০৭:০১ পি.এম
একটি পরিবার সোনালি কমলা এবং মাল্টা বিক্রি করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন আপাতভাবে দেখে আসছিল। আট বছরের শ্রম, পরিচর্যা, বিনিয়োগ এবং ঋণের চাপ পেরিয়ে যখন তারা ফলনের পালা গুনছিল, ঠিক তখনই বন বিভাগের করাত এসে বিধ্বস্ত করে তাদের স্বপ্নের বাগান।
অভিযোগ উঠেছে, অবৈধ দখল উচ্ছেদের নামে ১ হাজার ২০০টি কমলা ও মাল্টা গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে গেছে বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া একটি বাগান। বর্তমানে বাগানের গাছগুলো নেই, কেবল কাটা গাছের স্তূপ পড়ে আছে। পরিবারের মধ্যেই যে ভবিষ্যৎ অবস্থান করেছিল, তা যেন এক নিমিষেই ভেঙে পড়েছে।
এ ঘটনা ঘটেছে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি বন রেঞ্জের আদমপুর বন বিটের কালিঞ্জি এলাকায়। সম্প্রতি বন বিভাগের এই উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা এবং বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
প্রায় আট বছর আগে সে পাহাড়ি এলাকায় কমলা ও মাল্টার চারা রোপণের কাজ শুরু করেন সালমা বেগম এবং তার স্বামী আলিম উল্লাহ। ধীরে ধীরে এটি বিশাল ফলের বাগানে রূপ নেয়। বছরের পর বছর শ্রম, পরিচর্যা এবং বিনিয়োগের পর তারা চলতি মৌসুমে প্রথম বড় পরিসরে ফলনের আশা করেছিলেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, মাত্র তিন মাস পর তারা বাগান থেকে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকার কমলা বিক্রি করতে পারতেন। ইতোমধ্যে গাছগুলোর মধ্যে হাজার হাজার ফল ধরে ছিল, কিন্তু ফল পরিপক্ব হওয়ার আগেই উচ্ছেদ অভিযানে ১ হাজার ২০০টি গাছ কেটে ফেলা হয়।
বাগানের মালিক আলিম উল্লাহ অভিযোগ করেন, বন বিভাগের লোকজনকে চাঁদা না দেওয়ায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বাগান ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি বলেন, “বন বিভাগের অনুমতি নিয়েই ২০১৮ সালে আমরা কমলা ও মাল্টার বাগান শুরু করি। আট বছর ধরে শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করেছি। যখন ফলন এসেছে, তখনই গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। চাঁদা না দেওয়ার কারণে এমন সর্বনাশ করা হয়েছে।”
একই অভিযোগ করেন সালমা বেগম, যিনি দাবি করেন, আশপাশে আরও বাগান বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র তাদের বাগানটিই ধ্বংস করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের মত, গাছ কাটার পাশাপাশি বাগানের সেচকাজে ব্যবহৃত মেশিনও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে, ফলে তাদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জীবিকা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
তবে বন বিভাগ চাঁদা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধভাবে দখল করে গড়ে ওঠা বাগান উচ্ছেদের অংশ হিসেবেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
কমলগঞ্জ রাজকান্দি রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক প্রীতম বড়ুয়া বলেন, “সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধ দখল উচ্ছেদের জন্য অভিযানের আয়োজন করা হয়েছে। চাঁদা দাবির অভিযোগ সত্য নয়।”
তবে এ ঘটনায় বহুল প্রশংসিত প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবার দাবি করে, তারা ২০১৮ সালে বন বিভাগের অনুমতি নিয়েই বাগান গড়ে তুলেছিলেন। যদি বাগানটি অবৈধ হয়ে থাকে, তাহলে আট বছর ধরে সেটি কীভাবে টিকে থাকল? স্থানীয়দের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে, একটি ফলজ গাছ ফলন দেওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। আট বছর পর যখন বাগানে ফলন আসছে, তখন কেন উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলো? আশপাশের অন্যান্য বাগানের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, এ নিয়েও সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে আলিম উল্লাহর বাগানে কমলা ও মাল্টার গাছ কাটার ঘটনাটি প্রশাসনের নজর আকর্ষণ করে। এ ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলে এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পর্যন্ত পৌছায়। প্রকৃত ঘটনা তদন্তে সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বৃহস্পতিবার তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমান, সদস্য সিলেট বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক আব্দুর রহমান এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শাহিনা আক্তার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
কমিটির প্রধান আশরাফুর রহমান বলেন, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। সবকিছু পর্যালোচনা করে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে। এরপর সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
গুরুত্বপূর্ণ, গত ১৬ জুলাই মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি বন রেঞ্জের আদমপুর বন বিটের কালিঞ্জি এলাকায় বন বিভাগ সরকারি জমি উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে কৃষকের ১২০০ ফলধরা কমলা ও মাল্টা গাছ কেটে ফেলে।
এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, বাগানটি কিভাবে গড়ে উঠেছিল, বন বিভাগের অনুমতির বিষয়টি কি ছিল, উচ্ছেদ অভিযান আইনসঙ্গত ছিল কিনা এবং চাঁদা দাবির অভিযোগের সত্যতা, সব কিছু নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসবে।
একটি পরিবারের আট বছরের শ্রম, স্বপ্ন এবং বিনিয়োগ এখন কাটা গাছের স্তূপে পড়ে আছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সৃষ্টি হচ্ছে। যদি বাগানটি অবৈধ হয়ে থাকে, তাহলে তা আট বছর ধরে কীভাবে টিকে থাকল? এবং ফলন আসার ঠিক আগমুহূর্তে কেন বন বিভাগের করাত নামানো হলো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন খুঁজছেন ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং তদন্ত কমিটি।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসআরবি পরিচয়ে ব্যবসায়ীকে অপহরণ, পুলিশ উদ্ধার অভিযান
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন