১১:২৫ এম
মোতাহার হোসেন
ঢাকা, ২১ জুলাই, ২০২৬ : রাজধানীর ১২০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ইতোমধ্যে ১২টি পয়েন্টে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী মাসখানেকের মধ্যে এই সংখ্যা ৬০ পর্যন্ত পৌঁছাবে বলে জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।
এছাড়া, যানজট হ্রাস করতে গত প্রায় এক বছরে নগরীর ৭৫টি পয়েন্টে সড়ক ডাইভারশন ও স্থাপত্যগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। ডিএমপির পরিকল্পনা রয়েছে ভবিষ্যতে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) ভিত্তিক ট্রাফিক নজরদারির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরও আধুনিকীকরণ করার।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমানে ডিএমপি ট্রাফিকে প্রায় ৪ হাজার ১০০ সদস্য কাজ করছেন। কিন্তু ছুটি, প্রশিক্ষণ ও অসুস্থতার কারণে ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ সদস্য রাজধানীর ৬৬৮টি ট্রাফিক পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে ২৫টিরও বেশি পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টা ডিউটি দিতে হয়, যেখানে তিন পালায় দায়িত্ব পালিত হয়। বেশিরভাগ পয়েন্টে দুই পালায় কাজ করা হয়।
আনিছুর রহমান জানাচ্ছেন, সীমিত জনবল দিয়ে রাজধানীর যানজট কমাতে গত বছর বিভিন্নভাবে ৭৫টি পয়েন্টে ডাইভারশন ও মডিফিকেশন করা হয়েছে। সেখানে কিছু পরিবর্তনের ফলে এখন পর্যন্ত কোন বড় ধরনের যানজট বা নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয়নি। বরং মাঠে যানজট কমার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে বলছেন, রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ-এর পশ্চিম প্রান্তে আসাদ গেটের ওপাশের চার রাস্তার মোড়ে পূর্বে বেশিরভাগ সময় যানজট লেগে থাকত এবং সেখানে বেশি সংখ্যক ট্রাফিক সদস্য মোতায়েনের প্রয়োজন পড়ত। তবে পরে ওই মোড়ে চলাচল বন্ধ করে বাম দিকে ঘুরে ইউটার্ন নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এতে বাম লেন সব সময় সচল থাকে এবং যানবাহনের চাকা থেমে থাকে না। এছাড়া যুদ্ধে মোহাম্মদপুরের বসিলা, বনানীর কাকলী, মিরপুরের ইসিবি চত্বর ও কালশী ফ্লাইওভারের নিচেও একই ধরনের ডাইভারশন ও মডিফিকেশন করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, ঢাকা একটি অত্যন্ত জনবহুল মেগাসিটি। সেক্ষেত্রে শুধু ট্রাফিক সদস্যের সংখ্যা বাড়ানো সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম হবে না।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
সড়কের নকশা বিশ্লেষণ করে বৈজ্ঞানিকভাবে ডাইভারশন এবং মডিফিকেশন করা হলে কার্যকারিতা প্রচুর বৃদ্ধি পাবে। এ কারণে ৭৫টি স্থানে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং আরও অনেক পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলি বাস্তবায়িত হলে দর্শকদের সঙ্গে আরও ভাল সেবা প্রদান সম্ভব হবে বলেও তার বিশ্বাস।
তিনি আরো বলেন, কোথায় কখন যানজট হয়, সে সম্পর্কে ট্রাফিক বিভাগের অভিজ্ঞতা রয়েছে। পিক আওয়ার, অফ-পিক আওয়ার অনুযায়ী সদস্যদের দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। তবে শুধুমাত্র ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে দীর্ঘমেয়াদী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। এই ব্যবস্থায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সংযোগ ঘটাতে হবে, সেটাই হবে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর সমাধান।
আনিছুর রহমান উল্লেখ করেছেন, রাজধানীতে ধীরে ধীরে সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। বর্তমান ১২টি পয়েন্টে এ ব্যবস্থা রয়েছে, যা আগামী এক মাসের মধ্যে ৬০টি পয়েন্ট অতিক্রম করবে। এরপর আগামী ছয় মাসে রাজধানীর প্রধান ১২০টি পয়েন্টকে এ ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
বर्तमान সিগন্যালগুলো ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সিগন্যালের সময় পরিবর্তন করা সম্ভব। তবে উন্নত দেশগুলোতে পুরো সিস্টেম একটি অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। একজন সিগন্যাল অন্য আরেকটি সিগন্যালের সাথে যুক্ত থাকে, এবং নির্দিষ্ট সময়ে কতগুলো যানবাহন এসেছে তার ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিগন্যালের সময় নির্ধারণ করা হয়।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
বর্তমানে সেমি-অটোমেটিক ব্যবস্থা চালুর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, উন্নত বিশ্বের সড়কগুলো অত্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত। যেখানে বলা হয় কোথায় কিভাবে মোড় তৈরি হবে, কত ডিগ্রি কোণে বাঁক থাকবে, এবং কোথায় উঁচু বা নিচু হবে। আমাদের দেশে সড়কব্যবস্থার পরিকল্পনা তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। এজন্য উন্নত দেশের মডেল পুরোপুরি এখানে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।
বর্তমান ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আনিছুর রহমান বলেন, গত দুই মাসে নগরবাসীর কাছ থেকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সহযোগিতা পাওয়া গেছে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ট্রাফিক আইন মেনে চলছে এবং সিগন্যাল অনুসরণ করে শৃঙ্খলা রক্ষা করছে। এর ফলে আগের তুলনায় দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকার ঘটনা কমেছে।
তবে তিনি সতর্ক করেন, ঢাকার সব সমস্যা শেষ হয়নি। ভারী বৃষ্টিপাত হলে সড়ক অচল হয়ে যায় এবং সড়ক অবরোধ করা হলে যান চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। সুতরাং ঢাকা শহরের যানজটকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বিভিন্ন সমস্যাসমূহ একে অপরকে প্রভাবিত করে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, ভারী বৃষ্টিপাতের সময় অটোমেটিক সিস্টেম পরিচালনা করতেও বিভিন্ন সময়ে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। সেক্ষেত্রে ম্যানুয়াল সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তবে ভবিষ্যতে পুরোপুরি অটোমেটিক ব্যবস্থায় যাওয়া পরিকল্পনা রয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভর করবে এ উদ্যোগের বাস্তবায়ন।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
এছাড়া, যানজট নিরসনের জন্য শুধু ট্রাফিক পুলিশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলে জানান আনিছুর রহমান। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা এবং সড়ক ব্যবহারকারী প্রত্যেক মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দেশের বড় সমস্যা হচ্ছে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। অনেক সময় প্রয়োজনীয় সমন্বয় ছাড়াই রাতারাতি রাস্তা কেটে উন্নয়ন কাজ শুরু করা হয়, যা যান চলাচলে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পর্যাপ্ত যেসব কাজে ত্রুটি সৃষ্টি হচ্ছে তাদের মধ্যেও রাস্তা কেটে কাজ শুরু করা নিয়েই বড় সমস্যা দেখা দেয়। আবার উন্নয়ন কাজের সময় ট্রাফিক সিগন্যালের কেবল কেটে ফেলায় পুরো সিগন্যাল ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা আবশ্যক।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন