১২:৩০ পি.এম
যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ইরানে নারীদের হিজাব পরার ব্যাপারটি নতুন করে টানাপোড়েনের ঝড় আনছে। দেশটির কট্টরপন্থীরা বাধ্যতামূলক হিজাবের নিয়মকে আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি তুললেও, অনেক নারী প্রকাশ্যে সেই নিয়ম মানছে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের সময়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নজর অন্যদিকে থাকায়, হিজাব ছাড়া অনেক নারী সরকারি অনুষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেখা গেছে। তবে সম্প্রতি সপ্তাহগুলোতে হিজাবের নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করার দাবি আবারও জোরালো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিভিন্ন শহরে হিজাবের নিয়ম না মানার অভিযোগে ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং দোকান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত ১৯ জুলাই তেহরানে অন্তত সাতটি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পূর্বাঞ্চলের দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশে বাধ্যতামূলক হিজাব এবং সামাজিক আচরণের নিয়ম না মানার অভিযোগে ১০টি ক্যাফে বন্ধ করার বিষয়টি ইরানের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
তবে এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও তরুণীদের মধ্যে হিজাব না পরার প্রবণতা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ছবি এবং ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের নারীরা হিজাব ছাড়া চলাফেরা করছেন। এমনকি অনেক তরুণী মোটরসাইকেল চালানোর সময়েও মাথায় হিজাব রাখছেন না।
মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পর ইরানে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। পোশাকবিধি না মানার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করা হয়। তবে এর পরেও নারীদের মধ্যে বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অনীহা পুরোপুরি থামেনি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২৪ সালের শেষের দিকে জানায়, বাধ্যতামূলক হিজাব আইন অমান্য করার জন্য নারী ও মেয়েদের দমন করার ক্ষেত্রে ইরানি কর্তৃপক্ষ আরও কঠোর এবং সহিংস ব্যবস্থা নিচ্ছে। সংগঠনের মতে, নতুন বাধ্যতামূলক হিজাব আইন নারীদের ওপর নিপীড়ন আরও বৃদ্ধি করেছে এবং এতে বেত্রাঘাত, কারাদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসেও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছিল, হিজাব পরতে অস্বীকৃতি জানানো নারী ও মেয়েদের ওপর নজরদারি, গ্রেপ্তার, আটক এবং অন্যান্য হয়রানি বাড়ানো হয়েছে। সংগঠনটি এই পরিস্থিতিকে নারীদের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান আতঙ্ক, তিন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা
কট্টরপন্থীদের চাপ এবং সরকারের সতর্ক অবস্থানকে ঘিরে উভয়পক্ষেই যথেষ্ট টানাপোড়েন বিদ্যমান। ইরানের কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতারা প্রকাশ্যে হিজাবের নিয়ম গুরুত্ব সহকারে মানানোর দাবি করছেন। তেহরানের জুমার নামাজের ইমাম মোহাম্মদ জাভাদ হাজ আলী আকবরি অভিযোগ করছেন যে, নারীদের মধ্যে ‘অশালীনতা’ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একটি সংগঠিত প্রচেষ্টা চলছে।
হিজাব না পরার কারণে শাস্তির ঘটনাও ঘটেছে। চলতি বছরের জুনে ইরানের জনপ্রিয় গায়িকা পারাস্তু আহমাদিকে ৭৪ বার বেত্রাঘাত এবং দুই বছরের জন্য দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার সাজা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি অনুষ্ঠানের ভিডিওতে তার কাঁধ এবং চুল খোলা থাকার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল।
তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান হিজাব নিয়ে জোর করে আইন প্রয়োগের বিরোধিতা করেছেন। তার মতে, মানুষের আচরণ শুধু আইন করে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়; এটি সাংস্কৃতিক এবং বিশ্বাসের বিষয়।
দেশটির সাবেক সংসদ সদস্য গোলামালি জাফারজাদেহ ইমানাবাদি মন্তব্য করেছেন যে, হিজাবের পরিবর্তে মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার সংকট মোকাবিলায় সরকারের বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: বিলবোর্ডের ছবিকে রাস্তা ভেবে সজোরে ট্রাক চালালেন চালক, অতঃপর প্রাণ হারালেন
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে বাধ্যতামূলক হিজাবের নিয়ম কার্যকর করা শুরু হয়। ইরানের ইসলামী দণ্ডবিধির ৬৩৮ ধারায় জনসমক্ষে ‘ইসলামি হিজাব’ ছাড়া নারীদের উপস্থিতিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ হিজাবের মানে বাস্তবে কী হবে, তা আইন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেনি।
২০২৪ সালে আরো একটি কঠোর আইন অনুমোদিত হলেও এর বাস্তবায়ন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে স্থগিত রাখা হয়। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দেশটির কট্টরপন্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে সরকারও এই প্রসঙ্গে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে এক নারীর বক্তব্য উঠে এসেছে, শহরের রাস্তায় অনেক তরুণী এখন খোলামেলা পোশুকে চলাফেরা করছেন এবং সেখানে হিজাব প্রায় দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, এই সকল তরুণীদের আবার হিজাব পরাতে বাধ্য করা সরকারের জন্য আগের মতো সহজ হবে না।
এখন প্রশ্ন এগুলোকে ঘিরে, যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে হিজাব নিয়ে সরকারের নতুন করে যে কঠোর অবস্থান তা কতটা কার্যকর হবে।
আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন