শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং
১১:৫৮ এম
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে দোকানপাট, মার্কেট ও শপিং মলগুলোর জন্য রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখার বিশেষ অনুমতির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে আজ শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) থেকে এসব প্রতিষ্ঠান আগের নিয়ম অনুযায়ী সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। এর ফলে দোকানপাট ও বিপণিবিতান বন্ধ হওয়ার সময় দুই ঘণ্টা এগিয়ে এসেছে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা কার্যকর রাখার লক্ষ্যে চলতি বছরে একাধিকবার দোকানপাট খোলা রাখার সময়সূচি পরিবর্তন করেছে সরকার। সর্বশেষ ৫ অক্টোবর বিদ্যুৎ বিভাগ শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত রাত ১০টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার অনুমতি প্রদান করে। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার কারণে আজ থেকে আবার আগের সময়সূচি কার্যকর হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের নির্দেশনা অনুসারে, দুর্গাপূজা উপলক্ষে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত শপিং মল, মার্কেট ও দোকানপাট সকাল ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ ছিল। কিন্তু ২৩ অক্টোবর থেকে সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখার নিয়ম পুনর্বহাল করা হয়েছে।
২০২৬ সালে জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে একাধিকবার দোকানপাট বন্ধের সময় পরিবর্তন করা হয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে শপিং মল ও দোকানপাট সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সময় বাড়িয়ে সন্ধ্যা ৭টা করা হয়।
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গত ১২ মে থেকে সাময়িকভাবে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এরপর জুনে বন্ধের সময় রাত ৯টা নির্ধারণ করা হয়। পরে ১২ আগস্ট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দোকানপাট বন্ধের সময় আরও এক ঘণ্টা এগিয়ে রাত ৮টা করা হয়।
সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকানপাট ও শপিং মল খোলা রাখার নিয়ম কার্যকর ছিল। দুর্গাপূজা উপলক্ষে সাময়িক সময় বাড়ানোর সুযোগ শেষ হওয়ায় আজ থেকে আবারও সেই নিয়ম কার্যকর হলো।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
ফুকুওকা বিমানবন্দরের একটি বিমানের ভেতরে সাপ পাওয়ার কারণে ফ্লাইটটি বাতিল করা হয়েছে। সাপটি প্রথমে বিমানের এক মেকানিকের নজরে আসে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) জাপান এয়ারলাইন্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠান জাপান এয়ার কমিউটার (জেএসি) জানায়, সোমবার দুপুর ১টার দিকে ফুকুওকা বিমানবন্দরে বিমানের কার্পেটের নিচে প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার লম্বা সাপটি দেখা যায়। উল্লেখ্য, সাপটি বিষধর নয়। প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর একজন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ সাপটিকে উদ্ধার করেন।
বিমানটি সোমবার শিমানে প্রিফেকচারের ইজুমো বিমানবন্দর থেকে ফুকুওকায় পৌঁছেছিল। ওই দিন দুপুরে ফুকুওকা থেকে কাগোশিমা প্রিফেকচারের উদ্দেশে ফ্লাইটটির যাত্রা করার কথা ছিল। কিন্তু সাপটি দেখা পাওয়ার পর ফ্লাইট বাতিল করা হয়।
সাপটি বিমানটির ভেতরে কিভাবে প্রবেশ করল, সে সম্পর্কে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এয়ারলাইনটি জানায়, তাদের অভিজ্ঞতায় এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম।
ধারণা করা হচ্ছে, সাপটি বন্য পরিবেশ থেকে বিমানের ভেতরে ঢুকেছিল। তবে কীভাবে এটি ভেতরে প্রবেশ করেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগের জন্য জাপান এয়ার কমিউটার ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। সংস্থাটি জানায়, তাদের কোনো বিমানের যাত্রীদের বসার জায়গায় সাপ পাওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে হাওয়াইগামী একটি ফ্লাইটে ভুল করে সাপ নিয়ে উঠেছিলেন এক ব্যক্তি।
২০২২ সালেও কেবিনের ভেতরে সাপ দেখতে পাওয়ার কারণে এয়ারএশিয়ার একটি ফ্লাইটের গতিপথ পরিবর্তন করতে হয়েছিল। সূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার এক রোগী অচেতন অবস্থায় চিকিৎসকের নির্দেশনা পরে শোনার উদ্দেশ্যে মোবাইলে অডিও রেকর্ডিং চালু করেছিলেন। কিন্তু কোলনোস্কপির সময় রেকর্ডিং চলতে থাকায় চিকিৎসকরা রোগীকে নিয়ে উপহাস ও অপমানজনক কথাবার্তা বলেন। সেই রেকর্ডিংয়ের ভিত্তিতে করা মামলায় ২০১৫ সালের জুনে রোগীকে পাঁচ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন ফেয়ারফ্যাক্স কাউন্টির একটি জুরি। ঘটনাটি ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে ঘটে, ভার্জিনিয়ার রেস্টনের একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে।
আদালতের নথিতে রোগীকে পরিচয় গোপন রাখতে ‘ডি.বি.’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এবিসি নিউজের তৎকালীন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসা শেষে যত্ন নেওয়ার নির্দেশনা সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে তিনি স্মার্টফোনে রেকর্ডিং চালু করেছিলেন। অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার পরও সেটি বন্ধ হয়নি। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার পথে অডিও শুনে তিনি জানতে পারেন, অচেতন অবস্থায় তার প্রতি বিদ্রূপ করা হয়েছে।
রেকর্ডিংয়ে অ্যানেসথেশিওলজিস্ট ডা. টিফানি ইনঘামকে বলতে শোনা যায়, চিকিৎসার আগে রোগীর সঙ্গে অল্প সময় কথা বলার পর তার মুখে ঘুষি মারার ইচ্ছা হয়েছিল। রোগীকে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত বলে উপহাস করা এবং চিকিৎসা শেষে তার সঙ্গে কথা বলা এড়িয়ে যাওয়ার আলোচনা অডিওতে ধরা পড়ে।
মামলায় চিকিৎসার নথিতে ভুল তথ্য লেখার বিষয়টিও উঠে আসে। রেকর্ডিংয়ে ইনঘামকে বলতে শোনা যায়, রোগীর অর্শ দেখা না গেলেও তিনি সেটি নথিতে লিখবেন। এই অডিও আদালতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তিন দিনের বিচার শেষে জুরি মানহানির জন্য এক লাখ ডলার, চিকিৎসাগত অনিয়মের জন্য দুই লাখ ডলার এবং শাস্তিমূলক ক্ষতিপূরণ হিসেবে আরও দুই লাখ ডলার নির্ধারণ করেন।
ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেওয়া হয় ইনঘাম ও তার সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানকে। কোলনোস্কপি করা অপর চিকিৎসক সলোমান শাহকেও শুরুতে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে বিচার চলাকালে তাকে মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয় বলে এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনা চিকিৎসা চলাকালে রোগীর সঙ্গে আচরণ ও তার মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন সামনে আনে। এটি সাম্প্রতিক কোনো রায় নয়। রোগীর অজান্তে রেকর্ড হয়ে যাওয়া কথোপকথনকে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালের ঘটনার বিচার ২০১৫ সালে হয়।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়া ফোরসাইট নেটওয়ার্কের (এসএএফএন) সম্মানসূচক (অনারারি) সিনিয়র ফেলো হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারী।
এ তথ্য বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রতিষ্ঠানটির এক ঘোষণায় জানানো হয়েছে।
এসএএফএন, যা দ্য মিলেনিয়াম প্রজেক্টের অধীনে পরিচালিত, মূলত দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ, ভূরাজনীতি ও নীতিনির্ধারণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা ও সংলাপের আয়োজন করে।
নিয়োগের ঘোষণায় আনসারীর জনসেবা, গণমাধ্যম ও কূটনীতিতে অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়, তার এই অভিজ্ঞতা ওয়াশিংটনে প্রতিষ্ঠানটির আলোচনা এবং বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি, বাংলাদেশের গবেষক ও বৃহত্তর পাঠকসমাজও তার চিন্তা ও বিশ্লেষণ থেকে উপকৃত হবে।
নতুন ভূমিকায় আনসারী নীতিবিষয়ক সংলাপ ও গবেষণায় অবদান রাখবেন। তিনি ওয়াশিংটনে এসএএফএনের যোগাযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাংলাদেশে নেটওয়ার্কটির গবেষণা ও অন্যান্য কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবেন।
মুশফিকুল ফজল আনসারী, জনসেবা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও গণমাধ্যমে দুই দশকের বেশি অভিজ্ঞতা নিয়ে বর্তমানে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আছেন।
তিনি এর আগে মেক্সিকোতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং একই সঙ্গে কোস্টারিকা, গুয়াতেমালা, ইকুয়েডর ও হন্ডুরাসে সমবর্তী দায়িত্বে ছিলেন। কূটনৈতিক দায়িত্বের আগে তিনি হোয়াইট হাউস ও জাতিসংঘের স্থায়ী সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছেন।
প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য অন্যান্য সিনিয়র ফেলোদের মধ্যে রয়েছেন জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির সাবেক নির্বাহী পরিচালক এরিক সোলহেইম, শ্রীলঙ্কার সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান গগন বুলাথসিংহলা, মালদ্বীপের কূটনীতিক রাষ্ট্রদূত ওমর আবদুল রাজ্জাক প্রমুখ।
এছাড়া, এসএএফএনের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের পরিচালক হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনীরুজ্জামান।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
মহসিন বেপারী
ঢাকা, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ : কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে শুধুমাত্র পুলিশি অভিযান বা গ্রেফতার যথেষ্ট নয়; বরং মূল হোতাদের চিহ্নিত করা, পারিবারিক নজরদারি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সচেতন ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
তাদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পারিবারিক দূরত্ব, শিক্ষাজীবনে অনিয়ম, অবসর সময়ের সদ্ব্যবহার না থাকা এবং অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের প্রভাব কিছু কিশোরকে অপরাধী চক্রের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এজন্য অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই শনাক্ত করে সহায়তা নিশ্চিত করা আবশ্যক।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে ১৫৯টি এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি গ্রুপের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি নেপথ্যের হোতা, মদদদাতা, আশ্রয়দাতা এবং মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ এবং কিশোরদের মানসিক বিকাশের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই অপরাধ দমনে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ বাসসকে জানান, পারিবারিক নজরদারির অভাব, বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব, পারিবারিক কলহ, শিক্ষাজীবনে অনিয়ম এবং অবসর সময় ইতিবাচকভাবে ব্যবহারের সুযোগের অভাব কিশোরদের অপরাধী চক্রের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল মনে করেন, সন্তানদের চলাফেরা, বন্ধুবান্ধব, অনলাইন কার্যক্রম এবং আচরণগত পরিবর্তনের বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বাসসকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের হালনাগাদ তালিকা ধরে অভিযান চলছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পাশাপাশি তাদের মূল হোতা, মদদদাতা, আশ্রয়দাতা এবং মাদক ও অস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য, অপরাধের ধরন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা এবং প্রাপ্ত আইনগত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি কেন গুরুত্বপূর্ণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, পূর্বে যৌথ পরিবারে অন্যান্য সদস্যরা শিশু-কিশোরদের দেখাশোনা করতেন। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক নজরদারির অভাব দেখা যাচ্ছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব, পারিবারিক কলহ, স্কুলে অনিয়মিত উপস্থিতি, স্কুল থেকে পালানো বা ঝরে পড়া এবং অবসর সময় ইতিবাচকভাবে ব্যবহারের সুযোগের অভাব কিশোরদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
তিনি উল্লেখ করেন, শুরুতে এলাকার বড় ভাইদের অনুসরণ, আড্ডা, মোটরসাইকেল নিয়ে ঘোরাফেরা অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ছবি ও ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে কিশোরদের মধ্যে দলীয় সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। পরে কিছু ক্ষেত্রে এসব সম্পর্কের সঙ্গে মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি কিংবা অস্ত্র বহনের মতো অপরাধ যুক্ত হতে পারে।
রেজাউল করিম সোহাগের মতে, স্থানীয় অপরাধীরা অনেক সময় কিশোরদের অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করে। বয়স কম হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ও সামাজিক চাপ তুলনামূলক কম হবে—এমন ধারণা থেকে কেউ কেউ কিশোরদের অপরাধে সম্পৃক্ত করে থাকে।
এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারকে সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের চিহ্নিত করে কাউন্সেলিং, শিক্ষা অব্যাহত রাখা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
স্মার্টফোন ব্যবহারে অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ
সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, কিশোর গ্যাং কোনো একক কারণে তৈরি হয় না।
সন্তান নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে কি না, পড়ালেখা করছে কি না, কার সঙ্গে মিশছে এবং তার আচরণে কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না, সেসব বিষয়ে বাবা-মাকে খেয়াল রাখতে হবে।
তিনি বলেন, সন্তান মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে পড়ছে কি না, স্কুলের বাইরে কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে এবং অনলাইনে কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, সে বিষয়েও অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
স্মার্টফোন ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশু-কিশোরদের স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সতর্ক হওয়া উচিত। তার মতে, অন্তত এইচএসসি পর্যন্ত বয়সী সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন দেওয়ার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা যেতে পারে। তবে কর্মজীবী বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন হলে ছোট বাটন ফোনের বিকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে।
অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, অনেক শিশু-কিশোর খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে স্মার্টফোনে দীর্ঘ সময় কাটায়। রাতে ঘুমের সময়ও ফেসবুক, ইউটিউব, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারের প্রবণতা তাদের দৈনন্দিন জীবন ও পড়াশোনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কিশোরদের মানসিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা জরুরি। অপরাধ দমনে শুধু আইনের কঠোরতা যথেষ্ট নয়; কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোরদের পোশাক, চুলের ধরন বা দলবদ্ধভাবে চলাফেরার মতো বিষয়কে এককভাবে অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং আচরণগত পরিবর্তন, শিক্ষাজীবনের পরিস্থিতি ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট বুঝে দায়িত্বশীলভাবে সহায়তা দিতে হবে।
অপরাধের নেটওয়ার্ক ভাঙতে অভিযান জোরদার
এসআরবির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের কার্যক্রম সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসা ও অস্ত্র-সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ, মাঠপর্যায়ে যাচাই এবং সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুধু গ্রেফতারের সংখ্যা বাড়ানো নয়, অপরাধের মূল কারণ ও নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে পুনরায় অপরাধ সংঘটনের সুযোগ বন্ধ করাই এ কার্যক্রমের লক্ষ্য।
ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, বসিলা, মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া উত্তরা ও যাত্রাবাড়ীসহ আরও কয়েকটি এলাকায় এসব গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি সাম্প্রতিক তালিকা অনুযায়ী, মিরপুর বিভাগে ৩২টি এবং তেজগাঁও বিভাগে ২৬টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য রয়েছে। থানা হিসেবে পল্লবীতে ১৪টি এবং মোহাম্মদপুরে ১৬টি গ্রুপের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব গ্রুপের অবস্থান ও সক্রিয়তার চিত্র পরিবর্তনশীল।
রাজধানীতে ১ হাজার ২১৯ সদস্যের তথ্য
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বাসসকে জানান, হালনাগাদ তালিকা ধরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। রাজধানীতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের ১ হাজার ২১৯ জন সদস্য রয়েছে। তাদের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছর। স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট (এসআরইউ) ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এসব অপরাধীকে গ্রেফতারে কাজ করছে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
এডিশনাল আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. সায়েদুর রহমান বাসসকে বলেন, কিশোর গ্যাং কিংবা তাদের পেছনে থাকা আশ্রয়দাতা কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তবে মূল উদ্দেশ্য শুধু গ্রেফতার করা নয়; কিশোরদের পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিট পুলিশিং, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনে গুরুত্ব
কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি ওয়ার্ড ও পাড়া-মহল্লায় পুলিশি নজরদারি জোরদার, চিহ্নিত স্থানে নিয়মিত তল্লাশি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ টহল পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধে ইন্ধনদাতা ও ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক সেশন, অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের ক্ষেত্রে বয়স, অপরাধের ধরন, সংশ্লিষ্টতার মাত্রা এবং প্রযোজ্য আইন বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র, কাউন্সেলিং, পরিবারভিত্তিক সহায়তা এবং শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে কিশোরদের অপরাধে ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অপরাধ থেকে ফিরে আসতে ইচ্ছুক কিশোরদের পুনর্বাসনের সুযোগ রাখতে হবে। স্কুলে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, মানসিক সহায়তা দেওয়া, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা গেলে কিশোরদের অবসর সময় ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, সামাজিক সংগঠন ও কমিউনিটির সমন্বিত ভূমিকা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একদিকে অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও নেপথ্যের মদদদাতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে, অন্যদিকে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সামাজিক ও পারিবারিক কারণগুলো দূর করতে হবে। পরিবারে দায়িত্বশীল নজরদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ এবং পুনর্বাসনমূলক সহায়তা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের পাশে দাঁড়ানো। আইন প্রয়োগ, অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং পরিবার ও সমাজের দায়িত্বশীল ভূমিকা—এই তিনটি ক্ষেত্রের সমন্বয়ই দীর্ঘমেয়াদে কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখার পথ তৈরি করতে পারে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ