০২:১৫ পি.এম
কোনো প্রকারের নিয়মনীতির একদমই তোয়াক্কা না করেই পুরাতন ব্যাটারি ভাঙা হচ্ছে, এবং এই ব্যাটারি পোড়ানোর মাধ্যমেই তৈরি করা হচ্ছে সীসা। ঢাকা, সাভার, ধামরাই এবং গাজীপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার অবৈধ খোলা ভাট্টি গড়ে উঠেছে। এইসব কার্যক্রম পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চলছে।
অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা গেছে, ধামরাই উপজেলার কালামপুর এলাকায় কামাল মজুমদারের বাগানবাড়িতে চারটি খোলা চুলায় সীসা গলানো হচ্ছে। এছাড়া সাভারের নামাবাজার এলাকার একটি পরিত্যক্ত ইটভাটায় দুটি চুলা, গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে ময়লা ডাম্পিংয়ের কাছে আটটি চুলা, আমিনবাজারের ময়লার ভাগাড় সংলগ্ন এলাকায় চারটি চুলা এবং সাভার উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নের আওয়াল মার্কেটের দক্ষিণে একটি ইটভাটার ভেতরে আটটি চুলায় পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা গলানোর কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
যখনই পরিবেশ অধিদপ্তর বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান সম্পর্কে আভাস পাওয়া যায়, তখন এসব খোলা ভাট্টির মালিকরা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে। তাদের দাবি, এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মালিকদের এবং পৃষ্ঠপোষকদের পরিচয় ধীরে ধীরে প্রকাশ করা হবে।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
অভিযোগ অনুযায়ী, অটোরিকশা ও চার্জার চালিত ভ্যানের ব্যবহৃত ব্যাটারিগুলো বাজারমূল্যের তুলনায় কম দামে কিনে আনা হচ্ছে। পরে ব্যাটারির এসিড আলাদা করে প্লাস্টিক এবং সীসা পৃথক করা হচ্ছে। দিনের বেলায় ব্যাটারি ভাঙার কাজ চললেও রাতের সময় খোলা চুলায় সীসা গলানোর কাজ করা হচ্ছে।
এসময়ে নির্গত কালো ধোঁয়া, বিষাক্ত গ্যাস এবং ব্যাটারির এসিড আশপাশের পরিবেশকে দূষিত করছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, ব্যবহৃত এসিড উন্মুক্ত জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে, যা পরে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ধান, শাকসবজি ও ফলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন রোগবালাইও দেখা দিচ্ছে।
সাভারের ভাকুর্তা এলাকার তেভাগা কৃষক রমিজ উদ্দিন মিয়াসহ কিছু ভুক্তভোগী অভিযোগ করছেন, রাতে যখন ব্যাটারিগুলো পোড়ানো হচ্ছে তখন প্রায় কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে। একইসাথে কৃষিজমিরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিবাদ জানালে খোলা ভাট্টির সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যবিরোধী এই খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর, মানিকগঞ্জের মোহাম্মদ সোহেল চৌধুরী নামে একজন ব্যক্তি দাবি করেছেন, সিংগাইর উপজেলার চারিগ্রাম ইউনিয়নের দাশেরহাটি এলাকায়ও একটি খোলা ভাট্টি রয়েছে।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় প্রশাসনের তৎপরতা: বিভাগীয় কমিশনার
রাজধানীর উত্তরা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ বাবুল অভিযোগ করেছেন, তুরাগ থানার কামারপাড়া এলাকায় ইস্টার্ন মেডিকেলের কাছেই একটি খোলা ভাট্টিতে ব্যাটারি পোড়ানোর মাধ্যমে সীসা গলানোর কাজ চলছে, যা স্থানীয় পরিবেশের জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, এটিপি (ATP) এবং ইটিপি (ETP) সুবিধাসহ পুরোনো ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের জন্য কয়েকটি অনুমোদিত কারখানাকে লাইসেন্স দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ করলেও অবৈধ খোলা ভাট্টির ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের রাজস্ব পরিশোধ না করে উন্মুক্ত পরিবেশে সীসা উৎপাদন করছেন।
পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন অবিলম্বে অবৈধ খোলা ভাট্টি বন্ধের দাবি জানিয়েছে। তারা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) সৈয়দ আহম্মদ কবীর বলেন, সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়গুলোর সঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম সক্রিয় করা হচ্ছে, যাতে অবৈধ এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (ঢাকা অঞ্চল) মো. ফেরদৌস আনোয়ার ঘোষণা করেন, অবৈধভাবে কোনো সীসা কারখানা পরিচালনার সুযোগ নেই। এধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। গাজীপুর এবং ঢাকা জেলার আশপাশে কোথাও অবৈধ সীসা কারখানা পরিচালিত হলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন