবা সৎকারের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে একটি মরদেহ হিমঘরে থাকায় নানা প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।
ফেসবুকে পরিচিত নারী বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসে প্রবীর মণ্ডল মৃত্যুবরণ করেন। মামলার নথি ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের নভেম্বরে ফেসবুকে পরিচিত এক নারী বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে ঢাকা থেকে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রামে যান প্রবীর মণ্ডল। সেখানে অবস্থানকালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে স্থানীয়রা তাঁকে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় পাটগ্রাম থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ২০২১ সালের ১০ নভেম্বর প্রবীর মণ্ডলের মরদেহের ময়নাতদন্তের জন্য একটি মেডিকেল লিগ্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। এরপর থেকেই মরদেহটি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
মৃত্যুর পর প্রবীর মণ্ডলের পোশাক তল্লাশি করে একটি ভারতীয় পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়। পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০১৭ সালের ৩ মার্চ তিন মাসের ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। পরে ২০১৮ সালের ১৬ মার্চ বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে তিনি ভারতে ফিরে গেছেন। তবে এরপর কীভাবে তিনি পুনরায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন, সে বিষয়ে মামলার নথিতে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
লালমনিরহাট জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে ২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরে পাঠানো একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ততদিনে মরদেহে পচন শুরু হয়েছিল। সেই চিঠিতে বিজিবির মাধ্যমে বিএসএফের সঙ্গে বৈঠক করে মরদেহ ভারতে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ হয়েছিল। কিন্তু এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রমজান আলী বলেন, প্রবীর মণ্ডলের পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু তাঁরা এখনও মরদেহ গ্রহণে আগ্রহ দেখাননি। তিনি জানান, "বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।" প্রবীর মণ্ডলের ছোট ভাই সুবীর মণ্ডলের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে কিন্তু পরিবার থেকে মরদেহ নিতে আগ্রহ নেই।
হাসপাতালের হিমঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুলাল বসুনিয়া জানান, প্রবীর মণ্ডলের মরদেহ এখনো হিমঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এলে ধর্মীয় রীতিনীতির ভিত্তিতে মরদেহের সৎকারের ব্যবস্থা করা হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে, এত দিন ধরে একটি মরদেহ হিমঘরে সংরক্ষণ করা তাদের জন্যও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। রমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক আব্দুল মোকাদ্দেম জানিয়েছেন যে, প্রবীর মণ্ডল হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। মরদেহটি পুলিশর অনুরোধে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নাগরিক সমাজ। সুজন রংপুর জেলা সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেছেন, "একজন মৃত ব্যক্তিরও মানবাধিকার রয়েছে। দীর্ঘদিন মরদেহটি পড়ে থাকায় মানবিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।" তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের উচিত বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে একটি সমাধানে পৌঁছানো।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
শেষত, প্রবীর মণ্ডলের জীবন শেষ অধ্যায় শুরু হয়েছিল পাটগ্রামে অসুস্থ হওয়ার মাধ্যমে। এত কর্মযজ্ঞের পরও মরদেহটি পরিবারে পৌঁছাতে পারেনি। পোশাকে পাওয়া পাসপোর্ট তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেছে, কিন্তু কোনোরকম শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা হয়নি। ২০২১ সালের ৮ থেকে ২০২৬ সাল—এই দীর্ঘ সময়ে রংপুর মেডিকেল কলেজের হিমঘরে তাঁর মরদেহ অবাঞ্ছিত হয়ে পড়ে আছে। জীবন জীবন্তে তাঁর ছিল স্বজন, পরিচিতি; মৃত্যুর পরেও তাঁর জন্য যেন নির্ধারিত হয়নি শেষ ঠিকানা। সংশ্লিষ্টদের এখন আশা, মানবিক ও প্রশাসনিক বিবেচনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চয়তার এই অবসান ঘটানো হবে এবং প্রবীর মণ্ডল তাঁর প্রাপ্য শেষ বিদায় পাবেন।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন