০৯:৩৯ পি.এম
সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবান্ধব মাদুর শিল্প বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। ন্যায্য দাম না পাওয়ার কারণে অনেকেই এ পেশা ত্যাগ করে দিচ্ছেন। তবে, অনেক মানুষ পিতৃপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এই শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবেশবান্ধব এই শিল্পটি টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
জানা যায়, এককালে সাতক্ষীরা জেলা মাদুর শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। আশাশুনি উপজেলার বড়দল, কুল্যা এবং কাদাকাটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ‘মেলে ঘাস’ প্রচুর পরিমাণে জন্মাতো। স্থানীয় লক্ষাধিক মানুষের জীবনধারণের উৎস ছিল এই শিল্প।
দক্ষিণ খুলনার এক সময়ের বৃহত্তম হাট ছিল বড়দল। সেখানে প্রচুর মাদুর বিক্রি হতো পাইকারি দামে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এসে এই হাটে মাদুরসহ বিভিন্ন সওদা করে নিয়ে যেতো। বুধহাটা হাটেও একসময় ব্যাপক মাদুর বিক্রি হতো। প্রতি রোববার বড়দল হাটে এবং শুক্রবার ও সোমবার বুধহাটা হাটে বসতো মাদুরের হাট। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদুর কারিগররা প্রতি সপ্তাহে তাদের তৈরি করা মাদুর এনে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করতেন। এসব মাদুর চলে যেত খুলনা, যশোরসহ আশেপাশের বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু, এখন আর আগে মতো এসব হাটে প্রচুর মাদুর বিক্রি হয় না।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
বর্তমানে খাটের ওপর তোষক, বিছানার চাদর এবং প্লাস্টিকের মাদুরের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মাদুর শিল্পের কদর কমেছে। তবে, আশাশুনি ও তালা উপজেলার কিছু কিছু এলাকায় মানুষ পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার জন্য এখনও মাদুর বোনার কাজে জড়িত রয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে নারীদের অবদানই বেশি। আশাশুনি ও তালা উপজেলার প্রায় তিনশ পরিবারের আয়ের উৎস এই মাদুর বুনন। যদিও চাক্যচিক্য কমেছে, তাও মেলে ঘাসের মাদুর পরিবেশ বান্ধব। আর এই পরিবেশবান্ধব শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে জরুরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।
আশাশুনি উপজেলার বড়দল গ্রামের মাদুর কারিগর সুধীর মন্ডল বাসসকে জানিয়েছেন, "এই মাদুর বিক্রি করে সংসার চালাই। ছেলের লেখাপড়ার খরচ যোগাই। কিন্তু, বাইরে থেকে মাদুর আসার কারণে, আগের চেয়ে মাদুরের দাম কম পাচ্ছি। লাভ তেমন নেই। তাতেই এ পেশা ধরে রেখেছি। বয়স হয়েছে। এটা ছাড়া অন্য কিছু করতে পারি না।"
তিনি জানিয়েছেন, "মাদুর বুনে এখন আর আগের মতো লাভ নেই। মেলে ঘাস কিনতে হয় বাকীতে। মাদুর বেচে সেই মেলে ঘাসের দাম দিতে হয়। আগে প্রচুর মেলে বা পাতি উৎপাদন হতো, কিন্তু এখন আর হয় না।"
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
তিনি আরো বলেন, "একটি ছোট আকারের মাদুর তৈরি করতে খরচ হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, বিক্রি হয় ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকায়। বড় সাইজের মাদুর তৈরি করতে খরচ পড়ে যায় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, যা বিক্রি হয় ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। লাভ খুবই সীমিত। অল্প কিছু থাকে, সেই দিয়ে সংসার চালাতে হয়। বাড়িতে মাদুর তৈরি করে বড়দল বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করি।"
সুধীর মন্ডলের স্ত্রী সরলা রাণী মন্ডল জানিয়েছেন, "সংসারের কাজের পাশাপাশি আমি স্বামীর কাজে সহযোগিতা করি। তবে, এই পেশায় থেকে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।"
কচুয়া গ্রামের মাদুর ব্যবসায়ী লুৎফর মোড়ল জানিয়েছেন, "বড়দল, খাজরা, বাইনতলা সহ বিভিন্ন বাজার থেকে পাইকারি মাদুর কিনে সেটি সাতক্ষীরা, পাটকেলঘাটা ও খুলনায় বিক্রি করি। মাদুরের আগের মতো চাহিদা নেই। লাভও এখন খুবই কম।"
বিসিক শিল্পনগরী সাতক্ষীরার উপ-ব্যবস্থাপক গৌরব দাস বাসসকে বলেছেন, "বিসিক সাধারণত ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করে। সাতক্ষীরার মাদুর শিল্পটি এক সময়ে অনেক নামকরা ছিল। মাদুর শিল্পকে আরো কিভাবে আধুনিকায়ন করা যায়, সে লক্ষ্যে আমরা প্রশিক্ষণ এবং ঋণ সহায়তার আওতায় আনতে পারি এবং এই মাদুর শিল্পের বাজার সম্প্রসারণ করেও কাজ করছি।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন