১০:২৩ পি.এম
এফএনএস (কুয়াকাটা, পটুয়াখালী) : | প্রকাশ: ২৬ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম
বারংবার ঝড়-জলোচ্ছ্বাস কিংবা ঘুর্ণিঝড়ের গ্রাসে থাকা জনপদ কলাপাড়ার গোটা উপকূলকে রক্ষা করে আসছে ম্যানগোভ প্রজাতির বনাঞ্চল। এই গাছপালা সবুজ দেয়ালের মতো জলোচ্ছ্বাসের ঝাপটা ঠেকিয়ে দেয়। মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনাঞ্চলের বিকল্প নেই। বেচে থাকার অবলম্বন হিসেবে এই বনাঞ্চলের নিধনে অনিরাপদ উপকূলে ফের ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনায়নের কাজ শুরু করেছে স্থানীয় বনবিভাগ। এটি ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে শুরু করা হয়েছিল। এর ফলে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনাঞ্চল বাড়তে শুরু করেছে। কোথাও প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এ প্রজাতির গাছের চারা যেমন ছইলা, কেওড়া, গোল, বাইনসহ অন্যান্য গাছের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বনবিভাগ কঠোর নজরদারি রাখছে। নতুন চরে নতুনভাবে লাগানো হয়েছে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছের লাখো চারা। গঙ্গামতির চরাঞ্চল ও আন্ধারমানিক নদী তীরের নতুন চরে এটি লাগানো হয়েছে। এটি ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় হিসেবে কলাপাড়া ও পায়রা বন্দরের মানুষকে রক্ষা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের এবং তাদের সম্পদ রক্ষা হবে। ইতিবাচক এ উদ্যোগটিকে দুর্গতিতে মানুষকে নিরাপদ রাখবে এ বিষয়ে স্থানীয় ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতামত রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ মহলটি বনাঞ্চলের আশপাশে নির্মিত স-মিল বন্ধের সুপারিশ করেছেন। উপকূলবাসীর দাবি, ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনাঞ্চলে বাড়িঘর তোলা বন্ধ করতে হবে।
কলাপাড়া উপজেলায় বনবিভাগের মোট আয়তন ১০ হাজার ১৭৭ দশমিক ১১ একর। এর মধ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে তিন হাজার নয় শ’ ৭৮ দশমিক ৩৩ একর। এর মধ্যে কুয়াকাটা বিটে ১৯৩ একর, কুয়াকাটা ক্যাম্পে ১৮১৮ দশমিক ৯৩ একর, গঙ্গামতি ক্যাম্পে ১১২৮ একর, খাজুরা ক্যাম্পে ৩৪৬ দশমিক ৮৭ একর এবং ধুলাসার ক্যাম্পের অধীন ৪৬১ দশমিক ৫৩ একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে। এছাড়া ফুলবুনিয়া, বালিয়াতলী ও লালুয়া এলাকায় বনায়ন করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
বিভিন্ন তথ্যসূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ১৯৫৭ সাল থেকে সাগরপাড়ের এই জনপদে বনায়নের কাজ শুরু হয়। ম্যানগ্রোভ ও ননম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনায়ন করা হয়। ষাটের দশকের মাঝামাঝি কৃষিকাজের স্বার্থে নদী ও সাগরের পাড় ঘিরে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। লোনা পানির কবল থেকে মানুষকে তাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় এই বেড়িবাঁধ নির্মাণ হচ্ছে। বেড়িবাঁধের ভিতরে খালের সংযোগস্থলে স্লুইসগেট করা হয়। এরপর বেড়িবাঁধের বাইরে সবচেয়ে বেশি গোলগাছের বাগান সৃজন করা হয়েছে। অধিকাংশই সৃজিত হয়েছে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বাগান। ওই সময় থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত হিসাব অনুসারে কলাপাড়ায় ৪৬ একর জমিতে সেগুন গাছ এবং ২১০ একর নারিকেল বাগান তৈরি করা হয়েছে। গোলপাতা ২৭৯৪ একর, কড়ই বাগান ৬২৭ একর, গেওয়া বাগান ৩২০ একর এবং হোগলা পাতা ৪০ একর। সুন্দরী পশুর কেওড়া গাছের জন্য ১০৫ একর জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটিও দেখা গেছে যে ১৯২৯ একর ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ এবং ৩১২ একর ননম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছও লাগানো হয়েছে। পরবর্তীতে কমপক্ষে ১১৫ কিলোমিটার এলাকায় স্ট্রীপ সংযোগ সড়ক এবং বাগান করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু একটি শ্রেণির বনদস্যু বনবিভাগের কর্মীদের প্রকাশ্য যোগসাজশে বনাঞ্চল নিধন ক্রমাগত চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া, মানুষ নিজের নিত্যকাজে এবং জ্বালানির জন্য বন উজাড় করতে থাকে। বনাঞ্চলের আশপাশে স-মিল গড়ে তোলা হচ্ছে কোনও কিছু তোয়াক্কা না করেই। সরকারিভাবে এসব স মিলের অধিকাংশের বৈধ কাগজপত্র নেই এবং অভিযোগ রয়েছে যে মাসোহারায় চলছে এসব। ভূমি অফিসের কতিপয় কর্মীর কারণে বনবিভাগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেমন, মধুখালীর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলকে কৃষিজমি দেখিয়ে বন্দোবস্ত দেওয়া হচ্ছে, যেখানে প্রাচীন শত শত ছইলা, কেওড়া, বাইনগাছ কাটা হচ্ছে। বসতবাড়ি নির্মিত হচ্ছে এবং এটি চলতে থাকছে। বর্তমানে দৃষ্টিনন্দন মধুখালী লেকসহ দুই পাড়ের বনাঞ্চলটি ধ্বংসের মুখোমুখি রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান যে, দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে বনটিকে বনবিভাগ দেখভাল করে আসছে। গাছ কাটার ঘটনায় অসংখ্য বনদস্যুসহ সাধারণ মানুষকে আসামি করে মামলা পর্যন্ত করা হয়েছে। বিশাল এলাকা উজাড় করে অন্তত ছোট-বড় ১০টি মাছের ঘের করা হয়েছে। মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দূর্যোগেও সংরক্ষিত ও অসংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণ হয়েছে। ধুলাসার ক্যাম্পের অর্ধেকটা সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। একই দৃশ্য গঙ্গামতি, কুয়াকাটা ও খাজুরা লেম্বুরচর বনাঞ্চলের অবস্থা। বনবিভাগের মহীপুর রেঞ্জের কর্মকর্তা আবুল কালাম জানিয়েছেন যে পাঁচ বছর আগে গঙ্গামতি এলাকায় তারা নতুন করে ২০০ একর বনায়ন করেছেন। কলাপাড়ার বনকর্মকর্তা জানিয়েছেন যে তিনি ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে আন্ধারমানিক ও টিয়াখালী নদীর তীরে ৩০ হাজার গোলগাছের চারা লাগিয়েছেন। লাগানো হয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার কেওড়া গাছের চারা। সলিমপুর গ্রামের কাছে নীলগঞ্জের সুলতানগঞ্জ গ্রামের নদী তীরে এই গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। গাছগুলো ক্রমশ সতেজ হয়ে উঠছে। ফলে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনবৃক্ষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ধুলাসার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাফেজ আব্দুর রহিম জানিয়েছেন যে, সুপার সাইক্লোন সিডরের সময় যেসব বেড়িবাঁধের বাইরে ম্য্যানগ্রোভ প্রজাতির বনাঞ্চল ছিল, ওই এলাকার বেড়িবাঁধ খুবই কম বিধবস্ত হয়েছে। তাই তার দৃষ্টিতে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের বিকল্প নেই। স্থানীয়দের মন্তব্য, ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনায়ন নদীর পাড়ে জন্মায় এবং যা শুধুমাত্র রক্ষণাবেক্ষণ করলেই হয়, যাতে নষ্ট না হয়ে যায়। এ ছাড়া বেড়িবাঁধের বাইরের কোনো ভূমি অনিয়মতান্ত্রিকভাবে কৃষিজমি দেখিয়ে বন্দোবস্ত দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে বেড়িবাঁধ মেরামত কিংবা পুনরাকৃতিককরণ কাজে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনাঞ্চল কেটে ফেলা হচ্ছে। স্কেভেটর মেশিনে বাঁধ মেরামতের জন্য মাটি কাটতে গিয়ে বেড়িবাঁধের বাইরের ম্যানগ্রোভ প্রজাতির ছইলা-কেওড়া, বাইন ও গোলগাছ উপড়ে ফেলা হচ্ছে।
পরিবেশবাদীদের ভাষ্য হলো, অন্যান্য প্রজাতির গাছের তুলনায় ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছের কার্বণ শোষণ ক্ষমতা বহুগুণ বেশি। তাই উষ্ণায়ণ প্রতিরোধে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনাঞ্চলের বিকল্প নেই। পরিবেশ কর্মী নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিভিন্ন সময় বেড়িবাঁধ মেরামত করতে গিয়ে মাইলের পর মাইল সর্বনাশ করা হয়েছে। ইতোপূর্বে লেবারদের দিয়ে মাটি কেটে বেড়িবাঁধ মেরামতের কাজ করা হতো। এতে একদিকে মানুষের কর্মসংস্থান হতো, অন্যদিকে বাঁধটিকে জলোচ্ছ্বাসের ঝাপটা থেকে রক্ষা করার জন্য গাছটিও রক্ষা পেত। লেবাররা গাছের চারদিকের মাটি রেখে কাটত, ফলে কোন গাছ মারা পড়ত না। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড এই পদ্ধতি না মানায় ম্যানগ্রোভ প্রজাতির হাজারো গাছ গত ৫-৬ বছরে মারা পড়েছে। ফলে বাঁধ মেরামত কিংবা পুনরাকৃতিককরণে বাঁধ উচু করলেও জলোচ্ছ্বাসের ঝাপটায় চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। মূলত ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ রক্ষা এখন উপকূলের জন্য খুব জরুরি, কারণ সবুজ দেয়াল হিসেবে এটি ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় মানুষের জীবন ও সম্পদকে রক্ষা করে। ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। উপজেলায় বন ও পরিবেশ কমিটির সভাপতি ও কলাপাড়ার ইউএনও মো. আরিফুজ্জামান জানান, শীঘ্রই এ কমিটির সভা ডেকে অবৈধ করাতকল বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বন রক্ষায় পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন