০৫:১৬ পি.এম
সুনামগঞ্জ হাওরবেষ্টিত একটি জনপদ। এই জনপদটি সিলেট বিভাগের মধ্যে অবস্থিত সংসদীয়-১ আসন (জামালগঞ্জ- তাহিরপুর- ধর্মপাশা-মধ্যনগর)। অঞ্চলের জনগণ হাওরপাড়ের জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। এখানে অধিকাংশ লোক কৃষিকাজ এবং মৎস্য চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। সুতরাং, এই আসনটি রামসার সাইট খ্যাত টাঙ্গুয়ার হাওরসহ অনেক নৈসর্গিক স্থানের জন্য পরিচিত, এর মধ্যে রয়েছে যাদুকাটা, ফাজিলপুর, বালুপাথর মহাল এবং বড়ছড়া কয়লা পাথর কোয়ারি। এ কারণে, এই সংসদীয় আসন থেকে সরকারের জন্য বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়ে থাকে।
সুনামগঞ্জ-১ আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে বর্ষা মৌসুমে ৬ মাস পর্যন্ত বর্ষা এবং পরবর্তী ৬ মাস হেমন্তকাল থাকে। বর্ষা মৌসুমে নিম্নাঞ্চল এলাকার অনেক বিদ্যালয় পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফলে, যাতায়াত ব্যবস্থা অচল হয়ে গেলে বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম বন্ধ থাকে। এই অবস্থায়, বিদ্যালয়ের যাতায়াত ব্যবস্থা ও শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করার দাবি স্থানীয় জনগণের মনে চলমান একটি উচ্চারণ।
জেলার হাওরের জীবন মানেই প্রকৃতির সঙ্গে এবং ঋতুর সঙ্গে লড়াই। বর্ষা এলে সড়কগুলো পানির নিচে হারিয়ে যায় এবং গ্রামের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর জন্য জলপথে চলাচল করে। এই জলপথ শিশুর জন্য হয়ে দাঁড়ায় এক অনিশ্চিত যাত্রা। কখনও কখনও এটি শিক্ষাজীবনের জন্য মারাত্মক বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই বাস্তবতায়, মধ্যনগর উপজেলায় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মানবিক এবং সময়োপযোগী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে যাতায়াতের একমাত্র হাতিয়া নৌকা। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনেক সময় শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। তাই, হাওরের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের লক্ষ্যে একটি বিজয়ী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে, বিদ্যালয়ে যাতায়াত নিরাপদ হয়ে উঠবে এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।
স্থানীয় অভিভাবকদের মাঝে এই উদ্যোগ সম্পর্কে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা মনে করেন যে, এটি শিশুদের বিদ্যালয়ে যেতে আরও উৎসাহিত করবে এবং বর্ষাকালে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমিয়ে দেবে। তারা ভবিষ্যতে হাওরাঞ্চলের অন্যান্য বিদ্যালয়গুলোকে এ ধরনের সুবিধার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
হাওরপাড়ের শিক্ষার মান উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে, বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত আরও সহজ এবং নিরাপদ করার জন্য সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের উদ্যোগে মধ্যনগর উপজেলার ১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৌকার বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে।
সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় ২ লাখ ৬০ হাজার টাকার বরাদ্দ থেকে এসব নৌকা প্রস্তুত করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং প্রতিনিধিদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
জানা গেছে যে, সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের বরাদ্দের অর্থে খালিশাকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাশিদ আলমকে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির মাধ্যমে ১৬টি নৌকা তৈরি করা হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে হাওরপাড়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং বিদ্যালয়ের উপস্থিতি বাড়বে।
মধ্যনগর উপজেলার শালীয়ানী, জামালপুর, কামাউড়া, খালিশাকান্দা, গলইখালী, ইটাউরি, দুগনই, বলরামপুর, মাছুয়াকান্দা, দৌলতপুর, দোয়াদুর রহমান, আলীপুর, সাতুর, বীরসিংহপাড়া, চাপাইতি এবং আটাইশা মাছিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পুলিশিভাবে নৌকাগুলি পেয়েছে।
মধ্যনগরের বাসিন্দা মানিক মিয়া বলেন, বর্ষা মৌসুমে বেশিরভাগ সময় বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এই উদ্যোগের ফলে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়বে বলে আমি ধারণা করি।
মধ্যনগর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বর্ষা মৌসুমে উপজেলার ৮৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৪৫টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নৌকা দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। এর আগে সংসদ সদস্য এক বিদ্যালয়ে নৌকা দিয়েছিলেন। এবার তিনি আরও ১৬টি বিদ্যালয়ে নৌকা দিয়েছেন। নতুন নৌকাগুলো শিক্ষার্থীদের নিরাপদ এবং নির্বিঘ্ন পৌঁছানোর ব্যবস্থা করবে। পাশাপাশি, বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হারও বৃদ্ধি পাবে।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
প্রধান শিক্ষক এবং শিক্ষক সমিতির সভাপতি রমা রঞ্জন সরকার বলেন, বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে অনেক কষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু যদি এসে ছাত্র না পাওয়া যায় তখন তো মন ভেঙে যায়। এই উদ্যোগটি সত্যিই সময়োপযোগী। এতে অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীরাও বেশ আনন্দিত।
খালিশাকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাশিদ আলম বলেন, নৌকাপ্রাপ্ত বিদ্যালয়গুলোর ছাত্র-ছাত্রীরা এখন সাচ্ছন্দ্যে বিদ্যালয়ে আসতে পারবে।
সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, আমি নিজে হাওরপাড়ের সন্তান। হাওরাঞ্চলে শিক্ষার প্রসারে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। বর্ষাকালে অনেক শিক্ষার্থী নৌকার অভাবে বিদ্যালয়ে যেতে অক্ষম। সেই কারণে, যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নৌকায় পারাপার করতে হয়, সেই সব বিদ্যালয়ে নৌকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এই সময়পরিষরে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিদ্যালয়ে নৌকার ব্যবস্থা করা হবে। শিক্ষার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসআরবি পরিচয়ে ব্যবসায়ীকে অপহরণ, পুলিশ উদ্ধার অভিযান
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বাসস’কে বলেন, নৌকাগুলো শিক্ষার্থীদের নিরাপদ এবং নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করবে। এই উদ্যোগ হাওরাঞ্চলের জনগণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ধরনের নতুনত্ব নিয়ে আসবে। ফলে শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়ার হার এবং বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির হার কমবে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন