০৫:৪৭ পি.এম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) রেলস্টেশনে গভীর রাতে ঘুমন্ত দুই পথশিশুর ওপর দলবদ্ধ ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ মাকসুদ আলী নামের একজনকে আটক করেছে এই ঘটনায়।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলস্টেশন এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শিশুদুটিকে এক হাজার টাকার প্রলোভন দেখিয়ে সঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা করে চার থেকে পাঁচজন ব্যক্তি। শিশুদুটির রাজি না হওয়ার পর তাদেরকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে শিশুদুটির চিৎকার শুনে স্থানীয় একজন এগিয়ে আসলে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। পরে সকালে অভিযুক্তদের একজনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
আটক ব্যক্তির পকেট থেকে উদ্ধার হওয়া পরিচয়পত্র অনুযায়ী, তার নাম মাকসুদ আলী। পরিচয়পত্রে তার ঠিকানা সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার তেলিয়া গ্রাম উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত চবির ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মিনহাজ আলম সৌরভ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি চললেও পরীক্ষার কারণে তিনি ক্যাম্পাসসংলগ্ন জিরো পয়েন্ট এলাকায় অবস্থান করছেন। ফজরের নামাজ শেষে ফেরার পথে রেলস্টেশনে কয়েকজন মানুষকে জড়ো হতে দেখে তিনি সেখানে যান। পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত জানতে পারেন।
তিনি বলেন, রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলস্টেশনে আশ্রয় নিয়েছিল দুই পথশিশু। তাদের একজনের বয়স আনুমানিক ১৩ থেকে ১৪ বছর এবং অন্যজনের বয়স ১০ বছরের নিচে। রাত সাড়ে ৩টার দিকে চার থেকে পাঁচজন ব্যক্তি তাদের কাছে গিয়ে এক হাজার টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সঙ্গে যেতে বলে। শিশুদুটি রাজি না হলে তাদের মুখ চেপে ধরে এবং হাত-পা ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।
একপর্যায়ে শিশুদুটি চিৎকার শুরু করলে পাশ দিয়ে যাওয়া একজন ব্যক্তি এগিয়ে আসেন। তার উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। পরে ওই ব্যক্তি শিশু দুটিকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান এবং তাদের খাবারের ব্যবস্থা করেন। পরে রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে শিশুদুটিকে নিয়ে আবার স্টেশনে ফিরে গেলে অভিযুক্তদের একজনকে সেখানে দেখতে পান ওই ব্যক্তি। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
মিনহাজ আলম সৌরভ জানান, ফজরের নামাজ শেষে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনিও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি একটি মোটা কাঠের লাঠি দিয়ে তাকে আঘাতের চেষ্টা করেন। পরে উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির হাতাহাতি ও মারধরের ঘটনা ঘটে।
তিনি আরও জানান, ঘটনার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির কাছে হস্তান্তরের জন্য প্রক্টরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রথমে ফোনে সাড়া না পেলেও পরে নিরাপত্তাকর্মীদের মাধ্যমে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। এরপর প্রক্টরিয়াল বডির একজন প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্তকে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেন।
তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হেফাজতে নিতে প্রথমে অনীহা প্রকাশ করে বলে অভিযোগ করেন সৌরভ। তার দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মারধর করা হয়েছে উল্লেখ করে পুলিশ তাকে আগে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। এ নিয়ে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়ে যায়।
এদিকে অভিযুক্ত ব্যক্তির ছবি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক নারী শিক্ষার্থী তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন। ওই শিক্ষার্থীর দাবি, এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন মাশাল্লাহ হোটেলের গলি দিয়ে যাওয়ার সময় একই ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করেন। একপর্যায়ে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করে চলে যান। সে সময় একা থাকায় তিনি কোনো প্রতিবাদ করতে পারেননি।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি তৌহিদ আরটিভি নিউজকে বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন যেকোনো স্থানে শিক্ষার্থী কিংবা বহিরাগত সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ও নিরাপত্তা দপ্তরের। ঘটনাটি গভীর রাতে ঘটেছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি চলমান থাকায় নিরাপত্তাকর্মীদের কিছুটা সংকট থাকতে পারে। তবে সেটি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার পর প্রক্টরিয়াল বডির পক্ষ থেকে দ্রুত সাড়া না দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আমরা তাদের কাছে জবাবদিহি চাইব। কেন তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়নি, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আমরা পুলিশের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করব। পুলিশ যেন তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে এবং অভিযুক্তকে আদালতে সোপর্দ করে, সেটি নিশ্চিত করার চেষ্টা করব। পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া আদালতের এক্তিয়ারভুক্ত।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হোসেন বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। বিষয়টি এখন পুলিশের অধীনে রয়েছে। তারা আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সঙ্গে এর আগেও অশোভন আচরণের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ আগে আমাদের কাছে আসেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হতো। এমনকি অভিযোগ ছাড়াও এ ধরনের কোনো ঘটনা আমাদের নজরে এলে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসআরবি পরিচয়ে ব্যবসায়ীকে অপহরণ, পুলিশ উদ্ধার অভিযান
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে রাতে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার সময় স্টেশন এলাকায় কিছু ভাসমান মানুষের আনাগোনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে আজ থেকেই আমাদের টহলদলকে স্টেশনগুলোতে নজরদারি ও টহল জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুর রহমান আরটিভি নিউজকে বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমাদের কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি, আদালতে পাঠানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: হাসপাতালের টয়লেট নিজ হাতে পরিষ্কার করলেন এমপি খোকন
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন