০১:৪৩ পি.এম
কক্সবাজারে টানা নয় দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি এখন উন্নতি হতে শুরু করছে। তবে এর মাধ্যমে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গেই ধ্বংসের চিহ্নগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে। বিধ্বস্ত বাড়িঘর, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, বেড়িবাঁধ, বিপন্ন কৃষি এবং বিপর্যস্ত মৎস্য খাত সমর্থনে অতে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগের পানি নেমে গেলেও এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং বন্যার রেখে যাওয়া ক্ষত সারানো বিষয়টি।
এদিকে, সোমবার (১৩ জুলাই) রাতে কক্সবাজারে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মতবিনিময় সভা শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, ত্রাণের পাশাপাশি বর্তমানে পুনর্বাসনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
বৃষ্টি থামলেও কাটেনি দুর্ভোগ। কক্সবাজারের রামু উপজেলার কালাখন্দকার পাড়ার রিকশাচালক মাহমুদুল হকের ঘর এখনো বন্যার পানিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কোমরসমান পানি পেরিয়ে তিনি দেখছেন ভেঙে পড়া বসতির ঘেরা-বেড়া এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া সংসারের সবশেষ সম্বল। মাহমুদুল হক আক্ষেপ করে বলেন, 'বন্যায় আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়সহ প্রয়োজনীয় সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। অথচ এখনো কোনো সাহায্য কপালে জোটেনি।'
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানিয়েছেন, গত ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা নয় দিনে রেকর্ড ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭০টি এবং ৫টি পৌরসভার মধ্যে ৪টি প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে জেলার অন্তত ৪৯ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায় এবং প্রায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
উপজেলাভিত্তিক প্লাবিত এলাকার চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হয়েছে পেকুয়া উপজেলার ৯৫ শতাংশ এলাকা। তার পরবর্তী এলাকায় মাতামুহুরী ৮৫ শতাংশ, চকরিয়া ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়া ৬৫ শতাংশ এবং মহেশখালী ৫০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে রামু উপজেলার ৩৫ শতাংশ, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় ২৫ শতাংশ করে এবং ঈদগাঁও উপজেলার ৫ শতাংশ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
টানা বৃষ্টির ফলে পাহাড় ধসসহ বন্যাজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ৩১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া আরও একজন নিখোঁজ রয়েছেন।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে উখিয়া উপজেলায়। সেখানে পাহাড় ধসে ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিকসহ মোট ১৪ জন মারা গেছেন। এছাড়া, চকরিয়ায় ৬ জন নিহত ও ১ জন নিখোঁজ হন। কক্সবাজার সদরে ৩ জন, পেকুয়া ও রামুতে ২ জন করে এবং মাতামুহুরী, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় ১ জন করে মারা গেছেন।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় জেলায় মোট ১ হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিধ্বস্ত হয়েছে পেকুয়া উপজেলায়, যেখানে ৪৫০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যান্য উপজেলার মধ্যে চকরিয়ায় ৩০০টি, কুতুবদিয়ায় ২৫০টি, মহেশখালীতে ২০০টি, মাতামুহুরীতে ১৯টি, টেকনাফে ১০০টি, উখিয়ায় ৫০টি, ঈদগাঁওয়ে ৩০টি, রামুতে ২৫টি এবং কক্সবাজার সদর উপজেলায় ১৮টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বন্যার পানিতে ভেসে গেছে পুকুর ও চিংড়িঘেরের মাছ। কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানিয়েছেন, জেলার ১০টি উপজেলার ৬১টি ইউনিয়নের মোট ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ৪৫৩টি চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মোট আয়তন প্রায় ২ হাজার ৪৪০ হেক্টর।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
এসব জলাশয় থেকে ১ হাজার ৯৭ মেট্রিক টন মাছ, ৩৮৫ মেট্রিক টন চিংড়ি, ৩ কোটি ৫৬ লাখ মাছের পোনা এবং ২ কোটি ২১ লাখ চিংড়ির পোনা ভেসে গেছে। এছাড়া ৭৬৮টি পুকুর, ঘের ও খামারের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে মৎস্য খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বন্যায় আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পানবরজ ও শাকসবজিসহ ৪ হাজার ২িল্ল হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে জেলার ৯টি উপজেলার মোট ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক জানান, 'এটি প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে গেলে মাঠপদক্ষেপে যাচাই শেষে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।'
ক্ষতিগ্রস্ত জমি ও কৃষকের খতিয়ান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চকরিয়ায় ১ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমিতে ১৩ হাজার ৮৫২ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কুতুবদিয়ায় ১ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে ৬ হাজার ৪১৫ জন, পেকুয়ায় ৫০০ হেক্টর জমিতে ৭ হাজার ২০ জন, রামুতে ৩৪০ হেক্টর জমিতে ৪ হাজার ৮৭৫ জন এবং মহেশখালীতে ২৩৭ হেক্টর জমিতে ৪ হাজার ৩২০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এছাড়া টেকনাফে ১৪০ হেক্টর জমিতে ৩ হাজার ১২০ জন, ঈদগাঁওয়ে ৭৫ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ৩০৪ জন, কক্সবাজার সদরে ৮৮ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ১৬৬ জন এবং উখিয়ায় ৫০ হেক্টর ফসলি জমিতে ১ হাজার ১৩৮ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসআরবি পরিচয়ে ব্যবসায়ীকে অপহরণ, পুলিশ উদ্ধার অভিযান
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, পাউবো-১-এর আওতাধীন ৩৮০.২৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় মোট ৪৪টি স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চকরিয়ার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত মেরামত কাজ শুরু করা হবে।
অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের হিসাব মতে, বন্যায় ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ায়। চকরিয়ায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট, মাতামুহুরীতে ১৯০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট এবং পেকুয়ায় ২৩০ কিলোমিটার সড়ক ও ২টি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া রামুতে ৫০ কিলোমিটার, কক্সবাজার সদরে ২০ কিলোমিটার, কুতুবদিয়ায় ৯ কিলোমিটার এবং উখিয়া, টেকনাফ ও ঈদগাঁওয়ে ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার করে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেতু ও কালভার্টের মধ্যে টেকনাফে ১৫টি, উখিয়ায় ১২টি, রামুতে ৫টি, কক্সবাজার সদরে ৪টি এবং পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় ২টি করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভারী বর্ষণ ও বন্যায় কক্সবাজারের মোট ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তালিকায় দেখা গেছে, পেকুয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলায় ১৫টি করে মোট ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য কোনো উপজেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতির তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, ৯ দিনের দুর্যোগে জেলার ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে মোট ১,৫৮০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। প্লাবিত এলাকার দুর্গতদের মাঝে এ পর্যন্ত ৭,৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ২৯৮ মেট্রিক টন চাল ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে। জরুরিভিত্তিতে আরও ত্রাণের চাহিদা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: হাসপাতালের টয়লেট নিজ হাতে পরিষ্কার করলেন এমপি খোকন
বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামত, কৃষকের ফসল ও মৎস্য খাতের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।
জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মতবিনিময় সভায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন যে, স্লুইস গেটগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত না হওয়ায় বন্যার তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে গেছে। এ বিষয়টি দ্রুত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি আরও জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় মানবিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী জনগণকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
ত্রাণ বিতরণে বৈষম্যের অভিযোগ সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকা এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছালেও দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় পৌঁছাতে সময় লাগছে। সাতকানিয়াসহ কিছু এলাকায় সড়ক বিচ্ছিন্ন থাকায় সেনাবাহিনীর স্পিডবোট ব্যবহার করেও বেগ পেতে হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সীমিত নৌযানের কারণে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও পুলিশের লজিস্টিকস সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা পাঠানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো ক্ষুধার্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ যেন সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা হবে।
আরও পড়ুন: ভাড়া বাসায় মিলল প্রবাসীর স্ত্রীর মরদেহ, প্রেমিক উধাও
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন