মঙ্গলবার, ১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
০৪:১২ পি.এম
বাংলা চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক অতিক্রান্ত হলেও, তার মৃত্যু সংক্রান্ত রহস্য, আলোচনা এবং বিতর্ক থামেনি। এই বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে একটি বই, যা প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই আদালতের নির্দেশে নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
‘সালমান শাহ, নক্ষত্রের আত্মহত্যা’ শিরোনামের বইটি সাংবাদিক রবি আরমান লিখেছেন। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিষয়টি বইটির বিরুদ্ধে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করে।
বইটি প্রকাশের পর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী এর বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি জানান। তিনি অভিযোগ করেন, বইটিতে সালমান শাহর মৃত্যু সম্পর্কে অসত্য এবং মানহানিকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এ কারণে তিনি লেখক ও প্রকাশকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন।
মামলার প্রেক্ষিতে আদালত বইটির বিক্রি ও বিতরণ বন্ধের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বাজারে থাকা কপিগুলো বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়। এর ফলে প্রকাশের অল্প সময়ের মধ্যে বইটি নিষিদ্ধ হয়ে দুর্লভ গ্রন্থে পরিণত হয়।
একজন তৎকালীন জ্যেষ্ঠ বিনোদন সাংবাদিকের মতে, বইটিতে সালমান শাহর মৃত্যুর ক্ষেত্রে ‘আত্মহত্যা’ শব্দটি ব্যবহারের কারণেই পরিবারের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি আপত্তি ওঠে। কারণ সালমান শাহর মা বরাবরই দাবি করে আসছেন যে, তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছিল।
বইটির প্রচ্ছদের পেছনের লেখায় সালমান শাহকে বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে উদিত এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে তার অকালমৃত্যুর বেদনা এবং মৃত্যু ঘিরে রহস্যের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকাশের সময় বইটির প্রচারণায় বলা হয়েছিল, এতে সালমান শাহর ব্যক্তিজীবনের নানা অজানা অধ্যায়ের পাশাপাশি সে সময়ের ঢাকাই চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিভিন্ন ঘটনা উঠে এসেছে। ফলে বইটি নিয়ে পাঠক ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল।
কিন্তু আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে বইটির স্বাভাবিক বিপণন সম্ভব হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কপি বিরল হয়ে ওঠে। তবুও সালমান শাহর মৃত্যু রহস্য নিয়ে মানুষের আগ্রহ অব্যাহত থাকায় বইটিকে ঘিরে কৌতূহল আজও রয়ে গেছে।
সালমান শাহর মৃত্যুর এত বছর পরেও তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে আলোচনা থামেনি। সেই দীর্ঘ বিতর্কের ইতিহাসে ‘সালমান শাহ, নক্ষত্রের আত্মহত্যা’ বইটি এখনো একটি আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
ঢাকা, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ : গত সপ্তাহে হিমালয় অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যার কারণে প্রাণহানির ঘটনার প্রেক্ষাপটে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ মন্তব্য করেছেন যে, এটি কোনো ‘সাধারণ বন্যা’ নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলস্বরূপ এই বিপর্যয় ঘটেছে।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
এই খবরটি বার্তা সংস্থা এএফপি’র মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
চীন-নেপাল সীমান্তে একটি হিমবাহ ধসে বরফশীতল পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল ঢল নেমে এসেছে। এই ঘটনায় অন্তত ৯৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। কাঠমান্ডু জানিয়েছে, দুর্যোগের পর পুনর্গঠনে ‘কয়েক বিলিয়ন ডলার’ ব্যয় হতে পারে।
সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ একটি পোস্টে উল্লেখ করেন, ‘রাসুয়া এলাকায় ভোতে কোশি নদীর বন্যা কোনো সাধারণ বন্যা ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘হিমালয় অঞ্চলে তুষার ও বরফের বিশাল স্তর ধসে পড়ার ফলে এই দুর্যোগের সৃষ্টি হয়েছে। এটি ছিল এ অঞ্চলের ভয়াবহ বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ।’
হিমবাহ ধসের সঠিক কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন যে, বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে, যার ফলে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয়ের বরফও আগের তুলনায় দ্রুত গলছে।
শাহ বলেন, ‘এই ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হিমালয় অঞ্চলে আমরা যেসব ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছি, সেগুলোও বাড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাই এই অঞ্চলের প্রতি আমাদের সতর্ক নজর রাখতে হবে।’
নেপালের প্রায় ৩ কোটি মানুষের মধ্যে অধিকাংশই গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন। শিল্পোন্নত ও ধনী দেশগুলোর বিপুল কার্বন নিঃসরণের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য নেপালের অবদান খুবই সামান্য। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের বড় একটি অংশ দেশটিকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শাহ বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেপালের এ বিষয়টিকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা উচিত।
তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমরা যেসব দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছি, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জোরালোভাবে আমাদের দাবি তুলে ধরার এখনই সময়।’
বৃহত্তর হিমালয় ও হিন্দুকুশ পর্বতমালা থেকে নেমে আসা হিমবাহের পানি পাহাড়ি অঞ্চলের প্রায় ২৪ কোটি মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎস। একই পানি নিচের দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নদী অববাহিকায় বসবাসকারী আরও প্রায় ১৬৫ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২০২৩ সালে নেপাল সফরের সময় সতর্ক করে বলেছিলেন, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে এবং ‘পৃথিবীর ছাদ ধসে পড়ছে’।
বুধবারের ভয়াবহ দুর্যোগের পর জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিয়েল মন্তব্য করেন, এই ঘটনা ‘পাহাড়ি পরিবেশ কতটা নাজুক হতে পারে, তার এক ভয়াবহ স্মারক’।
এদিকে, বড় ধরনের এই দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালের সম্পদ সীমিত থাকায় দেশটির অর্থনীতি ইতোমধ্যেই চাপের মুখে রয়েছে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
ঢাকা, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক একটি স্টার্টআপ-এর সঙ্গে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি সম্পন্ন করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এবং এনভিডিয়ার সমর্থনপুষ্ট।
এই চুক্তি অ্যানথ্রপিকের জন্য একটি নতুন সংযোজন, যা উন্নত কম্পিউটিং সক্ষমতার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছে।
এএফপি সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে জানা যায়, সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক এআই প্রতিষ্ঠানটি ল্যামডার সঙ্গে ছয় বছরের চুক্তি করেছে। ল্যামডা ক্যালিফোর্নিয়ার সান হোসে থেকে ক্লাউড কম্পিউটিং সেবা প্রদান করে।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিটকয়েন মাইনিং ও ডেটা সেন্টার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হাট ৮ যে ডেটা সেন্টার নির্মাণ করছে, সেখানে ল্যামডা কম্পিউটিং সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করবে।
অ্যানথ্রপিক টেক্সাসে হাট ৮-এর নির্মাণাধীন একটি ডেটা সেন্টার থেকে কম্পিউটিং সুবিধা গ্রহণ করবে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সোমবার জানিয়েছে, অ্যানথ্রপিক এবং ল্যামডা—দুই প্রতিষ্ঠানেই বিনিয়োগকারী এনভিডিয়া হাট ৮-এর কাছ থেকে ডেটা সেন্টারটি লিজ নেবে।
এরপর ল্যামডা ওই ডেটা সেন্টার ব্যবহারের জন্য এনভিডিয়াকে একটি অপ্রকাশিত অর্থ পরিশোধ করবে।
সম্প্রতি অ্যানথ্রপিক লন্ডনভিত্তিক ক্লাউড সেবা প্রতিষ্ঠান এনস্কেলের সঙ্গে ছয় বছরের একটি চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
এএফপির একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ওই চুক্তির আওতায় অ্যানথ্রপিক পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় এনস্কেলের একটি স্থাপনায় কম্পিউটিং সক্ষমতা পাবে।
শুধুমাত্র চলতি বছরেই অ্যানথ্রপিক কমপক্ষে ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন কম্পিউটিং চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
গ্রাহক আকর্ষণ ও আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে এআই প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই’র মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। উভয় প্রতিষ্ঠানই শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গত কয়েক বছরে এআই মডেল নির্মাতাদের মধ্যে গ্রাহক এবং কম্পিউটিং সক্ষমতা পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে, যার ফলে চিপ এবং উন্নত কম্পিউটিং শক্তির চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে, এই বাড়তি চাহিদার কারণে ভোক্তা ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন খাতে চিপ সরবরাহের বৈশ্বিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
ঢাকা, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালে এক উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইনসভা নির্বাচনে (সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ এসেম্বলী) স্বরাজ পার্টির হয়ে গণসংযোগের উদ্দেশ্যে গাজীপুরের জয়দেবপুরে আসেন।
তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও বাকেরগঞ্জ সমন্বয়ে গঠিত বিশাল আসনের মুসলিম সংরক্ষিত পদে তিনি প্রার্থী হন। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে নজরুল ১৯২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থান করেন। এই সফরের এক পর্যায়ে তিনি ট্রেনে চড়ে রাজবাড়ির পরগনাখ্যাত জয়দেবপুর ও তৎকালীন গাজীপুর অঞ্চলে আসেন।
এক শতাব্দী আগে, শরৎ-হেমন্ত ঋতুতে সেই রাজনৈতিক ভ্রমণের ধকলের মধ্যেও কবির সংবেদনশীল হৃদয়ে প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্য-বন্দনা জেগে উঠেছিল।
সেই সৌন্দর্যচেতনা থেকেই জন্ম নিয়েছিল বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নান্দনিক রূপকল্পসমৃদ্ধ কবিতা ‘চাঁদনী রাতে’, যার প্রাথমিক নাম ছিল ‘জয়দেবপুরের পথে’।
কাজী নজরুলের ঐতিহাসিক সফর ও অবস্থানের সময়কাল নিয়ে বাসসের সঙ্গে কথা বলেন গাজীপুরের ভাষা শহীদ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মুকুল কুমার মল্লিক। তিনি জানান, কাজী নজরুল 'জয়দেবপুরের পথে' কবিতাটি ১৯২৬ সালের নভেম্বর মাসে ট্রেনে চড়ে রাতের দিকে আসার পথে লিখেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় কবি ঢাকায় ৫২, বেচারাম দেউড়ীতে অবস্থান করতেন। প্রচার কাজে নভেম্বর মাসের ১ম থেকে ২১ তারিখের মধ্যে কোনো একদিন তিনি রাতের ট্রেনে গাজীপুর হয়ে ময়মনসিংহ যান। তিনি আরো জানান, যতটুকু জানা যায়, নজরুল গাজীপুরে এসে তৎকালীন ভাওয়াল রাজার ডাকবাংলোতে রাত যাপন করেছিলেন এবং পরদিন নির্বাচনী গণসংযোগ শেষ করে গন্তব্যে চলে যান। এই সফরে তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন কবি আবদুল কাদির।
গাজীপুরের ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, নির্বাচনী বাস্তবতার দ্বন্দ্ব-সংঘাত কবির সৌন্দর্যবোধকে প্রাণহীন করতে পারেনি। সেই রাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বিখ্যাত সাহিত্যিক ও নজরুলের সফরসঙ্গী কবি আবদুল কাদির লিখেছিলেন-‘জ্যোৎস্না রাত্রি, সমস্ত আকাশ গেছে কৌমুদীতে ভরে, সারা দিগন্তদেশ যেন তারি আনন্দে উদ্বেল। কবি জয়দেবপুর চলেছেন নির্বাচনের তদবির করতে, কিন্তু তাঁর মনের অঙ্গন থেকে সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হয়ে গেছে বাস্তব সংসারের সকল দ্বন্দ্ব-দ্বেষ সংক্ষোভ সংঘর্ষ, শুধু বাজছে দিগন্তপ্লাবী সৌন্দর্যের একটানা সুর-মূর্ছনা। সেই সৌন্দর্যের সূত্রে তিনি গেঁথে চললেন শ্লোকের পর শ্লোক। রচিত হলো একটি নাতিদীর্ঘ কবিতা: জয়দেবপুরের পথে।’
গাজীপুর মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যাপক ড. ফরিদ আহমেদ তাঁর ‘গাজীপুর জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে তাঁর বিখ্যাত, 'সিন্ধু-হিন্দোল' কাব্যগ্রন্থে সংকলিত এই অমর কবিতাটি একটি অনন্য নান্দনিক রূপকল্পের নিদর্শন। ৩৬ চরণের এই কবিতার প্রতি লাইনে সাত-আটটি শব্দের অপূর্ব চয়ন জয়দেবপুরের তৎকালীন শান্ত, স্নিগ্ধ ও রূপময় পরিবেশকেই তুলে ধরে।
গ্রন্থটির গবেষণা অনুযায়ী, কবিতাটি মোহাম্মদ কাশেম সম্পাদিত 'অভিযান' পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় ছাপার জন্যে দেয়া হয়। পত্রিকাটির আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে সম্পাদক কবিতা চাইলে নজরুল ‘জয়দেবপুরের পথে’ শিরোনামেই এটি পাঠান। পরবর্তীসময়ে 'অভিযান' বন্ধ হয়ে গেলে কবি আবদুল কাদির সম্পাদিত 'জয়তি' পত্রিকায় কবিতাটি নতুন নাম ‘চাঁদনী রাতে’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এরপর এটি কবির বিখ্যাত 'সিন্ধু-হিন্দোল' কাব্যগ্রন্থে স্থান পায়।
কবিতাটিতে কবি জয়দেবপুরের রাতের আকাশ, প্রকৃতি ও মেঘ-জোছনার খেলাকে যেভাবে অলঙ্কৃত করেছেন, তা এক অতুলনীয় কাব্যিক সুষমায় মণ্ডিত। কবি লিখেছেন:
‘কোদালে মেঘের মউজ উঠেছে গগনের নীল গাঙে,
হাবুডুবু খায় তারা-বুদ্বুদ্, জোছনা সোনায় রাঙে।’
রাতের কুয়াশা ও দিকচক্রের বৃক্ষরাজি দেখে নজরুলের কল্পনা পৌঁছে যায় বহুদূরে। কবিতার ছত্রে ছত্রে ফুটে ওঠে প্রকৃতির মোহনীয় রূপ:
‘দিক্চক্রের ছায়া-ঘন ঐ সবুজ তরুর সারি,
নীহার নেটের কুয়াশা-মশারি ও কি বর্ডার তারই?’
এমনকি বিরহ ও আবেগের নিখুঁত ছোঁয়ায় তিনি রূপক তৈরি করে লেখেন:
‘আবেগে সোহাগে আকাশ-প্রিয়ার চিবুক বাহিয়া ও কি
শিশিরের রূপে ঘর্মবিন্দু ঝ'রে ঝ'রে পড়ে সখি...’
একই সফরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে গাজীপুরের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুবোধ চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমরা প্রামাণ্য তথ্যে জানতে পেরেছি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালে নির্বাচনী প্রচারণার কাজেই জয়দেবপুরে এসেছিলেন। সফরটি গাজীপুরের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়।’
তিনি বলেন, জাতীয় কবির এই সফর স্মরণীয় হলেও গাজীপুরে সরকারি উদ্যোগে নজরুল স্মৃতি রক্ষার্থে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এ নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ ও অনুযোগ রয়েছে।
গাজীপুরে মরহুম নজরুল ইসলাম বাদামী প্রতিষ্ঠিত ‘বিদ্রোহী কবি স্মৃতি সংসদ’-এর বর্তমান চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান বিপ্লব বলেন, ‘গাজীপুরে সরকারি উদ্যোগে কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি রক্ষার্থে কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। জাতীয় কবির এই ঐতিহাসিক সফরের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মকে গাজীপুরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে 'জয়দেবপুরের পথে' কবিতাটি জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আমরা সরকারের প্রতি আকুল আহ্বান জানাচ্ছি।’
১৯২৬ সালের সেই জোছনাধোয়া রাতে জয়দেবপুরের পথে ট্রেনের কামরায় বসে কবি নজরুল যে সাহিত্যসৃষ্টির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা এক শতাব্দী পরেও অমলিন। নির্বাচনী জটিলতার মধ্যেও প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে কালজয়ী পংক্তিমালা উপহার দেওয়ার এই স্মৃতি গাজীপুরবাসীর জন্য এক পরম গর্বের বিষয়।
ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, ভাওয়াল রাজার ডাকবাংলো চিহ্নিতকরণ, স্মরণফলক নির্মাণ এবং 'জয়দেবপুরের পথে' কবিতাটি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে জাতীয় কবির এই অনন্য স্মৃতিকে চিরস্থায়ী করা সম্ভব।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
ঢাকা, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ উদযাপিত হচ্ছে। ১৯৭৮ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকে দলটি লড়াই, সংগ্রাম, অর্জন ও রাজনৈতিক অভিযাত্রার একটি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। গত ৪৮ বছর ধরে বিএনপি বিভিন্ন ঝড়-ঝঞ্ঝা, প্রতিকূলতা ও কঠিন সময় অতিক্রম করে আজ দেশের জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে এবং এটি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। শত বাধা ও কঠিন পথ পেরিয়ে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য ইতিহাস গড়েছে বিএনপি।
২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর বিএনপিকে একের পর এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০০৭ সালের বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেনের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে দলটির ওপর দুর্যোগের মেঘ ঘনীভূত হতে শুরু করে। ওই সময় দল ভাঙার চেষ্টা, শীর্ষ নেতাদের কারাবরণসহ নানা সংকটের সম্মুখীন হয় বিএনপি, যা মহান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দলটির জন্য ছিল চরম সংকটকাল।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথে চরম দমন-পীড়নের শিকার হন। এই সময়ের মধ্যে দলের বিরুদ্ধে হাজার হাজার ‘মিথ্যা’ ও ‘গায়েবি’ মামলা দায়ের করা হয়েছে। রাজপথের আন্দোলন দমাতে গুম, খুন ও নির্যাতনের খড়্গ নেমে এসেছিল তৃণমূল পর্যন্ত। তবে, সব বাধা উপেক্ষা করে দলকে টিকিয়ে রাখা ছিল নেতৃত্বের বড় সার্থকতা।
২০০৭ সালের বিতর্কিত এক-এগারোর পর গত দুই দশকের অপেক্ষা, আন্দোলন ও কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে বিএনপি জনগণের বিপুল রায়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এসেছে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল সমর্থনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি পঞ্চমবারের মত সরকার গঠনের সুযোগ লাভ করে।
ক্ষমতায় ফিরে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে জনগণের অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে বিএনপি সরকার।
বিতর্কিত এক-এগারোর পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন একদলীয় নির্বাচন (বিনাভোটে আওয়ামী জোটের ১৫৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত), ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের রাতে আওয়ামী সরকার দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে ভোট জালিয়াতি তথা রাতের ভোটের নির্বাচন, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘আমি-ডামি’র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচনে জন রায়ের প্রতিফলন ঘটেনি। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়ায় জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি।
এর আগে সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিএনপির এবারের প্রত্যাবর্তন সমসাময়িক রাজনীতির ইতিহাসে ‘ঐতিহাসিক পুনরুত্থান’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
দলটির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার জন্য বিতর্কিত এক-এগারোর পর দুই দশক ছিল চরম অগ্নিপরীক্ষার। বিতর্কিত মামলায় তাঁকে কারারুদ্ধ করার পর দলের নেতাকর্মীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। উন্নত চিকিৎসার অভাব এবং দীর্ঘ কারাবাসে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তিনি আপসহীন থেকেছেন। এ সময়ে দলের হাল ধরেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এর আগে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত দল সুসংগঠিত হয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই সংগ্রামের কর্মসূচি পালিত হয়।
২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেফতার ও কারাবন্দি অবস্থায় অমানবিক নির্যাতনের পর চিকিৎসার প্রয়োজনে দেশ ছাড়েন তারেক রহমান। বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর একের পর এক সাজানো ও মিথ্যা মামলায় তারেক রহমানকে সাজা দেওয়া হয়। আদালতকে ব্যবহার করে গণমাধ্যমে তারেক রহমানের বক্তব্য-বিবৃতি প্রচার বন্ধ রাখা হয়।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে এবং পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রায় ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর স্বদেশে রাজসিক প্রত্যাবর্তন করেন তারেক রহমান। প্রিয় নেতাকে বরণ করতে ওইদিন রাজধানীর পূর্বাচলে লাখ লাখ নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ জড়ো হন। তাদের ভালোবাসায় একদিকে তারেক রহমান যেমন সিক্ত হলেন, অন্যদিকে তিনিও দেশের মানুষকে শোনালেন তাঁর স্বপ্নের কথা, তাঁর পরিকল্পনার কথা।
দীর্ঘ দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থেকেও দলটির বড় কোনো ভাঙন না হওয়া ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান যখন নির্বাসিত জীবনে এবং বেগম খালেদা জিয়া যখন হাসপাতালে, তখনো তৃণমূলের ঐক্য অটুট ছিল।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর ২০২৬ সাল- বিএনপি ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথ অতিক্রম করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেছে, বিরোধী দলে থেকেছে, আন্দোলন করেছে, নির্বাচনে জয়-পরাজয় দেখেছে, রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেছে এবং কঠিন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠন হিসেবে টিকে থেকে লড়াই সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে।
বিএনপির যাত্রা
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং জাতীয় ঐক্যের রাজনৈতিক দর্শনকে সামনে রেখে দলটির যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে বাংলাদেশ বিনির্মাণে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে দলটি জনগণের বিপুল সমর্থন লাভ করে। প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
১৯৭৯ সালে প্রথম নির্বাচনী সাফল্য
১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বড় ধরনের বিজয় অর্জন করে। এর মধ্য দিয়ে নবগঠিত দলটি জাতীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে।
১৯৮১-১৯৮২ সালের কঠিন সময়
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড বিএনপিকে গভীর রাজনৈতিক সংকটে ফেলে। দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর বিএনপি বিরোধী রাজনীতিতে চলে যায়। শুরু হয় নতুন রাজনৈতিক সংগ্রাম।
১৯৮৩-১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি রাজপথের আন্দোলনকে সংগঠিত করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আন্দোলনের সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়।
তীব্র গণআন্দোলনে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের পতন ঘটে। এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ তৈরি হয়। বিএনপির জন্য এটি ছিল দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের একটি বড় রাজনৈতিক অর্জন।
১৯৯১ সালে ঐতিহাসিক নির্বাচনী বিজয়
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সময়ে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন ঘটে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
১৯৯৬ সালে ক্ষমতার পালাবদল
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস হয়। একই বছরের ১২ জুন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে না পারলেও ১১৬ আসন লাভ করে ইতিহাসের বৃহত্তম বিরোধীদল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিএনপি।
২০০১ সালে বড় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন
২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বড় বিজয় অর্জন করে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। ২০০১-২০০৬ সময়কালে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, কৃষি, যোগাযোগ ও অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে।
২০০৭-২০০৮ সালে জরুরি অবস্থা ও রাজনৈতিক সংকটের সময় বিএনপি কঠিন সংকটের মুখোমুখি হয়। ২০০৭ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। ওই সময় গ্রেফতার হন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র বিএনপির ওই সময়ের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান, ছোট পুত্র আরাফাত রহমান কোকো, দলের শীর্ষ নেতৃত্বসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। তখন বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি লাভ করেন। কারা হেফাজতে অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে মুক্তির পর চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশ পাঠানো হয়। নির্বাসিত জীবনে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
নতুন সংকট ও লড়াই-সংগ্রাম
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। যদিও ওই নির্বাচনটি নানা কারণে ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তথাপি ফলাফল মেনে নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে। ওই সময় আওয়ামী লীগ সরকার কৌশলের আশ্রয় নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ২০১৩ সালে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়।
২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। দলটির নির্বাচনী রাজনীতিতে এটি একটি বড় সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পথচলায় এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। তখন বিএনপির অগণিত নেতাকর্মী হামলা-মামলা শিকার হয়ে কারাবরণ ও গুমসহ অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হন।
২০১৬-২০১৭ সালে বিএনপি দলকে পুনর্গঠন করে। জেলা, মহানগর ও তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে সংগঠনকে সক্রিয় করা হয়।
২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট সুযোগ পাননি। দলটির অনেক প্রার্থী হামলা ও গ্রেফতারের শিকার হন। নির্বাচনের আগের দিন রাতেই সারা দেশে আওয়ামী লীগের পক্ষে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়। তাই ওই নির্বাচন রাতের ভোটের নির্বাচন হিসাবে স্বীকৃতি পায়। নির্বাচনের পর বিএনপি সংসদে সীমিত প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিরোধী রাজনীতিতে নতুনভাবে প্রবেশ করে।
২০১৯-২০২১ সালের কঠিন রাজনৈতিক সময়
এই সময়ে বিএনপি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচি, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যায়। বেগম খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব ও চিকিৎসা বিএনপির রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে।
২০২২-২০২৩ সালে রাজপথে নতুন জাগরণ
২০২২ সাল থেকে বিএনপি ধারাবাহিকভাবে সমাবেশ, গণমিছিল, বিভাগীয় সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু করে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, সরকারের পদত্যাগ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন জোরদার হয়।
২০২৩ সালে ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। ওই সময় আওয়ামী সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নানা রকম নির্যাতন-নিপীড়ন ও বিএনপির সমাবেশ অনুষ্ঠানে বাধা সৃষ্টি করলেও দিনে দিনে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায়। দলের কর্মী-সমর্থকরাও সর্বোচ্চ ত্যাগ শিকার করে দলীয় কর্মসূচি সফল করেন।
২০২৪ সালে রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচন বিএনপিসহ দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বর্জন করে। আওয়ামী লীগ দলীয় লোকদের নিয়েই ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ফলে নির্বাচনটি আমি-ডামির নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপির শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারাবন্দি করে রাখা হয়।
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়। সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে হাইকোর্টের একটি রায়কে কেন্দ্র করে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের ওই আন্দোলনে গোটা দেশের ছাত্রসমাজের সাথে বিএনপির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও অনন্য ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। গুলিতে নিহত হন চট্টগ্রামের ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম। এরপর আন্দোলন সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে।
অপরদিকে আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ সরকারও পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার শহীদ ও ২৩ সহস্রাধিক মানুষ আহত হন। শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। অবশেষে ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা।
দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনের পতন ঘটে। এই আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আন্দোলনে অংশ নেওয়া ও নেতৃত্বে থাকা নেতৃবৃন্দকে নির্বাসিত জীবন থেকে সাহস, সমর্থন ও দিকনির্দেশনা দেন বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ওই সময় বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ আন্দোলনের সমর্থন দেওয়া রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করা হয়।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন ও রাজনৈতিক অবস্থান নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। দলটি নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাংগঠনিকভাবে নিজেদের পুনর্গঠনের কাজকে আরও গুরুত্ব দেয়।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপির সামনে আসে নতুন বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তুতি, দলীয় ঐক্য, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পরিকল্পনা সামনে আসে। দলের জন্য এটি ছিল আন্দোলন থেকে সম্ভাব্য রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তুতিতে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।
২০২৬ সালের ঐতিহাসিক পুনরুত্থানের অধ্যায় শুরু হয়েছে।
২০২৬ সালে এসে বিএনপির ৪৮ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস নতুন বাঁকে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম, তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন, নেতাকর্মীদের ত্যাগ এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বিএনপি আবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এই প্রত্যাবর্তন শুধুমাত্র একটি দলের ক্ষমতায় আসা বা নির্বাচনী সাফল্যের প্রশ্ন নয়; এটি ৪৮ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার একটি নতুন অধ্যায়।
৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক অর্জন হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেওয়া।
দলটি পাঁচবার জাতীয় নির্বাচনে বিজয় অর্জন করেছে। নারী নেতৃত্বের বিকাশে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থেকেও বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জনগণের পাশে থেকেছে বিএনপি।
দলের তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়। গণতন্ত্র, নির্বাচন ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘ আন্দোলন ও প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দলীয় অস্তিত্ব ও সাংগঠনিক শক্তি জোরদার ছিল।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করে ২০২৬ সালে ৪৮ বছরে পদার্পণ- এটি বিএনপির জন্য শুধু একটি সময়ের হিসাব নয়; এটি বহু উত্থান-পতন, জয়-পরাজয়, আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক পরীক্ষার ইতিহাস।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলটি বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে রাজপথ ও রাষ্ট্রক্ষমতার দুই ভিন্ন বাস্তবতা দেখেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠনটি টিকে থেকেছে। আজকের পুনরুত্থান তাই হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়-এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার ধারাবাহিকতা।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ