০১:২১ পি.এম
বিশ্ববাজারে ২০২৪ সালে কোকোর দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এর পর কোকোর দাম প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে। এই দরপতনের ফলে ঘানা ও আইভরি কোস্টের লাখো কোকো চাষি বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এখন অনেকের মনে একটি প্রশ্ন উঠেছে, এই সংকট কোকো খাতের জন্য নতুন দিক পরিস্ফুট করবে কি? ২০২৪ সালে কোকোর দাম প্রতি মেট্রিক টনে প্রায় ১৩ হাজার ডলারে পৌঁছেছিল, যা একটি রেকর্ড। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলের শুরুতে দাম নেমে আসে প্রায় ৩ হাজার ডলারে। অর্থাৎ এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে কোকোর দাম ৭৫ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। এই দরপতনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে পশ্চিম আফ্রিকার প্রায় ২৫ লাখ ক্ষুদ্র কোকো চাষির ওপর। আইভরি কোস্টের কৃষক ফিরমিন কুলিবালি বলেন, উৎপাদন থাকলেও চাষিরা খুব কম দামে কোকো বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফসল থাকার পরও উৎপাদকেরা দারিদ্র্যের মধ্য দিয়েই জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের হাতে ওষুধ বা খাবার কেনার জন্য টাকা নেই। আইভরি কোস্টের আরেক কোকো চাষি ডিডব্লিউকে বলেন, "যদি আমি সন্তানদের স্কুলে পাঠাই, তাহলে ফসল ঘরে তুলতে পারব না। আবার যদি তাদের স্কুল থেকে ফিরিয়ে আনি, তাহলে আরও বেশি কোকো সংগ্রহ করে অন্তত দিনের তিনবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারব।" ঘানার অবস্থাও একই। সেখানে অনেক কৃষক কোকো বিক্রির টাকা সময়মতো পাচ্ছেন না। কারণ, মধ্যস্বত্বভোগীরা কোকো ক্রয়ে আগের মতো আগ্রহী নন। ঘানার কৃষক ইমানুয়েল নোজর বলেন, "টাকা পেতে দেরি কারণে যারা ফসল কাটে, তাদের মজুরি দেয়ার মতো অর্থও আমার কাছে নেই।" এ কারণেই অনেক ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগীরা প্রায় পাঁচ মাস ধরে নোজরের পাওনা টাকা আটকে রেখেছে। অর্থসংকটের কারণে কৃষকেরা ওষুধ, কীটনাশক ও দিনমজুরের মজুরি; এসব কিছুই সময়মতো দিতে পারছেন না। নোজর আরও বলেন, "আমি কোকো বিক্রির টাকা থেকে সন্তানের স্কুলের বেতন দিতাম। কিন্তু এখনও সেই টাকা পাইনি। তাই আমার সন্তান বাড়িতে বসে আছে, পরীক্ষাতেও অংশ নিতে পারেনি।" আন্তর্জাতিক কোকো সংস্থার (আইসিসিও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কোকোর দাম রেকর্ড উচ্চতায় ওঠার মূল কারণ ছিল পশ্চিম আফ্রিকায় উৎপাদন কমে যাওয়া। এতে বিশ্ববাজারে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হয়। কৃষি অর্থনীতিবিদ ট্যানক্রেড ভইতুরিয়েজ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে ক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে। খরার পর ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে, ফলে কোকোর উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এছাড়া কোকো সোয়েলেন শুট ভাইরাসের মতো উদ্ভিদের রোগ এবং ফটকাবাজির কারণে বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে পরিস্থিতি আগে থেকেই বদলে গেছে। ভালো ফলনের সম্ভাবনা দেখে অনেক ব্যবসায়ী আগেভাগেই তাদের কোকোর চুক্তি বিক্রি করে মুনাফা নিশ্চিত করেন। একই সময়ে বিশ্বব্যাংক জানায়, অতিরিক্ত দামের কারণে চকলেট শিল্পে কোকোর চাহিদা কমে যায়। অনেক প্রতিষ্ঠান কম কোকো ব্যবহার করে বিকল্প উপাদানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী মার্কিন ডলারের প্রভাব, যা বিশ্ববাজারে কোকোর দাম দ্রুত কমিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কোকো উৎপাদন করে কোত দিভোয়ার ও ঘানা। তবে এই কোকো রফতানি নিয়ন্ত্রণ করে কয়েকটি বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববাজারে দাম কমে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান কোকো কিনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বন্দরে বিপুল পরিমাণ কোকো জমে রয়েছে এবং অনেক কৃষক বিক্রি করতে না পেরে তাদের ফসল নিয়ে আটকে আছেন। শিল্পসংশ্লিষ্টদের কিছু অংশের ধারণা, সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে দাম কমানোর উদ্দেশ্যে এটি পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। শুধু কোত দিভোয়ারেই ৪৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের কোকো অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে আছে। কারণ, দাম কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ী ও রফতানিকারকেরা নির্ধারিত দামে কোকো কেনার প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন না। অন্যদিকে, ঘানা কোকো বোর্ডের (কোকোবড) নির্বাহী পরিচালক উইজডম ডগবে তাদের বিপণন কৌশলের পক্ষে কথা বলেছেন। কোকোবড ঘানার সরকারি সংস্থা, যা কোকো চাষ, ক্রয় ও রফতানি নিয়ন্ত্রণ করে। এটি ঘানা কোকো মার্কেটিং কোম্পানির (সিএমসি) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে, যা কৃষক ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পালন করে। ডগবে বলেন, আগাম বিক্রির এই ব্যবস্থা সিএমসিকে আগে থেকেই দাম নির্ধারণের সুযোগ দিয়েছে এবং সাম্প্রতিক বাজার ধসের প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে। সংকট শুরুর আগে ২০২৫-২৬ মৌসুমের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ কোকো বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। ফেব্রুয়ারির শুরুতে ঘানার সরকার সরকারিভাবে নির্ধারিত কোকোর উৎপাদন মূল্য কমিয়ে দেয়। কোত দিভোয়ারেও কনসেইল ডু ক্যাফে-কাকাও (সিসিসি) কোকোর দাম নিয়ন্ত্রণ করে। কৃষকদের সুরক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানটি অক্টোবরের শুরুতে প্রতি কেজি কোকোর দাম ৪ দশমিক ৮৭ ডলার নির্ধারণ করেছিল। তবে এর কিছুদিন পরেই বিশ্ববাজারে দাম দ্রুত কমে যায়। আইভরি কোস্টের একটি কোকো চাষি ইউনিয়নের সভাপতি মুসা কোনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কৌশলগত ভুলের সমালোচনা করেন। তার মতে, কর্তৃপক্ষ সময়মতো পর্যাপ্ত কোকো বিক্রি করতে পারেনি। ফলে এখন সাত লাখ মেট্রিক টনের বেশি কোকো কৃষকদের কাছে আটকে আছে এবং তারা বুঝতে পারছেন না, এই কোকো কীভাবে বিক্রি করবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট আফ্রিকার কোকো খাতের একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাও সামনে এনেছে। আফ্রিকার দেশগুলো মূলত কাঁচা কোকো রফতানি করে, অথচ এর মূল্য সংযোজন বা চকলেট উৎপাদনের বড় অংশ হয় বিদেশে। অর্থনীতিবিদ ট্যানক্রেড ভইতুরিয়েজ বলেন, চকলেট প্রস্তুতকারকদের লাভ ব্যবসায়ীদের তুলনায় অনেক বেশি। ব্যবসায়ীরা মোট লাভের মাত্র ১ শতাংশ পান। তবে এই দরপতন নতুন সুযোগও তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে আফ্রিকার অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইকোফিন এজেন্সি। সাউডউইন্ড ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড একিউমেনিজমের গবেষক ফ্রিডেল হুটজ-অ্যাডামস মনে করেন, স্থানীয়ভাবে কোকো প্রক্রিয়াজাতকরণের পথে এখনও বড় ধরনের কাঠামোগত বাধা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে একই ধরনের স্বাদের চকলেটের চাহিদা বেশি। আর সেই স্বাদ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন অঞ্চলের কোকো একসঙ্গে মেশাতে হয়। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কোকো প্রক্রিয়াজাত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্বজুড়ে কোকো খাতকে আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের দাবি শক্তিশালী হচ্ছে। এ লক্ষ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন বন উজাড় নিয়ন্ত্রণ আইন (ইইউডিআর) এবং প্রস্তাবিত কর্পোরেট যথাযথ সতর্কতা নির্দেশিকা (সিএসডিডিডি) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এসব বিধিমালার মাধ্যমে কোম্পানিগুলোকে পরিবেশ ও মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাধ্য করা হবে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ট্যানক্রেড ভয়তুরিজ বলেন, ইউরোপীয় বাজারে কোকো রফতানি করতে চাইলে কোনো দেশই অবৈধভাবে বন উজাড় করা এলাকা থেকে কোকো সংগ্রহ করতে পারবে না। ফলে চকোলেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের কাঁচামাল সংগ্রহের পদ্ধতি পরিবর্তনের চাপের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ফেয়ারট্রেড সিলের মতো সনদও গুরুত্ব পাচ্ছে, যেখানে সামাজিক ও পরিবেশগত উচ্চ মানদণ্ড মেনে চলতে হয়। এ ক্ষেত্রে আলোচিত একটি উদ্যোগ হলো 'বি স্লেভারি ফ্রি'-এর 'চকলেট স্কোরকার্ড'। প্রতিবছর এই মূল্যায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন চকোলেট কোম্পানির টেকসই কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা গেছে, লিঙ্গ সমতা, শিশুশ্রম প্রতিরোধ এবং জীবনধারণের উপযোগী মজুরি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জার্মান কোম্পানিগুলোর গড় স্কোর আন্তর্জাতিক মানের নিচে। বিশেষ করে জীবনধারণের উপযোগী মজুরি নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। জরিপে অংশ নেয়া কোকো চাষিদের অর্ধেকেরও বেশি এমন মজুরি পান না, যা দিয়ে একটি পরিবার স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। টনি'স চকোলোনলি, রিটার স্পোর্ট এবং অরিজিনাল বিনস কোকো চাষিদের ন্যায্য জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে বেশি দামে কোকো কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সাউডউইন্ড ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড একিউমিনিজমের ফ্রিডেল হুটজ-অ্যাডামসের মতে, উৎপাদকদের বর্তমান পরিস্থিতিই প্রমাণ করে, এই খাতে সংস্কার কতটা জরুরি। তিনি বলেন, বছরের পর বছর এমন একটি মূল্য কাঠামো চালু ছিল, যা অনিবার্যভাবে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তার মতে, প্রতি মেট্রিক টন কোকোর দাম অন্তত ৪ হাজার ডলারের কাছাকাছি থাকতে হবে এবং দাম যেন হঠাৎ করে কমে না যায়, সেটিও নিশ্চিত করা আবশ্যক। তাহলেই কোকো চাষি পরিবারগুলো শিশুশ্রমের ওপর নির্ভর না করে সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারবে। অন্যথায়, চকোলেটের পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে সবার জন্য ন্যায্য ও টেকসই করা সম্ভব হবে না। সূত্র- ডিডব্লিউ
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন