০২:৩৩ পি.এম
পলিয়ার ওয়াহিদ
ঢাকা, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ : হেমন্তের মায়াবী দুপুরে চারদিকে সোনালি রোদ ঝিলমিল করছে। আকাশে কিছু ছন্নছাড়া মেঘ ভাসছে। বর্ধমান হাউসের ঘন গাছের ওপর রোদ পড়ছে। দূরে দাঁড়িয়ে পুরোনো কিন্তু আভিজাত্যময় বর্ধমান হাউসের বলাকা রঙের সৌন্দর্য দেখছিলাম। যদিও এটি জীর্ণ ও মলিন, তবুও এর রাজকীয় আভা ঠিকই ঝলমল করছে।
প্রায় একশ বছর আগে, ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কবি কাজী নজরুল ইসলাম মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকায় এসে জাতীয় কবি এই ভবনে কিছুদিন ছিলেন, যা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কবির বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনের বাসভবন ছিল। নজরুল এখানে পুকুরে গোসল ও সাঁতার কাটতেন এবং বিকাল ও সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন।
আরও পড়ুন: কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের শততম জন্মদিন আজ উদযাপন
কবির অবস্থানের স্মৃতি নিয়ে ভবনটি আজও দাঁড়িয়ে আছে। স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে ২৯ আগস্ট ১৯৭৮ সালে দোতলার পশ্চিমপাশে কবির থাকার ঘরটিকে ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’ হিসেবে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেন জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন। আজ আমি সেই স্মৃতিকক্ষ দর্শনে এসেছি এবং সরেজমিনে এর প্রকৃত অবস্থা জানার চেষ্টা করছি।
বর্ধমান হাউসে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই বাইরে রঙচটা বিশাল দেয়ালে একটি ক্ষুদ্র কাচের সাইনবোর্ড দেখা যায়। সেখানে ছোটহরফে লেখা রয়েছে দ্বিতীয় তলায় ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ।’ এটি আলাদা করে চোখে পড়ার মতো নয়। সিঁড়ি ভেঙে নিচতলায় পা রাখতেই বাঁপাশে ‘জাতীয় সাহিত্য ও লেখক জাদুঘর’ দেখা যায়। জাদুঘরের অনুমতি নিয়ে ছবি তোলার পর দ্বিতীয় তলায় প্রবেশ করি।
পুরোনো মেহগনি কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে চোখে পড়ে ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতির ছাপ। সিঁড়ির পাশে সূক্ষ্ম কারুকাজ করা লোহার রেলিং রয়েছে। কাঠ ও লোহার এই যুগলবন্দিতে যেন আজও বেঁচে আছে বর্ধমান হাউসের আভিজাত্য ও ইতিহাস।
দোতলায় ওঠার পর ডানপাশে ‘ভাষা আন্দোলন জাদুঘর’ এবং বামদিকে ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’ রয়েছে।
আরও পড়ুন: বাবুই শিশুসাহিত্য উৎসব ২০২৬: ২৪ লেখক পেলেন সম্মাননা
সেখানে নজরুল ও বিষাদসিন্ধুর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেনের আবক্ষ ভাস্কর্য রয়েছে। বাইরে বিশাল তালা ঝুলতে দেখে হতাশ হয়ে পড়ি। জানতে পারি, কক্ষটি সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
অগত্যা পরের দিন আবার আসি। সেদিনও তালা ঝুলতে দেখি। বাংলাদেশ শিল্পীকল্যাণ ট্রাস্টের অফিসে একজনকে পেয়ে জানালেন, ‘ও রুমের লোক পাশের বিল্ডিংয়ে গেছেন।’ এরপর তৃতীয় তলায় উঠে যাই। সেখানে ‘মহাফেজখানা’ ও ‘লোকঐতিহ্য জাদুঘর’ ঘুরে নিচে নেমে আসি। কিছুক্ষণ পর গিয়ে দেখি এবার দরজা আবছা ভেড়ানো।
মনটা খুশিতে ভরে গেল। ভেতরে প্রবেশের জন্য জুতা খুলতে হলো। মনে হলো, শ্রদ্ধামাখা কোনো ঘরে ঢুকছি। যদিও কল্পনার মতো নয়, তবে এটি ছিমছাম ও সাদামাটা ছোট কামরা। নজরুলবর্ষ উপলক্ষে সংস্কারের কাজ চলছে। ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’ বলতে কয়েকটি ছোট-বড় ছবি ও কিছু বইপত্র রয়েছে। তিনটি বইয়ের আলমারিতে সাজানো বই ও পত্রপত্রিকা রয়েছে। সামান্য আয়োজন হলেও শ্রদ্ধা ও যত্নের অভাব নেই। এটি বেশ পরিষ্কার ও পরিপাটি।
কক্ষের চারদিক নজরুলের বিভিন্ন ধরনের ছবি দিয়ে সাজানো। বাঁদিকের প্রথম ছবিতে দুই নারীকে নজরুলের গান শেখানোর দৃশ্য দেখা যায়। তার নিচে নজরুলের তিন ছেলে সাব্যসাচী, অনিরুদ্ধ ও বুলবুলের ছবি রয়েছে। এরপর নজরুলের প্রৌঢ় ও যৌবনের দুটি ছবি টাঙ্গানো। নতুন কালেকশানগুলো এখনো অপ্রস্তুতভাবে রাখা হয়েছে। বেশিরভাগ ছবির পাশে ক্যাপশন নেই, ফলে চিহ্নিত করতে বেগ পেতে হয়। বড় একটি টেবিলের ওপর প্রমীলার ছবি, কবির গানের খাতা ও পাণ্ডুলিপি রয়েছে। পুরোনো কিছু ছবি নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। আরেকটি টেবিলে কাঁঠালি রঙের ফুলদানিতে বেগুনি ও কুসুম রঙের ফুলের পাশে নজরুলের ছোট আবক্ষ মূর্তিটি আকর্ষণীয়। তার পাশেই নজরুলকে ঘিরে তৎকালীন ঢাকার লেখক সমাজের সাদাকালো ছবি রয়েছে।
আরও পড়ুন: কবি মোহাম্মদ রফিকের জন্মদিন আজ, যিনি এরশাদের শাসনে কবিতার মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছেন
'নজরুল স্মৃতিকক্ষ' সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রখ্যাত নজরুল গবেষক ও আধিপত্যবাদবিরোধী কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, "বহুদিন যাবত শুনেছি কক্ষটি সংস্কার করা হবে। কিন্তু করা হচ্ছে না কেন জানি না।"
নজরুল কক্ষ নিয়ে কোনো আইডিয়া আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, "সবচেয়ে ভালো হবে বাংলা একাডেমির পুকুরটিকে ‘নজরুল স্মৃতিবিজড়িত পুকুর' লিখে ঘাটে একটা বড় সাইনবোর্ড ব্যবহার করলে। নজরুল বর্ষে এটি অভিনব ঘটনা হবে।"
বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের দোতলায় অবস্থিত নজরুল স্মৃতিকক্ষ শুধুমাত্র কবির স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের স্থান নয়, এটি নজরুলের সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বাংলা একাডেমির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এখানে কবির রচনাবলি ও তাঁর জীবন-সাহিত্য বিষয়ক বিভিন্ন উপকরণ সংরক্ষিত রয়েছে।
নজরুল গবেষণায় পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক আনোয়ারুল হক বলেন, "নজরুল স্মৃতিকক্ষে নজরুলের ওপর গবেষণাধর্মী সব বইয়ের কালেকশন ও ঢাকায় নজরুল আর কী কী করেছেন তার একটি দিনপঞ্জিও থাকতে পারে। এ ছাড়া বাংলা একাডেমিতে ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’ আছে, এটা অনেকেই জানে না। এর প্রচার-প্রচারণা দরকার।"
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
জাদুঘর থেকে বেরুতেই কবি ও প্রতিভাবান গীতিকার মহসিন আহমেদের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "নজরুল স্মৃতিকক্ষসহ বাংলা একাডেমিতে এতগুলো জাদুঘর আছে, তা বেশিরভাগ দর্শক তো দূরের কথা লেখকরাই জানেন না। একাডেমির প্রধান গেটে জাদুঘরগুলোর একটা ম্যাপ থাকলে ভালো হয়।"
নজরুল বর্ষ ও নজরুল গবেষকদের এসব দাবির প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, "আমাদের নজরুল একাডেমি বা ইনস্টিটিউটের মতো ডেডিকেটেড তেমন কিছু করার সুযোগ কম। তবুও আমরা কক্ষটি সংস্কারের কাজে হাত দিয়েছি। সংস্কার ও নতুনরূপ দেওয়ার জন্য বিখ্যাত আলোকচিত্রী ও লেখক নাসির আলী মামুনের সঙ্গে চুক্তিও করেছি। তিনি কবির ছবির বিরল কিছু সংগ্রহ দিয়েছেন। কিছু ছবির সেটাপের কাজ চলছে। কক্ষ ছোট হওয়ায় সব ছবি ধরবে না। যতটা নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন করা সম্ভব, সেটা করব। এ ছাড়া কাজী নজরুলের ওপর গবেষণাধর্মী বইয়ের সংগ্রহ তো আছে।
আরও বাড়ানো হবে। আর পুকুরের বিষয়টি যেহেতু আলোচনায় এসেছে, আমরা পদ্ধতিমাফিক আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবো।"
বর্ধমান হাউসের মূল ফটক পেরিয়ে যখন রাস্তায় নামি, তখন সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। ভাবছিলাম, নজরুল স্মৃতিকক্ষের সংস্কারের পাশাপাশি কক্ষটির পরিচিতি বাড়াতে প্রচার-প্রচারণা ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি। এতে কক্ষটি নতুন প্রজন্মের নজরুলচর্চা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হবে। সংশ্লিষ্টদেরও প্রত্যাশা এমনই।
আরও পড়ুন: লালন সাঁইকে স্মরণে দেশজুড়ে আয়োজন, ঢাকায় বিশেষ অনুষ্ঠান ১৭ অক্টোবর
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন