১০:২৮ এম
এস এম আশিকুজ্জামান ঢাকা, ২২ জুলাই, ২০২৬ : নদী দখল, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, বায়ু ও শব্দদূষণ অথবা অবৈধ ইট ভাটার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের বিচারিক পদক্ষেপে পরিবেশগত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায় ও নির্দেশনার গুরুত্ব অপরিসীম। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- গাছ কাটতে লাগবে অনুমতি ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি, হাইকোর্টের এক রায়ে ঢাকা শহরসহ অন্যান্য জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায়ে গাছ কাটার ক্ষেত্রে অনুমতি নিতে কমিটি গঠনের নির্দেশনা প্রদান করেছেন। রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, কমিটির অনুমতি ছাড়া ঢাকা শহরসহ অন্যান্য জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায়ে গাছ কাটা যাবে না। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে ব্যক্তিমালিকানাধীন গাছ কাটার বিষয়টি এর আওতায় আসবে না। নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা ২০১৯ সালে হাইকোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ে বাংলাদেশে সকল নদ-নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ বা ‘লিভিং এনটিটি’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে নদীর আইনি অভিভাবক ঘোষণা করার পাশাপাশি নদী দূষণ ও দখল রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাহাড় কাটা বন্ধের নির্দেশ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবেশ ধ্বংস করে নির্বিচারে পাহাড় কাটা বন্ধে হাইকোর্ট একাধিক আদেশ প্রদান করেছেন। যেমন, ২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় পাহাড় কাটা বন্ধে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। অন্যদিকে, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার দিনারপুরে পাহাড় কাটা এবং কুমিল্লার লালমাই পাহাড় কাটা বন্ধের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, ২০২৪ সালের ২ এপ্রিল পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটন কেন্দ্র সাজেকে পাহাড় কাটা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বায়ু দূषण রোধে নির্দেশনা রাজধানী ঢাকার বায়ু দূষণ রোধে হাইকোর্ট ৯ দফা নির্দেশনা প্রদান করেছেন। ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি, হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনাগুলো হলো- ১. ঢাকা শহরের মধ্যে বালি ও মাটি বহনকারী ট্রাকগুলোকে অবশ্যই বালি বা মাটি ঢেকে পরিবহন করতে হবে। ২. যেসব জায়গায় নির্মাণ কাজ চলছে, সেখানে নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখতে হবে। ৩. ঢাকার সড়কগুলোতে পানি ছিটানোর যে নির্দেশ ছিল, সে অনুযায়ী যেসব জায়গায় পানি ছিটানো হচ্ছে না, সেসব এলাকায় পানি ছিটানোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৪. সড়কের মেগা প্রজেক্টের নির্মাণ কাজ এবং কার্পেটিংয়ের যেসব কার্যক্রম চলছে, তা আইন-কানুন এবং চুক্তির শর্তাবলী মেনে করতে হবে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ৫. যেসব গাড়ি কালো ধোঁয়া ছাড়ে, সেগুলোকে জব্দ করতে হবে। ৬. সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির ইকোনমিক লাইফ নির্ধারণ করতে হবে এবং পুরাতন গাড়িগুলোর চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। ৭. যেসব ইটভাটা যেসব লাইসেন্সবিহীনভাবে চলছে, সেগুলোর মধ্যে যেগুলো এখনো বন্ধ করা হয়নি, সেগুলো বন্ধ করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। ৮. পরিবেশ অধিদফতরের অনুমতি ছাড়া টায়ার পোড়ানো এবং ব্যাটারি রিসাইকেলিং বন্ধ করতে হবে। ৯. মার্কেট এবং দোকানের বর্জ্য প্যাকেট করে রাখতে হবে এবং মার্কেট ও দোকান বন্ধের পরে সিটি করপোরেশনকে ওই বর্জ্য অপসারণ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। হাজারীবাগের ট্যানারী স্থানান্তর বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি-বেলা’র আনা একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০০৯ সালে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। পরে হাইকোর্টের এই আদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগও বহাল রেখেছে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত রক্ষা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ২০২২ সালের ৯ নভেম্বর নির্দেশনা প্রদান করেছে হাইকোর্ট। এর পূর্বে ২০১১ সালের ৭ জুন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ঝিলোঞ্জা, সুগন্ধা ও লাবনী পয়েন্ট এলাকা থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সুন্দরবন বাংলাদেশের ফুসফুস ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট, এক রিটের শুনানিতে হাইকোর্ট সুন্দরবনকে দেশের ফুসফুস উল্লেখ করে বলেন, অ্যামাজন যেমন পৃথিবীর ফুসফুস, ঠিক তেমনই সুন্দরবন আমাদের ফুসফুস। অন্যদিকে, ২০২১ সালে দেওয়া একটি রায়ে হাইকোর্ট বলেন, কোনো অবস্থাতেই সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত এলাকার খালের ভেতরে কোনো ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলার চলাচল করা যাবে না। কাঁকড়া জেলেরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সুন্দরবনের সংশ্লিষ্ট স্টেশন অফিসে বাজারের নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব দিয়ে পাস সংগ্রহ করে কেবল বৈঠাচালিত নৌকা এবং দোন দড়ির মাধ্যমে নির্দিষ্ট ওজনের কাঁকড়া আহরণ করতে পারবেন। পাস নিয়ে কাঁকড়া আহরণের জন্য সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশের সময় বন বিভাগের স্টেশন অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট নৌকা ও নৌকার লোকদের কঠোরভাবে পরীক্ষা করা হবে। যাতে কোনো প্রকার ‘চারু’ (কাঁকড়া ধরার জন্য বাঁশের শলা দিয়ে নির্মিত চাঁই) এবং ‘বিষ’ কিংবা অন্য কোনো বেআইনি জিনিস বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পারে। এই রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, সুন্দরবন বাংলাদেশে দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের বিশাল জনগণের জীবন রক্ষা ও জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম এবং এটি জাতীয় সম্পদ। সুন্দরবন অক্ষুণ্ন থাকলে ওই বিশাল জনগণ বেঁচে থাকবে এবং সর্বোপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকেও ওই এলাকা রক্ষা পাবে। অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ বিভিন্ন সময় পরিবেশগত ছাড়পত্র, লাইসেন্স না থাকা কিংবা পরিবেশ দূষণ দায়ে হাইকোর্ট বিভিন্ন সময় অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছে। ফলে অসংখ্য অবৈধ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া, জরিমানা আদায় ও বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। দেশের আট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ ইটভাটা কার্যক্রম যাতে শুরু না হতে পারে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর হাইকোর্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে। পরিবেশ রক্ষায় উচ্চ আদালতের রায় ও আদেশের মাধ্যমে নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বাসস-কে বলেন, আমাদের দেশে পরিবেশ আইন ১৯৯৫ সালে তৈরি হয়েছিল। এর পরে বিধিমালা গৃহীত হয়েছে। কিন্তু পরিবেশ রক্ষার আইন ও বিধিমালা থাকলেও পরিবেশ রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা ছিল না। তিনি উল্লেখ করেন, উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায় ও আদেশের ফলে পরিবেশ রক্ষায় নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনায় সংশ্লিষ্টরা বাধ্য হয়েছেন। মনজিল মোরসেদ বলেন, জনস্বার্থের মামলা ও হাইকোর্টের নির্দেশনার ফলে পরিবেশ রক্ষায় অনেকটা পরিবর্তন এসেছে। সর্বোপরি, পরিবেশ রক্ষায় আমাদের উচ্চ আদালতের রায় ও আদেশগুলো অত্যন্ত প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন