০১:৫৮ পি.এম
গাইবান্ধা, ১৮ জুলাই, ২০২৬ : কথায় আছে ইচ্ছা থাকলে সবই সম্ভব। এরই এক জ্বলন্ত উদাহরণ হলো ত্রিশ বছর বয়সী গাইবান্ধার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শরিফুল ইসলাম। তিনি প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে পরিবেশবান্ধব কাগজের কলম তৈরি করে এলাকায় ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছেন। তার তৈরি করা বিশেষ এই কলম স্থানীয় এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর ফলে তার আয়ও হচ্ছে ভালো। গাইবান্ধা শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে বোয়ালী ইউনিয়নের উত্তর ফলিয়া গ্রামে শরিফুল ইসলামের বাড়ি অবস্থিত।
সরেজমিনে শরিফুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট একটি উঠানে বসে কাগজের কলম তৈরি করছেন তিনি। জন্মগতভাবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হলেও দু’হাতের ছোঁয়ায় মুহূর্তের মধ্যে একেকটি কলম তৈরি করে ফেলছেন। যা যে কারো নজর কাড়ার মতো। তার বাবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। করোনার সময়ে তার ব্যবসায় ধস নামিয়ে পুঁজি হারান, ফলে তিনি পথে বসার মতো অবস্থায় পৌঁছান। ওই সময়ে নিজের খরচ চালানোর জন্য ২০২৩ সালে তিনি কলম ও খাতা তৈরি শুরু করেন। শুরুর দিকে তার জন্য এটি মোটেও সহজ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সহযোগিতায় প্রথম কলম ও খাতা তৈরি শুরু করেন। পরবর্তীতে আস্তে আস্তে শিক্ষার্থীদের মাঝে তার এই পরিবেশবান্ধব কলম খাতা সাড়া ফেলে।
শরিফুল প্রতিবন্ধী হয়ে বসে থাকেননি। প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজার কলম ও ৫শ’ খাতা পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করেন। তিনি খাতা বিক্রি করেন ২০ থেকে ৪০ টাকায়। প্রতিটি কলমের দাম ১০ টাকা। পূর্বে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার কলম খাতা অর্ডারের মাধ্যমে গেলেও বর্তমানে শহর থেকে ১ কিলোমিটার দূরে পুলবন্দি বাজারে তিনি ছোট একটি দোকান ভাড়া নিয়েছেন। সেখানেই ব্যবসার প্রচার ও তার তৈরি পরিবেশবান্ধব কলম খাতা বিক্রি করছেন।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শরিফুল গাইবান্ধা ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি যুদ্ধে চান্স পান এবং সেখান থেকে ২০২৩ সালে সমাজতত্ত্বে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ২০২৫ সালে একই বিষয়ে তিনি স্নাতকোত্তর শেষ করেন।
কলম তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ। প্রথমে বিভিন্ন রঙের কাগজের মধ্যে কালির শীষ পেঁচিয়ে আঠা দিয়ে ভালোভাবে মুড়ে দেওয়া হয়। সবশেষে, কলমটিকে রোদে শুকিয়ে শক্ত করা হয়। এইভাবে তৈরি হয় পরিবেশবান্ধব কাগজের কলম। বর্তমানে তার তৈরি করা পরিবেশবান্ধব কলম এলাকায় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শরিফুল ইসলাম সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের উত্তর ফলিয়া গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে।
শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান বাসস’কে বলেন, "শরিফুল ইসলাম আমাদের জীবনে বাস্তব এক জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েও সব বাঁধা পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা শেষ করেছেন। অন্যের ওপর নির্ভর না করেও তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। অনেকেই পড়াশুনা শেষ করে বাড়িতে বসে থাকেন। কিন্তু শরিফুল প্রতিবন্ধকতা জয় করে জীবনের এই যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। আমি আশা করছি যে একদিন তিনি দেশের সফল উদ্যোক্তা হবেন।"
কলেজ শিক্ষক হারুন অর-রশিদ বাসস’কে বলেন, "শরিফুল এলাকার একজন খুব নম্রভদ্র ছেলে। তিনি একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সত্ত্বেও দেশের বোঝা না হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, এটি গর্ব করার মতো।"
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
এ বিষয়ে উদ্যোক্তা শরিফুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, "প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যেহেতু আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছি, তাই কোমলমতি শিক্ষার্থী ও পরিবেশের কথা চিন্তা করেই পরিবেশবান্ধব কলম খাতা তৈরির উদ্যোগ নিই। এসব বিক্রি করেই হাত খরচ চলাতে পারি। কিছু টাকা জমও করছি ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর জন্য।"
তিনি আরও বলেন, "কোনভাবে আর্থিক সহায়তা পেলে নিজের তৈরি শিল্পকে আরও বড় পরিসরে গড়ে তোলার চিন্তা আছে আমার।"
গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবুজ কুমার বসাক বাসস’কে বলেন, "শরিফুল ইসলামের ব্যবসার উন্নতির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যত ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায়, সেগুলো তাকে দেওয়া হবে।"
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন