১০:৩০ পি.এম
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার দুই যুবককে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কম্বোডিয়ায় নিয়ে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল। সেখানে তাদের বেতন বঞ্চিত করে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার অভিযোগে গত ৮ জুন বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন, তাদেরকে জব্দ করে রাখা পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়েছে। একপর্যায়ে তারা ওই জিম্মিদশা থেকে অন্যত্র চলে যেতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে তাদের পরিবার পাঠানো বিমান ভাড়ার টাকায় দেশে ফিরেছেন ভুক্তভোগী সৌরভ মोल্লা।
তবে দেশে ঋণের বোঝার কথা চিন্তা করে আরিফ হোসেন এখনো কম্বোডিয়ায় অবস্থান করছেন। তিনি বর্তমানে আত্মগোপনে থেকে টুকটাক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার আতঙ্কের মধ্যে তার দিন কাটছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এর আগে প্রকাশিত সংবাদে অভিযোগ করা হয়, আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন বেপারী ও তার ছেলে ছিয়াম হোসেনের বিরুদ্ধে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে কম্বোডিয়ায় নেওয়ার পর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বেতন বঞ্চনা এবং বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হয়। দেশে ফিরে আসা সৌরভ মোল্লা শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে বলেন, “আমাকে বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে যখন কথাবার্তা হয় তখন কামাল হোসেন কম্বোডিয়ায় অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকেই তিনি আমাকে নেওয়ার সব ব্যবস্থা করেন। আর বাংলাদেশে তার স্ত্রী সোহেলী বেগম ও ছেলে ছিয়াম হোসেন আমাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় টাকা বুঝে নেন। এসব লেনদেনের স্থানীয় সাক্ষীও রয়েছে।”
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
তিনি আরও বলেন, সংবাদ প্রকাশের পর আমাদের পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়। এরপর আমরা সেখান থেকে অন্যত্র চলে যাই। কিন্তু আমাদের কোনো বৈধ চাকরির ব্যবস্থা করা হয়নি। দীর্ঘদিন কর্মহীন অবস্থায় থাকতে হয়েছে। একপর্যায়ে আমার বাবা বাংলাদেশ থেকে বিমান ভাড়ার টাকা পাঠানোর পর আমি দেশে ফিরতে সক্ষম হই।
তিনি আরও বলেন, কম্বোডিয়ায় অবস্থানকালে আমাদের ওপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। প্রতিশ্রুত চাকরির পরিবর্তে বিভিন্ন অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়ানোর জন্য চাপ করা হতো। আমি কোনোভাবে দেশে ফিরলেও আরিফ এখনো সেখানে রয়েছে। তার জীবননাশের আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের কাছে আমার দাবি, যারা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, আমাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক এবং আরিফকে দ্রুত নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।
কম্বোডিয়া থেকে মোবাইল ফোনে আরিফ হোসেন বলেন, “সংবাদ প্রকাশের পর আমার পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হলেও আমি এখনো কম্বোডিয়ায় আটকে আছি। বর্তমানে আত্মগোপনে থেকে টুকটাক কিছু কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছি। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় সবসময় গ্রেপ্তারের আতঙ্কে থাকতে হয়। নিজের নিরাপত্তা নিয়েও প্রতিনিয়ত শঙ্কায় রয়েছি।”
তিনি আরও জানান, “এমনিতেই দেশে ধারদেনা করে বিদেশে এসেছি। একদিকে সেই ঋণের বোঝা, অপরদিকে বিমান ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে না পারার কারণে আমি দেশে আসতে পারছি না। তাই আমি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। জেলা প্রশাসনের কার্যালয় থেকে বিষয়টি তদন্তের জন্য আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানতে পেরেছি।”
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
তিনি বলেন, কিছু দিন পূর্বে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিখন বনিকের কাছে তার মা গিয়েছিলেন। তখন তাকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) দেওয়া হয়েছে। আমি চাই প্রশাসন দ্রুত তদন্ত শেষ করে আমাকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুক এবং এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।
সৌরভের বাবা জাহাঙ্গীর মোল্লা বলেন, “ধার-দেনা করে, এমনকি জমিজমা বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম। ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন ছিল। কিন্তু প্রতারণার শিকার হয়ে আমরা আজ নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমার ছেলে দেশে ফিরেছে ঠিকই কিন্তু আমাদের আর্থিক ক্ষতি কে পূরণ করবে? আমরা প্রশাসনের কাছে বিচার চাই।”
প্রতারকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ক্ষতিপূরণ এবং এখনও কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত আরিফকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছি। আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশনা এসেছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) ব্যবহৃত সরকারি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত থাকার কথা জানিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযুক্ত কামাল হোসেন বলেন, “দুই যুবককে কম্বোডিয়ায় পাঠানোর জন্য আমি প্রত্যেকের কাছ থেকে সাড়ে ছয় লাখ টাকা নিয়েছি।” ট্যুরিস্ট ভিসায় কম্বোডিয়ায় নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “তাদেরকে কনস্ট্রাকশন খাতে কাজের উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছিল।” শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, জিম্মি করে রাখা, পাসপোর্ট জব্দ রাখা এবং বেতন পরিশোধ না করার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “এসব অভিযোগ মিথ্যা।” টাকা-পয়সার লেনদেন প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, মো. মাহাবুব ডাক্তার নামের একজন সাংবাদিক ওই লেনদেনের সাক্ষী ছিলেন।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন