১০:২২ পি.এম
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বেড়িবাঁধের বাইরের অন্তত ছয় হাজার পরিবারের জলোচ্ছ্বাস ঝুঁকি বহুগুণে বেড়েছে। বর্ষা শুরু হলেই এই উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মনে এক অজানা আতঙ্ক ভর করে। আকাশে মেঘ জমা হওয়া, সাগরে নিম্নচাপ অথবা পূর্ণিমার জোয়ারের খবর এলেই বেড়িবাঁধের বাইরের গ্রামের মানুষ রাতের ঘুম হারায়। কারণ, যে কোনো মুহূর্তে জলোচ্ছ্বাসের পানি তাদের বসতভিটায় হামলে পড়তে পারে। ২০২৫ সালের বর্ষা মৌসুমে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। অস্বাভাবিক জোয়ার, নিম্নচাপজনিত জলোচ্ছ্বাস এবং টানা বর্ষণে কলাপাড়ার অন্তত ছয়টি ইউনিয়নের উপকূলীয় জনপদে ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়। কিন্তু এবছর বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিক জোয়ারেও পানির উচ্চতা ক্রমশ বাড়ছে। তিন নম্বর সতর্ক সংকেতকালীন সময় জলোচ্ছ্বাসে বাড়িঘর ডুবে যায়। রান্নার চুলা পর্যন্ত ডুবছে। বাস উপযোগিতা হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন এসব মানুষ। অনেকে বলছেন তারা ৫০ বছর ধরে এখানে বসবাস করছেন। কিন্তু এখন পানির চাপ ক্রমশ বাড়ছে এবং ঘরের ভিটি উচু করেও শেষ রক্ষা হয় না।
টিয়াখালী পশ্চিম লোন্দা সেতুর পূর্বপাশে ধানখালীর লোন্দায় বেড়িবাঁধের বাইরে প্রায় ২৫০ পরিবারের বসবাস। তারা জানিয়েছেন, এবছর পানির চাপ এত বেশি যে বাড়িঘরে তারা থাকতে পারছেন না। সেখানে বাসিন্দা হালিমা আয়শা জানান, অমাবস্যা-পুর্ণিমার সময় তারা পানিবন্দী থাকেন। এখন নরমাল জোয়ারেও পানির উচ্চতা বাড়ছে। বাড়িঘর ডুবে যায়। আর তিন নম্বর সংকেত থাকলে তো সবই ডুবে যায়। তাদের প্রটেকশনের নিজস্ব রিং বেড়িবাঁধও ভেঙে গেছে। আজ শনিবার দুপুরেও অস্বাভাবিক জোয়ার বইছে। জোয়ারের সময় পানিতে সব থৈ থৈ করে। বাস উপযোগিতা থাকছে না। রাতের বেলায় জলোচ্ছ্বাসের ভয়ে জেগে থাকতে হচ্ছে। নীলগঞ্জের সলিমপুর গ্রামে বেড়িবাঁধের বাইরের বাসিন্দা শিক্ষার্থী নুরুল করিম জানান, এখন পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় জোয়ার জলোচ্ছ্বাসে পরিণত হয়। এটি গত তিন বছর ধরে একইভাবে চলছে। ক্রমশ পানির চাপ বাড়ছে। নরমাল সময়ে আগে এমন আর দেখেননি। সমস্যার যেন শেষ নেই।
ধানখালীর সাবেক চেয়ারম্যান রিয়াজউদ্দিন তালুকদার জানিয়েছেন, লোন্দা থেকে নমরহাট বাজার পর্যন্ত বেড়িবাঁধের বাইরের ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস করছে প্রায় এক হাজার পরিবার। পুরো ইউনিয়নে রয়েছে আরও অন্তত পাঁচশত পরিবার। তিনি জানিয়েছেন, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে এই পরিবারগুলোতে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকছে। তবুও ঝুঁকি নিয়ে মানুষগুলো বসবাস করছেন। তারা আগে বেড়িবাঁধের স্লোপে থাকতেন, এখন বাঁধের উন্নয়নসহ ওইসব এলাকা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। রাস্তাগুলো সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বাঁধের স্লোপ থেকে এসব মানুষ উচ্ছেদ হয়ে গেছে। চম্পাপুর ইউনিয়নে বেড়িবাঁধের বাইরে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে অন্তত ৬০টি পরিবার। তাদের বসবাস চরম ঝুকিপূর্ণ।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
বালিয়াতলীর চেয়ারম্যান এবিএম হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, তার ইউনিয়ন বালিয়াতলীর চরনজীব থেকে বাবলাতলা বাজার পর্যন্ত প্রায় দুইশত পরিবার বেড়িবাঁধের বাইরে অবস্থান করছে। তাছাড়া পক্ষিয়াপাড়া বাজার থেকে শনিবারের বাজার পর্যন্ত আরও সাত আটটি পরিবার বাঁধের বাইরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। ডালবুগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাওলানা হেদায়েত উল্লাহ জেহাদী জানিয়েছেন, ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব ডালবুগঞ্জে ৪১টি ঘর আছে। গাববাড়িয়া বাঁধ থেকে মেহেরপুর পর্যন্ত ৪৫টি পরিবার। ডালবুগঞ্জ, থানখোলাস্লুইস, রসুলপুর, পেয়ারপুর, ফুলবুনিয়ায় ৪০টি এবং মনষাতলী, খাপড়াভাঙ্গা ও বরকুতিয়ায় আরও ৩০টি পরিবার বেড়িবাঁধের বাইরে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস করছে। মিঠাগঞ্জের চেয়ারম্যান মেজবাহ উদ্দিন খান দুলাল জানিয়েছেন, ইউনিয়নের তেগাছিয়া বাজারের আশপাশে ২৫টি পরিবার, মিঠাগঞ্জে তিনটি, মেলাপাড়া ৪০টি, উত্তর চরপাড়া ৬৮টি, দক্ষিণ চরপাড়া প্রায় ১০টি এবং মধুখালীর লেকের দুই পাড়ে অন্তত ৬০টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস করছে। লতাচাপলীর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, এই ইউনিয়নের সহস্রাধিক পরিবার অস্বাভাবিক জোয়ারের সময় পানিবন্দী থাকে। এসব পরিবার বেড়িবাঁধের বাইরের ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস করছে। মম্বিপাড়া, দক্ষিন মুসুল্লিয়াবাদ, নাইয়রিপাড়া, গোড়া আমখোলা পাড়া, লক্ষীর বাজার এলাকা এসব পরিবারের বসবাসের ক্ষেত্র।
ধুলাসার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুর রহিম জানিয়েছেন, এখানকার গঙ্গামতি, চরগঙ্গামতি ও কাউয়ারচরে অন্তত দুই হাজার পরিবার খুব ঝুকিপূর্ন অবস্থায় বসবাস করছে। এদের বর্ষা মৌসুমে অস্বাভাবিক জোয়ারে বাড়িঘর ছাড়তে হয়। সিডরের সময় এখানে প্রাণহানি ঘটে চার জনের। লালুয়ার চেয়ারম্যান শওকত হোসেন তপন বিশ্বাস জানিয়েছেন, বেড়িবাঁধের বাইরের ঝুঁকিপুর্ণ সহস্রাধিক পরিবার বসবাস করছে। এক যুগ ধরে বেড়িবাঁধ না থাকায় এসব পরিবারে এখন জীবিকার দুর্ভোগ পরিণত হয়েছে পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে। তাদের ভোগান্তি যেন অন্তহীন। একই দৃশ্য ১২টি ইউনিয়নের সর্বত্র। এইভাবে অন্তত ছয় হাজার পরিবার বেড়িবাঁধের বাইরের চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে। এসব পরিবারের কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করে। তাদের অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময় বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে কাটে বিনিদ্র রাত। জলোচ্ছ্বাস আতঙ্কে রয়েছে এসব হাজার হাজার পরিবারের মানুষ। আর এখন এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে। এসব পরিবারের পুনর্বাসনে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে ভুক্তভোগীরা জানান।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুজ্জামান জানিয়েছেন, বেড়িবাঁধের বাইরের বাসিন্দাদের জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের সঙ্গে আলোচনা করে স্থায়ী একটি পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনার কাজ শুরু করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন