০৩:৫৫ পি.এম
কিউবার প্রধান ক্যান্সার হাসপাতালে শয্যাশায়ী অবস্থায় রয়েছেন ৬৪ বছর বয়সী রোসা ভ্যালেন্তিনা পেরেজ, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে। দুই বছর আগে তার স্তন ক্যান্সারের অস্ত্রোপচার হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই পায়ের চলাচলের ক্ষমতা কমে যাওয়ায় চিকিৎসকেরা আশঙ্কা করছেন, ক্যান্সারটি মেরুদণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে কি না। তাই জানা প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে তার সিটি স্ক্যান করানো।
কিন্তু হাভানায় বর্তমানে সচল মাত্র একটি সিটি স্ক্যান মেশিন রয়েছে, সেটিও শহরের নিউরোলজি হাসপাতালে। ফলে পেরেজ দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকায় আটকে রয়েছেন।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
তিনি এএফপিকে বলেছেন, ‘এই যন্ত্রণা কতটা অসহনীয়, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। জানি, প্রতিটি দিন আমার জীবন থেকে সময় কেড়ে নিচ্ছে। অথচ হাসপাতাল থেকে শুধু বলা হচ্ছে, ‘দেখি, কবে আপনার স্ক্যান করা যাবে।’
পেরেজের জন্ম হয়েছিল সেই সময়ে, যখন ফিদেল কাস্ত্রো যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শাসককে উৎখাত করে কিউবায় সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। বিপ্লবের অন্যতম বড় অর্জন ছিল সবার জন্য বিনামূল্যে ও উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা প্রদান।
এক সময় কিউবার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছিল দেশের গর্ব এবং কাস্ত্রোর সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসক পাঠিয়ে স্বাস্থ্যসেবার সাফল্য তুলে ধরেছিল। কিন্তু বর্তমানে স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ার দিকে।
কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কা, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি সংকট, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের গত ছয় মাসের জ্বালানি অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
-নষ্ট ও অচল চিকিৎসা সরঞ্জাম-
দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ওষুধের তীব্র সংকট এবং কম বেতনের কারণে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিদেশে চলে যাওয়ায় কিউবার হাসপাতালগুলোতে চরম সংকট তৈরি হয়েছে।
সরকার ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনি রোগ এবং মা ও শিশুস্বাস্থ্যের খাতকে অগ্রাধিকার দিলেও এসব বিভাগের পরিস্থিতিও গুরুত্ববহ।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অনকোলজি অ্যান্ড রেডিওবায়োলজি (আইএনওআর)-এ রেডিওথেরাপির জন্য বর্তমানে অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক লুইস এদুয়ার্দো মার্টিন এএফপিকে জানান, যন্ত্রপাতির প্রায় ৮০ শতাংশই পুরোনো, বিকল কিংবা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘অনেক সময় আমরা রোগীকে ওষুধ দিচ্ছি। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে না পারায় নিশ্চিত নই যে ওষুধ ঠিকমতো কাজ করছে কি না। কারণ আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপকরণ বা পরীক্ষার যন্ত্রপাতি নেই।’
-বাড়ছে শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি-
চিকিৎসায় অগ্রাধিকার পাওয়ার সত্ত্বেও এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শিশুরা হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সংকট শুরুর আগে শিশু ক্যান্সার রোগীদের বেঁচে থাকার হার ছিল ৮৫ শতাংশ, যা বর্তমানে ৬৫ শতাংশে নেমেছে।
আইএনওআর-এর শিশু ক্যান্সার বিভাগের প্রধান মারিউস্কা ফোর্তেজা বলেন, যন্ত্রপাতি ও জ্বালানির অভাবে হাসপাতালগুলোর মধ্যে রক্তের নমুনা পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অনেক জরুরি রক্ত পরীক্ষা নিয়মিত করতে সমস্যা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আপনি জানেন, শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব। তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও ভালো। কিন্তু কিছুই করতে পারছেন না। এটা চিকিৎসকদের জন্য ভীষণ কষ্টের।’
এমন পরিস্থিতিতে কিউবার দীর্ঘদিনের নষ্ট যন্ত্রপাতি মেরামত করে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন প্রযুক্তিবিদেরা।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে ৫ বিষয়ে অগ্রাধিকার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর
মেরামতকর্মী আলেক্সিস আমাদো দোমিঙ্গেজ বলেন, ‘অনেক সময় রোগীর ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরু করার জন্য আমাকে রাত ১২টা বা ২টায় হাসপাতালে এসে যন্ত্রপাতি মেরামত করতে হয়।’
-হৃদরোগ চিকিৎসার সংকট-
হৃদরোগ চিকিৎসাও মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিওলজি অ্যান্ড কার্ডিওভাসকুলার সার্জারির চিকিৎসক হোসে এস্তেবান আব্রেউ জানান, ২০১৮ সালে বছরে যেখানে ৪০০টির বেশি হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার হতো, বর্তমানে সে সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র প্রায় ১০০টিতে।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান আতঙ্ক, তিন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা
এছাড়া প্রায় ১৩০ জন রোগী পেসমেকার প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
হাসপাতালের রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে অ্যানেসথেশিয়া মেশিন, হার্ট-লাং বাইপাস মেশিন, হার্ট মনিটরসহ অসংখ্য বিকল যন্ত্র মেরামতের অপেক্ষায় পড়ে আছে। অনেক যন্ত্র আবার অন্য যন্ত্র সচল রাখতে খুচরা যন্ত্রাংশ হিসেবে খুলে নেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তিবিদ লুইস আলেক্সিস ডানকান বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিনই নতুন নতুন উপায় বের করতে হয়। উদ্ভাবনী চিন্তা আর সীমিত সম্পদ দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।’
চিকিৎসার সময় কমানো মানেই আয়ু কমে যাওয়া। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই উদ্ভাবনী উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।
হাভানার প্রায় ৮০ শতাংশ চিকিৎসা সরঞ্জাম মেরামত করা হয় যে কর্মশালায়, সেখানে বিকল ইনকিউবেটর ও নবজাতকের ভেন্টিলেটরের স্তূপ জমে আছে।
অন্যদিকে জনবল সংকট পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। অতি স্বল্প বেতন এবং কিউবান মুদ্রার পেসোর মূল্যহ্রাসের কারণে বহু চিকিৎসক, নার্স ও প্রযুক্তিবিদ সরকারি চাকরি ছেড়ে বিদেশে বা অন্য পেশায় চলে গেছেন।
হাভানার বিখ্যাত হারমানোস আমেইহেইরাস হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ইউনিটেও একই চিত্র বিরাজ করছে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন