০৫:১৭ পি.এম
প্রকৃতির বিশাল ভুবনে সমাজবদ্ধ জীবনযাপন ও একাকী পথচলা দুটিরই অস্তিত্ব রয়েছে। কেউ কেউ একাকী পথচলা পছন্দ করে, আবার কেউ খাদ্যের নিরাপত্তা ও স্বস্তির জন্য দলবদ্ধ জীবনযাপনে খোঁজে সন্তুষ্টি। প্রাণিজগতের মধ্যে এমন বৈচিত্র্যও দেখা যায়। এই একই দলবদ্ধ জীবনযাপনের আলাদা উদাহরণ রূপে রয়েছে কালোমাথা কাস্তেচরা পাখি।
বাংলাদেশের জলাভূমিতে এদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও, তারা একসঙ্গে বিচরণ করতে বিশেষভাবে পছন্দ করে। প্রয়োজনবোধে তারা অন্য প্রজাতির পাখির সঙ্গেও মিশে যায়।
সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে একসঙ্গে দলবদ্ধ কালোমাথা কাস্তেচরার উপস্থিতি দেখা গেছে। এই বিরল মুহূর্তের ছবি বন্দী করেছেন বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী, কবি ও লেখক রানা মাসুদ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর একসাথে একাধিক পাখির ছবি তুলতে পেরে তিনি তার আনন্দ প্রকাশ করেছেন।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
কালোমাথা কাস্তেচরার বৈজ্ঞানিক নাম হলো থ্রেস্কিওর্নিস মেলানোসেফালাস। এটি কাস্তেচরা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি বড় আকারের জলচর পাখি। এর বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ ‘কৃষ্ণমস্তক পবিত্রপক্ষী’। এজন্য অনেকেই একে ‘ধার্মিক পাখি’ বলে উল্লেখ করে থাকেন।
বিশ্বজুড়ে কালোমাথা কাস্তেচরার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এই প্রজাতিকে প্রায় বিপদগ্রস্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ আইনেও এটি সংরক্ষিত। পাখিবিদদের ধারণা, বর্তমান পৃথিবীতে মাত্র ১০ থেকে ২০ হাজার কালোমাথা কাস্তেচরা টিকে আছে।
এরা মিঠাপানি ও লোনাপানি- উভয় পরিবেশে স্বচ্ছন্দে বসবাস করতে পারে। সাধারণত কাদা ও অগভীর পানিতে তাদের লম্বা বাঁকানো ঠোঁট ডুবিয়ে খাবার খুঁজতে দেখা যায়। মাঠে গরু, ছাগল কিংবা অন্যান্য প্রাণির চলাচলে বের হয়ে আসা পোকামাকড়ও তাদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে।
দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এই পাখির দেহের প্রধান অংশ সাদা হলেও, তাদের মাথা, গলা ও ঘাড় সম্পূর্ণ কালো এবং পালকহীন। তাদের লম্বা কালো ঠোঁটটি নিচের দিকে কাস্তের মতো বাঁকানো, যা তাদের নামকরণের উৎস। পূর্ণবয়স্ক পাখির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। তাদের চোখ লালচে, পা কুচকুচে কালো এবং বুকে হালকা হলুদ আভা দেখা যায়।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
পুরুষ ও স্ত্রী পাখির মধ্যে বাহ্যিক পার্থক্য খুবই নগণ্য। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা ও ঘাড়ের নিচের অংশে কোমল কালো পালক থাকে। প্রজনন মৌসুমে তাদের মাথায় নীলাভ আভা এবং ডানার নিচে লালচে পট্টি দেখা যায়, যা তাদের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈচিত্র্য। তারা প্রধানত মাছ, ব্যাঙ, শামুক, কেঁচো, পোকামাকড় এবং নরম জলজ উদ্ভিদ খায়। উড়ার সময় তারা বকের মতো গলা ভাঁজ করে না। শীতকালে সাধারণত তারা নীরব থাকে, কিন্তু গ্রীষ্মে বাসার কাছাকাছি শূকরের মতো কর্কশ স্বরে ডাকতে শোনা যায়।
খাবারের সন্ধানে তারা প্রায়ই স্থান পরিবর্তন করে। তাই অনেক পাখিবিদ কালোমাথা কাস্তেচরাকে যাযাবর স্বভাবের পাখি মনে করেন। সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে তাদের প্রজনন মৌসুম দেখা যায়। ছোট মাচার মতো বাসায় স্ত্রী পাখি দুই থেকে চারটি ডিম পাড়ে। ২৩ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে ছানা বের হয় এবং প্রায় ৪০ দিন বয়স না হওয়া পর্যন্ত তারা উড়তে পারে না।
কালোমাথা কাস্তেচরা পাখির আলোকচিত্রী রানা মাসুদ বলেন, “খাদ্য ও আবাসস্থল সংকটের কারণে কালোমাথা কাস্তেচরা এখন আর সহজে চোখে পড়ে না। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দলবদ্ধ এই পাখিগুলোর ছবি তুলতে পেরেছি, যা আমার কাছে অসাধারণ এক প্রাপ্তি।”
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
তিনি আরও বলছেন, “নির্দিষ্ট সময়ের আগে কিছুই হয় না, অতএব অপেক্ষার কোনো বিকল্প নেই।” প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য অপেক্ষা করতে জানা প্রয়োজন।
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। তাই বিরল এই কালোমাথা কাস্তেচরাকে টিকিয়ে রাখতে জলাভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণের বিষয়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন। তা না হলে একদিন হয়তো দলের সঙ্গে উড়ে বেড়ানো এই পাখিটি শুধুমাত্র স্মৃতির পাতায় নিজের জন্য জায়গা করে নেবে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন