০৯:১০ পি.এম
মাদক মামলায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের রায়ে আদালতের নির্দেশনামাফিক তার বিরুদ্ধে জারি হয়েছে সাজা পরোয়ানা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। কিন্তু রাজশাহীর আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী মনোয়ারুল হাসান রাসেল যিনি ‘চিট রাসেল’ নামে পরিচিত, এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। যিনি একসময় বাসের হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন, তিনি কীভাবে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আলোচিত মাদক কারবারিতে পরিণত হলেন, তার বিস্তৃত মাদক নেটওয়ার্ক কিভাবে গড়ে উঠল এবং তাঁর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগের পরও কেন মানিলন্ডারিং আইনে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, এসব প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলার দায়রা মামলা নং-৩০৯৫/২০২১, যার সূত্র কোতোয়ালী থানার মামলা নং-০৮ (০৯)১৯। এটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১)-এর টেবিল ১০(গ), ৩৮ ও ৪১ ধারায় দায়ের করা হয়। এই মামলায় পলাতক আসামি মনোয়ারুল হাসান রাসেলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে, সেজন্য অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-৪, চট্টগ্রামের বিচারক আফরোজা জেসমিন কলি গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে রাসেলকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেন। একইসাথে তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু আদালতের সেই রায় ও পরোয়ানা বাস্তবায়নের পরও রাসেল এখনও গ্রেপ্তার না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে সে কোথায়?
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
রাসেলের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নের বিষয়ে গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাতে পারেননি। তিনি থানার ওয়ারেন্ট অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। এ বিষয়ে ওয়ারেন্ট অফিসার নাজমুল হাসানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘মনোয়ারুল হোসেনের নামে একটি ওয়ারেন্ট ছিলো দায়রা ২৮৮/১৬ ঢাকা পল্টন থানার মামলার দায়রা জজ স্পেশাল আদালত-১৩’ থেকে আদালত থেকে জামিন নিয়ে, তিনি গত ১৯ জুলাই রিকল থানায় জমা দিয়েছেন। তবে, থানার আরেক দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার এসআই নুরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি এমনকি জানতে চান, ‘কেন আপনি তথ্য নিতে চান?’ এছাড়াও ‘ওয়ারেন্ট লুকিয়ে রাখা হয়েছে’ এমন প্রশ্নেরও তিনি কোনো সদুত্তর দেননি।
‘চিট রাসেল’ পরিচিতি:
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার আঁচুয়া তালতলা গ্রামের বাসিন্দা মনোয়ারুল হাসান রাসেল স্থানীয়ভাবে ‘চিট রাসেল’ নামে পরিচিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, একসময় তিনি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বড় মাদক সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিতি পান।
২০১৬ সালের ৩ আগস্ট টাঙ্গাইলের বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে র্যাব-১২ প্রায় ৬০ হাজার পিস ইয়াবা ও একটি ট্রাকসহ রাসেলকে আটক করে। এই সময় জব্দ করা ইয়াবার বাজারমূল্য ছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা। র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোরসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় তার মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক ছিল।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
এর দুই বছর পর, ২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবর গভীর রাতে রাজশাহী মহানগরীর উপশহর এলাকায় আরএমপি ও গোয়েন্দা পুলিশের যৌথ অভিযানে রাসেল ও তার স্ত্রী মরিয়মকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ৮৮০ পিস ইয়াবা। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, রাসেল দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মাদক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হন।
স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, রাসেলের মাদক ব্যবসায় প্রবেশ ঘটে হেরোইন বহনের মাধ্যমে। পরে ধীরে ধীরে তিনি নিজস্ব নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে ইয়াবা ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার করেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি মাদক ব্যবসার মাধ্যমে কয়েক বছরের মধ্যেই বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হন। রাজশাহী শহরে বহুতল ভবন, দামি ফ্ল্যাট, জমি ও অন্যান্য স্থাবর সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ও রয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করছেন, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে রাসেলের সম্পদের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস সম্পর্কিত তথ্য, তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে কি পরিমাণ সম্পদ রয়েছে এবং এসব সম্পদ বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না- এটি সম্পর্কে কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্তের তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
যাবজ্জীবন সাজা, সম্পদের উৎস নিয়ে তদন্ত কোথায়?
আইন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন হলো, একজন ব্যক্তি যখন মাদক ব্যবসার মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থাকে, তখন তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে কেন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না? মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসা, সম্পদ বা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বৈধ করার চেষ্টা করা হয়েছে কি না- তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্ত প্রয়োজন বলেও মনে করছেন অনেকেই। কিন্তু এখন পর্যন্ত রাসেলের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে কোনো মামলা বা দৃশ্যমান তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে স্থানীয়দের পাশাপাশি সচেতন মহলেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
প্রশ্ন একটাই-রাসেল কোথায়?
আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন সাজা রয়েছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। অতীতে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের রেকর্ড রয়েছে। মাদক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও দীর্ঘকাল ধরে আওয়ামী লীগের বিরোধী অবস্থান নিচ্ছে। তারপরেও সে দীর্ঘ সময় ধরে গ্রেপ্তার না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ‘চিট রাসেল’কে গ্রেপ্তার করে আদালতের সাজা কার্যকর করতে হবে এবং তার মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক, সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন