১১:১৪ পি.এম
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জে অবস্থিত রংপুর চিনিকলটি প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ হয়ে রয়েছে।
উত্তরবঙ্গের এই অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বর্তমানে কারখানা প্রাঙ্গণে কেবলই সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে।
এক সময় সাইরেনের আওয়াজের মধ্যে প্রতিদিন ভোরে মেহনতী মানুষের কোলাহলে পুরো জনপদ জেগে উঠত।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
সেখানে আখের ট্রাক ও ট্রলির দীর্ঘ সারি, চিমনি থেকে ওঠা অবিরাম ধোঁয়া এবং দেশীয় চিনির গন্ধে তা পরিপূর্ণ থাকত।
কিন্তু এখন আর সেই সাইরেনের আওয়াজ শোনা যায় না, আখবাহী ট্রাকও চলাচল করে না, চিমনির ধোঁয়াও বাতাসে মিলিয়ে গেছে।
চিনিকলটির বন্ধ থাকার কারণে, দেশীয় চিনির উৎপাদন সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে খোলা আকাশের নিচে, রোদ-বৃষ্টির মধ্যে ভিজে অযত্ন ও অবহেলায় হাজার কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উত্তরের বিস্তীর্ণ জনপদের অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করার জন্য যে কারখানা ছিল, তা এখন জং ধরে ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
এদিকে, বিপুল এই সম্পদের রক্ষায় কার্যকর কোন উদ্যোগ এখনও নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষের অভিমতের ভিত্তিতে জানা যায় যে, এই চিনিকলটি একটি কারখানা নয়; বরং এটি ছিল উত্তরবঙ্গের হৃদস্পন্দন।
এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে এবং শ্রমজীবীদের জীবিকার তাগিদে মিলটি দ্রুত পুনঃচালু করার প্রয়োজন।
রংপুর চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এবং মহিমাগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবু সুফিয়ান সুজা তার বক্তব্যে জানিয়েছেন, 'রংপুর চিনিকল উত্তরের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এই কারখানা সচল হলে এখানকার শ্রমিক-কর্মচারীসহ সর্বস্তরের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।'
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী মনজুর হাবীব মনজু মন্তব্য করেন, 'চিনিকলের সব কিছুই প্রস্তুত আছে। শুধুমাত্র মিলটিতে ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকা নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারলে এটি আবার পূর্বের অবস্থানে ফিরে যেতে সক্ষম হবে।'
চিনিকলের বর্তমান ইনচার্জ এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের মতে, কারখানাটি পুনরায় চালু করার জন্য যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখনো বিদ্যমান।
গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন জানান, 'চিনিকলটি তৃতীয় ধাপে চালুর ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্ত রয়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ হল এটি দ্বিতীয় ধাপে চালু করা যাবে কি না।'
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন এবং শিল্পমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে, মিলটি চালু রাখতে যে পরিমাণ আখ প্রয়োজন, তা রংপুর চিনিকলের আছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
মিলের অবকাঠামো, যন্ত্রাংশ ও যানবাহন দ্বারা ৪ থেকে ৫ মাস মিলটি সচল রাখা সম্ভব হলে চিনি উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
রংপুর চিনিকলের ইনচার্জ মোহাম্মদ শাহিনূল ইসলাম বলেন, 'মিলের যন্ত্রপাতি ও অপারেশনের প্রধান স্থানগুলোকে সঠিকভাবে মেরামত করা এবং জনবলকে দক্ষভাবে কাজে লাগাতে পারলে, মাত্র ৪ থেকে ৫ মাস কারখানাটিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে এটিকে লাভজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।'
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান এ কে এম বেনজামিন রিয়াজী মোবাইল ফোনে সংবাদ মাধ্যমকে জানান, 'বন্ধ থাকা অন্যান্য চিনিকলসহ সব ধরণের শিল্পকারখানা পুনঃচালু করার বিষয়ে সরকারের একটি নীতিগত ভাবনা ও উদ্যোগ রয়েছে।'
১৯৫৪ থেকে ১৯৫৭ সালের মধ্যে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে রংপুর চিনিকল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৭-৫৮ মাড়াই মৌসুমে এই চিনিকলে চিনি উৎপাদন শুরু হয়। ১ হাজার ৯২৫ দশমিক ৩৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত চিনিকলের বার্ষিক চিনি উৎপাদন সক্ষমতা ১৫ হাজার মেট্রিক টন। ২০২০ সালের বুধবার (২ ডিসেম্বর) এই চিনিকলের আখ মাড়াই স্থগিত ঘোষণা করে সরকার।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
মাড়াই বন্ধ থাকলেও, বর্তমানে ৯২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এই কারখানাটিতে কর্মরত রয়েছেন।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এটি এই অঞ্চলের লাখ লাখ আখচাষী ও শ্রমিকের রুটিরুজির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করেছে।
এলাকার মানুষ এখন দাবি করছে যে, কারখানাটি পুনরায় সচল হলে উত্তরবঙ্গের হারিয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক গৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে ৫ বিষয়ে অগ্রাধিকার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন