ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ই অক্টোবর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ০৪ই কার্তিক, ১৪৩৩বঙ্গাব্দ ০৯ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
মঙ্গলবার, ২০ই অক্টোবর, ২০২৬ইং ০৪ই কার্তিক, ১৪৩৩বাং

সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ প্রাণহানি, মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ মৃত্যু


সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ প্রাণহানি, মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ মৃত্যু

সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত হয়েছেন এবং ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী এবং ৬১ জন শিশু অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৯ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩২ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

রোববার (৪ অক্টোবর) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১০৬ জন পথচারী ছিলেন। মোট নিহতের ২৫ দশমিক ০৫ শতাংশ পথচারী। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন, যা মোট নিহতের ১২ দশমিক ৫২ শতাংশ।

আরও পড়ুন: ‘আল্লাহর বাড়ি মানুষ যায় পবিত্র নিয়তে, ওখানে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঠিক না’ হুমায়ুন কবিরের মন্তব্য

দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৩৯ জন, তিন চাকার যানবাহনের যাত্রী ৮৮ জন, বাসের যাত্রী ২৬ জন, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের আরোহী ২১ জন, ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-ট্রলির আরোহী ১৯ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী ১৮ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ছয়জন রয়েছেন।

আঞ্চলিক সড়কেই বেশি দুর্ঘটনা

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে আঞ্চলিক সড়কে সবচেয়ে বেশি ১৭৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় মহাসড়কে ১৪৫টি, শহরের সড়কে ৬৩টি এবং গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৬৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। ১০৯টি ঘটনায় পথচারী চাপা বা ধাক্কার শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া ৯৮টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৬১টি পেছন থেকে আঘাত এবং ছয়টি অন্যান্য ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে।

আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ

ঢাকায় ৫২ দুর্ঘটনায় নিহত ২১

বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। এ বিভাগে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। মোট দুর্ঘটনার ২৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং প্রাণহানির ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ ঢাকা বিভাগে ঘটেছে।

চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ প্রাণহানি, খুলনা বিভাগে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ১৪ দশমিক ৪২ শতাংশ প্রাণহানি, রাজশাহী বিভাগে ১২ দশমিক ২১ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ প্রাণহানি ঘটেছে।

এছাড়া ময়মনসিংহে ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রাণহানি, বরিশালে ৫ দশমিক ২০ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ৬ দশমিক ৬১ শতাংশ প্রাণহানি, রংপুরে ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ প্রাণহানি এবং সিলেটে ৪ দশমিক ৫২ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ প্রাণহানি ঘটেছে।

আরও পড়ুন: ক্ষমা চাইলেন ‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক চাই না’ বলা এমপি রতন

একক জেলা হিসেবে গাজীপুরে সবচেয়ে বেশি ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ২০টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়েছেন।

রাজধানী ঢাকায় সেপ্টেম্বরে ৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হয়েছেন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নিহতদের পেশাগত পরিচয়ও তুলে ধরেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এতে দেখা যায়, নিহতদের মধ্যে ২ জন পুলিশ সদস্য, একজন সেনা সদস্য, ১৩ জন শিক্ষক, তিনজন সাংবাদিক, দুজন চিকিৎসক, চারজন প্রকৌশলী, একজন কাস্টমস কর্মকর্তা, একজন বিদেশি নাগরিক, ব্যাংক-বীমার ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারী, ১৮ জন এনজিও কর্মী এবং ২৪ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী রয়েছেন।

এছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ের ২৫ জন ব্যবসায়ী, ওষুধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর ২১ জন বিক্রয় প্রতিনিধি, তিনজন মসজিদের ইমাম বা খাদেম, চারজন মোটর মেকানিক, ছয়জন পোশাক শ্রমিক, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ১৪ জন দিনমজুর এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৮ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন।

আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা

সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোরে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ, সকালে ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ, দুপুরে ২১ দশমিক ২৬ শতাংশ, বিকেলে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং রাতে ১৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

নৌ ও রেল দুর্ঘটনাও বেড়েছে

সেপ্টেম্বরে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, সাতজন আহত এবং চারজন নিখোঁজ হয়েছেন। একই সময়ে ২৩টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে। গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত

সংস্থাটির মতে, যানবাহনের বেপরোয়া গতি ও পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে। এ জন্য সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জীবনমুখী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, অনির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কার, আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার, রাজধানীতে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ এবং চালকদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

এছাড়া মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণ, সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ, সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ এবং সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনকে সমন্বিত করে অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন

সংস্থাটি বলেছে, সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।

ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

নদ-নদীতে ‘প্রাণের উৎসব’: সারিগানের সুরে ও বৈঠার ছন্দে নৌকা বাইচ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিনোদন ডেস্ক

রবিবার, ৪ই অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০২:৪৪ পি.এম


নদ-নদীতে ‘প্রাণের উৎসব’: সারিগানের সুরে ও বৈঠার ছন্দে নৌকা বাইচ

শরতের নীল আকাশের নিচে এবং বর্ষার বিদায়ী ঢলে নদী-নালা যখন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন গ্রামবাংলা তার চিরচেনা লোক-উৎসবের অদম্য উন্মাদনায় মেতে ওঠে। নদীর বুকে শত বৈঠার এক সুর, এক ছন্দ এবং তীরের লাখো মানুষের করতালির সেই চিরন্তন আবহ— ‘নৌকা বাইচ’। যান্ত্রিক সভ্যতার এই যুগেও ঐতিহ্য এবং গতির এই মেলবন্ধন একটুও ম্লান হয়নি।

সম্প্রতি সারিগানের চেনা সুর এবং পানির বুকে শত বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে দেশের নদ-নদী আবারও প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের খরা কাটিয়ে এ বছর ১৮ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের ঘোড়াউত্রা নদী, ২১ আগস্ট ঢাকার বুড়িগঙ্গা, ৩২ বছর পর পুরান ঢাকার নবাব বাড়ির ঐতিহ্যবাহী গোল তালাব, ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস এবং ১৮ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের কুমার নদ থেকে শুরু করে কুষ্টিয়ার গড়াই নদী— সবখানেই মাঝিদের সারিগানের সুরে এবং বৈঠার ছন্দে প্রাণ ফিরে পেয়েছে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য ‘নৌকা বাইচ’। আধুনিক বিনোদনের ভিড়েও এই জল-উৎসব ডিজিটাল স্ক্রিনকে টেক্কা দিচ্ছে এবং গ্রামীণ ও নাগরিক সম্প্রীতি আজও ধরে রেখেছে।

নৌকা বাইচ নদীমাতৃক বাংলাদেশের হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির একটি অনন্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদী এদেশের মানুষের জীবন, জীবিকা এবং সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আর এই নদীকে কেন্দ্র করেই আবহমান কাল থেকে উদযাপিত হয়ে আসছে জমকালো জল-উৎসব ‘নৌকা বাইচ’। যখন শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে নদী-নালা, খাল-বিল এবং হাওর-বাঁওড় বর্ষার পানিতে টইটম্বুর থাকে, তখন গ্রামবাংলার বুক চিরে জেগে ওঠে পলিমাটির গন্ধমাখা এই উৎসবের উন্মাদনা।

উৎসের ইতিকথা ও ঐতিহ্য: নৌকা বাইচের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। এর উৎপত্তি নিয়ে নানা লোকগাথা প্রচলিত রয়েছে। কেউ বলেন, জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে এই উৎসবের সূচনা; আবার কারও মতে, মুসলিম নবাব ও জমিদারদের আমলে যুদ্ধের নৌ-মহড়া থেকেই এই বাইচের প্রচলন হয়। তবে এর পেছনের ইতিহাস যাই হোক না কেন, বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে এটি কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি প্রাণের মেলা, সাম্য এবং মিলনের মহোৎসব।

নৌকার সাজ ও প্রকারভেদ: নৌকা বাইচের জন্য সাধারণ নৌকা ব্যবহার করা হয় না। এই বিশেষ প্রতিযোগিতার জন্য অত্যন্ত যত্ন এবং কুশলতার সঙ্গে তৈরি করা হয় বিশেষ ধরনের নৌকা। এগুলোর মধ্যে ছিপ, কোষা, খেলনা, ময়ূরপঙ্খী, গয়না এবং ঘাসী নৌকা অন্যতম। একেকটি নৌকা লম্বায় ১০০ থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। কাঠের ওপর খোদাই করা নকশা এবং উজ্জ্বল রঙে সাজানো হয় এই তরীগুলোকে। নৌকার সামনের গলুইতে কখনও ময়ূরের মুখ, কখনও বা সিংহের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়, যা বাইচকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

পানির বুকে গতির ছন্দ এবং সারিগান: নৌকা বাইচের মূল আকর্ষণ হলো এর ছন্দ এবং গতি। একেকটি নৌকায় ৫০ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত মাল্লা বা মাঝি থাকেন। সবার পরনে থাকে একই রঙের পোশাক, মাথায় বাঁধা থাকে রঙিন গামছা। মাঝিদের এই বিশাল দলকে পরিচালনার জন্য থাকেন একজন ‘নয়া গাঙের কাণ্ডারি’ বা দলনেতা। তিনি নৌকার মাঝখানে বা গলুইতে দাঁড়িয়ে কাঁসর-করতাল বাজিয়ে সুর তোলেন সারিগানের— ‘হেইও রে হেইও, জোয়ান ভাইসালা হেইও...’ এই গানের তালে তাল মিলিয়ে মাঝিরা পানিতে তাদের বৈঠা চালান। তখন শত বৈঠার অবিরাম ছন্দ, এবং চারদিকে ছিটকে পড়া রুপালি জলের ফোঁটায় এক নান্দনিক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

উন্মাতাল লোক-উৎসব: নৌকা বাইচ যেখানে অনুষ্ঠিত হয়, তার দুই পাড়ে ঢল নামে লাখো মানুষের। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব বয়সী মানুষ নদীর তীরে এসে ভিড় জমায়। যারা তীরে জায়গা পান না, তারা ছোট ছোট ডিঙি নৌকা বা ট্রলারে করে নদীর বুকে অবস্থান নেন। ঢাক-ঢোল, কাঁসর এবং করতালির শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। যখন প্রতিযোগী নৌকাগুলো তীরের বেগে ফিনিশিং লাইনের দিকে এগিয়ে যায়, তখন দর্শকদের করতালিতে নদীর জলও যেন নেচে ওঠে ছলাৎ ছলাৎ ছন্দে।

অঞ্চলভেদে বাংলার নৌকা বাইচ: লোকসংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় রূপ নদীমাতৃক বাংলাদেশের একেক অঞ্চলের নদী, হাওর এবং বিলের প্রকৃতি যেমন ভিন্ন, তেমনি সেসব অঞ্চলে প্রচলিত নৌকা বাইচের ধরন এবং নৌকার গঠনেও রয়েছে বৈচিত্র্যের ছোঁয়া। বর্ষার ভরা যৌবনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন নামে, ভিন্ন আঙ্গিকে এবং নিজস্ব লোকজ বৈশিষ্ট্যে যে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচগুলো অনুষ্ঠিত হয়, তা স্থানীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করে এক অনন্য রূপ নেয়।

সিলেটের হাওরাঞ্চল: সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে নৌকা বাইচ এক তুমুল জনপ্রিয় উৎসব। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর কিংবা হাকালুকি হাওরের বাইচ দেখার মতো। এই অঞ্চলে সাধারণত ‘খেলনা নৌকা’ এবং ‘সারঙ্গী নৌকা’ বেশি ব্যবহৃত হয়। লম্বায় একেকটি নৌকা প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ফুট পর্যন্ত হয়। হাওরের বিশাল জলরাশিতে যখন সারিগানের সুরে শত বৈঠা একসাথে পানিতে পড়ে, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হয়।

পাবনা ও চলনবিল অঞ্চল: উত্তরবঙ্গের পাবনা, সিরাজগঞ্জ এবং নাটোর জেলা জুড়ে বিস্তৃত চলনবিল অঞ্চলের নৌকা বাইচের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই অঞ্চলে ‘ছিপ নৌকা’ এবং ‘কোষা নৌকা’ সবচেয়ে জনপ্রিয়। ছিপ নৌকাগুলো অত্যন্ত সরু এবং পানির ওপর দিয়ে তীরের বেগে ছুটে চলতে পারে। পাবনার ইছামতী নদী এবং চলনবিলের বুক চিরে যখন এই বাইচ অনুষ্ঠিত হয়, তখন উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ জনপদে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং তিতাস নদী: নৌকা বাইচের কথা বললে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীর নাম স্বতঃস্ফূর্তভাবেই চলে আসে। গত ১২ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ দুই বছর পর তিতাস নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা আবার রাজকীয়ভাবে ফিরে আসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাইচে ‘ময়ূরপঙ্খী’ এবং ‘ছিপ’ নৌকার আধিপত্য বেশি দেখা যায়। নৌকার গলুইতে কাঠের তৈরি ময়ূরের অবয়ব এবং বাহারি রঙের কারুকাজ এই অঞ্চলের বাইচকে দারুণ নান্দনিক করে তোলে।

ফরিদপুর এবং কুমার নদ: ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় কুমার নদের নৌকা বাইচ এই অঞ্চলের এক গৌরবময় লোক-ঐতিহ্য বহন করে আসছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে দীর্ঘ বিরতির পর কুমার নদের বুকে এই ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ পুনরায় ফিরে আসে। এতে ‘কোষা’ এবং ‘বাচারি’ নৌকার দাপট ছিল সবচেয়ে বেশি। কুমার নদের দুই পাড়ে লাখো মানুষের উপস্থিতি এবং গ্রামীণ মেলা পুরো ফরিদপুর অঞ্চলে এক অভূতপূর্ব উৎসবের আমেজ তৈরি করে।

কিশোরগঞ্জ এবং ঘোড়াউত্রা নদ: কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ঘোড়াউত্রা নদীর প্রেমঘাট এলাকায় গত ১৮ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছর পর ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। নিকলী সিটিজেন্স সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রতিযোগিতায় বৃহত্তর সিলেট এবং ময়মনসিংহের অন্তত ১২টি বিশালাকার নৌকা অংশ নেয়, যা হাওরবাসীকে মেতে তুলেছিল বাঁধভাঙা উল্লাসে।

ঢাকা এবং বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা: ঢাকার ৪১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত ২১ আগস্ট ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বুড়িগঙ্গা নদীতে বর্ণাঢ্য নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। খোলামোড়া ঘাট থেকে ওয়াইজ ঘাট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আহসান মঞ্জিল সংলগ্ন নবাব বাড়ির ঐতিহাসিক গোল তালাবেও (পুকুর) দীর্ঘ ৩২ বছর পর জল-উৎসব এবং প্রতীকী নৌকা বাইচের চমৎকার আয়োজন করা হয়।

মানিকগঞ্জ এবং কালীগঙ্গা নদ: মানিকগঞ্জের বেউথা এলাকায় কালীগঙ্গা নদীর বুকে নৌকা বাইচ এই অঞ্চলের শতবর্ষী এক লোক-ঐতিহ্যের স্মারক গত ৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক উৎসবমুখর নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা, যেখানে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের ঢল নামে। এই বাইচে খেল্লা, ঘাসি, ছান্দি এবং পানসি ক্যাটাগরিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ২২টি নৌকা অংশ নেয়।

প্রতিযোগিতায় কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে আসা শালকাঠের তৈরি ‘মায়ের দোয়া’ খেল্লা নৌকাটি প্রথমবার অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে মোটরসাইকেল জিতে নেয়। এ ছাড়া ঘাসি নৌকায় সিংগাইরের ‘বাইমাইল এক্সপ্রেস’, ছান্দিতে হরিরামপুরের ‘গায়ান বাড়ি’ এবং পানসি নৌকায় মানিকগঞ্জ সদরের ‘জাগীর জনতা এক্সপ্রেস’ প্রথম স্থান অধিকার করে। এই অঞ্চলের বাইচকে কেন্দ্র করে নদীর দু-পাড়ে বসে বিশাল লোকজ মেলা এবং নাগরদোলার আয়োজন।

অঞ্চলভেদে নৌকার নাম কিংবা সারিগানের সুরে ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু পানির বুকে গতির লড়াই এবং মিলনের যে মূল সুর— তা সব অঞ্চলেই এক। নৌকা বাইচ কেবল একটি অঞ্চলের সীমানায় আবদ্ধ নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের একতার এবং প্রাণের উৎসব। আঞ্চলিক এই বৈচিত্র্যই মূলত আমাদের লোকসংস্কৃতিকে আরও বেশি সমৃদ্ধ এবং রঙিন করে তুলেছে।

বাঙালিয়ানার মেলবন্ধন এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট: আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও নৌকা বাইচের আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। এটি আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। এখানে নেই কোনো ভেদাভেদ, সবাই এক হয়ে মেতে ওঠে জয়ের উল্লাসে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও তীরের বেগে ছুটেছে ছিপ-কোষা-বাচারি নৌকা। জাতীয়ভাবে এবং বিভিন্ন করপোরেট স্পনসরশিপের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বর্ণাঢ্য নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে, যা আমাদের এই লোকজ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখছে।

নৌকা বাইচ কেবলই একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির সাহসিকতা, একতা এবং শক্তির প্রতীক। যান্ত্রিক সভ্যতার এই যুগেও নদীর বুকে শত মাঝির এক সুরে বৈঠা চালনার এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা নদীর সন্তান, আমরা নদীর মতোই গতিশীল এবং প্রাণবন্ত। বাঙালির এই নিজস্ব কৃষ্টি এবং ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে নদীগুলোকে দূর্ষণমুক্ত রাখা এবং নিয়মিত এমন লোকজ উৎসবের আয়োজন করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। সূত্র: বাসস

ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরেও জিম্বাবুয়ের নাগরিকদের দুর্ভোগ অব্যাহত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

রবিবার, ৪ই অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০২:৪৫ পি.এম


দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরেও জিম্বাবুয়ের নাগরিকদের দুর্ভোগ অব্যাহত

দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে জিম্বাবুয়েতে ফিরে আসা হাজার হাজার মানুষ বর্তমানে নতুন অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন। বিদেশে দীর্ঘ সময় থাকার পর দেশে ফিরে আসা অনেকের জন্য কাজ এবং পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ার কারণে জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠেছে।

৩০ বছর বয়সী সামান্থা চিমবুয়া ২০১৯ সালে ভালো সুযোগের আশায় জিম্বাবুয়ে ছেড়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি কাজ পেয়েছিলেন, যা দিয়ে দুই সন্তানের খাবার ও পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছিলেন এবং চিকিৎসাসেবাও পাচ্ছিলেন। কিন্তু একসময় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেন তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকায় অনিবন্ধিত অভিবাসীদের ৩০ জুনের মধ্যে দেশ ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছিল অভিবাসীবিরোধী কয়েকটি গোষ্ঠী। বাড়িতে বাড়িতে অভিযান ও দেশ ছাড়ার হুমকির কারণে ভয় পেয়ে চিমবুয়া নিজের জিনিসপত্র নিয়ে জিম্বাবুয়েতে ফিরে আসেন।

চিমবুয়া জানান, তখন পরিস্থিতি আর নিরাপদ ছিল না। বাড়িতে অভিযান চালানো হচ্ছিল এবং তাদের চলে যেতে সতর্ক করা হচ্ছিল। এতে তিনি ভীত হয়ে পড়েছিলেন।

অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভের সময় তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার কোয়াজুলু-নাটাল এলাকায় ছিলেন। অভিবাসীবিরোধী একটি গোষ্ঠী অভিযোগ করেছিল, অনিবন্ধিত অভিবাসীরা স্থানীয়দের কাজ কেড়ে নিচ্ছেন এবং সরকারি সেবার ওপর চাপ তৈরি করছেন।

তবে ৩০ জুনের সময়সীমা দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার দেয়নি। সরকার ওই দিনকে সাধারণ দিন হিসেবেই উল্লেখ করে এবং ভয় দেখানো ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিল। এরপরও অস্থিরতার আশঙ্কায় হাজারো অভিবাসী দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়েন।

জিম্বাবয়ের তথ্য ও প্রচারমন্ত্রী জেমু সোডার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৮ জুলাই পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭০ জন জিম্বাবুয়ের নাগরিক দেশে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে ৩৬ হাজার ৯৪০ জন সরকারি সহায়তা পেয়েছেন। বাকি ৭৯ হাজার ৭৩০ জন নিজ উদ্যোগে দেশে ফিরেছেন। এ ছাড়া আরও ৩৮ হাজার ৫৭ জন কর্মসংস্থানের জন্য নিবন্ধন করেছেন।

দেশে ফিরেও সংকট

চিমবুয়ার জন্য দেশে ফিরে আসা মানে ছিল সেই অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হওয়া, যে কারণে তিনি ২০১৯ সালে জিম্বাবুয়ে ছেড়েছিলেন। বর্তমানে তিনি কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না এবং পরিবার ও বন্ধুদের সহায়তায় চলছেন। তার স্বামী এখনো দক্ষিণ আফ্রিকায় রয়েছেন এবং তিনিও সেখানে সমস্যার মধ্যে আছেন।

দেশে ফিরে ছোট ব্যবসা শুরু করার জন্য একটি অনুদান পাওয়ার আশা করেছিলেন চিমবুয়া। কিন্তু এখনো সেই অর্থ পাননি বলে জানান তিনি।

জিম্বাবুয়ে খ্রিষ্টান জোটের নির্বাহী পরিচালক উসেনি সিবান্দা বলেন, অনেক দেশে ফেরত আসা মানুষ বছরের পর বছর বিদেশে ছিলেন। দেশে ফেরার সময় তাদের চাকরি বা পর্যাপ্ত সহায়তা নেই। অনেকে বিদেশে থাকার সময় জিম্বাবুয়েতে বাড়ি বা সম্পত্তি তৈরি করেননি। ফলে দেশে ফিরে তাদের হাতে তেমন কিছু থাকছে না।

তিনি বলেন, দেশে এমনিতেই কর্মসংস্থানের সংকট রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশ থেকে ফিরে আসা মানুষের জন্য সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়।

তবে জিম্বাবুয়ে সরকার বলছে, তারা দেশে ফেরত আসা মানুষদের সহায়তার চেষ্টা করছে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড্যানিয়েল গারুয়ে জানান, ফেরত আসা মানুষের দক্ষতা ও প্রয়োজন চিহ্নিত করতে তাদের তথ্য যাচাই ও তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে।

ফেরত আসা মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে। যোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে যারা দেশে ফিরেছেন, তাদের নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনা করছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

এছাড়া দক্ষ দেশে ফেরত আসা মানুষদের চাকরি দিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহীদের সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।

দক্ষতাই কারও কারও ভরসা

কেউ কেউ দক্ষিণ আফ্রিকায় অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে দেশে ফিরে নতুন করে জীবিকা গড়ার চেষ্টা করছেন।

জিম্বাবুয়ের জভিম্বা এলাকার বাসিন্দা সিডনি বুনিয়া অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ২০২০ সালের মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন। প্রথমে জোহানেসবার্গে বিভিন্ন কাজ করেন। পরে পোর্ট এলিজাবেথে গিয়ে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে পেশাদার কাঠমিস্ত্রিদের সঙ্গে কাজ শুরু করেন।

ধীরে ধীরে কাঠের কাজের দক্ষতা বাড়িয়ে বড় বড় কাজের সুযোগ পান তিনি। বিশেষ করে ছাদের কাঠামো তৈরিতে দক্ষ হয়ে ওঠেন।

কিন্তু ২০২৬ সালে কাজের অনুমতিপত্র দেখানোর দাবিতে বিভিন্ন গোষ্ঠী তার কর্মস্থলে অভিযান চালাতে শুরু করে। তার কাছে শুধু পাসপোর্ট থাকায় হয়রানির ভয়ে নিয়োগদাতারাও তাকে কাজ দিতে অনীহা দেখাতে থাকেন।

শেষ পর্যন্ত কাঠমিস্ত্রির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে জিম্বাবুয়েতে পাঠিয়ে দেন বুনিয়া। এরপর ৩০ জুনের সময়সীমার আগেই দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন।

নিজের সঞ্চয় দিয়ে দেশে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। বর্তমানে সেই ব্যবসা দিয়ে তার পরিবারের খরচ চলছে এবং আরও পাঁচজন সেখানে কাজ করছেন।

বুনিয়া বলেন, ব্যবসা শুরু করা কঠিন ছিল। তবে এখন তিনি আগের চেয়ে বেশি কাজ পাচ্ছেন।

জিম্বাবুরের বিভিন্ন গির্জাও দেশে ফেরত আসা মানুষদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে কোথাও কোথাও তাদের ঝালাই, কাঠের কাজ ও কম্পিউটার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার দাবি

গির্জাগুলো দেশে ফেরত আসা মানুষদের আশ্রয়, খাবার ও যাতায়াতে সহায়তা করলেও তাদের প্রয়োজন অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন জিম্বাবুয়ের ধর্মতত্ত্ব কলেজের সভাপতি রে মোৎসি।

তিনি দেশে ফিরে আসা মানুষদের জন্য সরকারের আরও কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, শুধু তাদের দেশে ফিরিয়ে আনলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; নতুন করে সমাজ ও অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

হারারের মানবাধিকারকর্মী রাশওয়েট মুকুন্দুও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, দেশে ফেরত আসা মানুষদের ছোট অনুদান, কৃষি উপকরণ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দেওয়া হলে তারা নিজেদের জীবিকা গড়ে তুলতে পারবেন।

তার মতে, মূল চ্যালেঞ্জ শুধু জিম্বাবুয়ের নাগরিকদের সীমান্ত পার করে দেশে ফিরিয়ে আনা নয়; দেশে ফেরার পর তাদের অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করাও জরুরি।

দেশে ফিরে নিজের ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা থাকলেও অর্থের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন চিমবুয়া।

সূত্র: আল জাজিরা

ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

জিলেট স্টেডিয়ামে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ টি-শার্ট পরে গান গাইলেন জ্যাক ব্রায়ান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

রবিবার, ৪ই অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০২:৪৫ পি.এম


জিলেট স্টেডিয়ামে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ টি-শার্ট পরে গান গাইলেন জ্যাক ব্রায়ান

যুক্তরাষ্ট্রের বস্টনের নিকটবর্তী জিলেট স্টেডিয়ামে মার্কিন কান্ট্রি সংগীতশিল্পী জ্যাক ব্রায়ান ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ লেখা টি-শার্ট পরে গান পরিবেশন করেছেন। শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাতে অনুষ্ঠিত কনসার্টে তার এই পোশাকের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। খবর এনবিসির।

ভিডিওতে দেখা যায়, ৩০ বছর বয়সী ব্রায়ান কালো হাতাকাটা টি-শার্ট পরে মঞ্চে গান গাইছেন। টি-শার্টের ওপর সাদা অক্ষরে লেখা ছিল ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ যা তার পরিবেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

ব্রায়ানের এই পরিবেশনা এমন একটি সময়ে ঘটেছে, যখন জিলেট স্টেডিয়ামের মালিক রবার্ট ক্রাফটের বিরুদ্ধে বিতর্ক চলছে। নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের মালিক হিসেবে ক্রাফট ইসরায়েলের কঠোর সমর্থক হিসেবে পরিচিত।

গত মাসে র‍্যাপার ম্যাকলমোর অভিযোগ করেন, ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে কথা বলার কারণে ক্রাফটের চাপের ফলে এড শিরানের ট্যুর থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়। নিউ জার্সিতে ট্যুরের অনুষ্ঠানে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলার পর এ ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ক্রাফট তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি। তবে তিনি জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনিদের সমর্থন দমিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য তার ছিল না। বরং শিরানের ট্যুরের জন্য জিলেট স্টেডিয়ামে সবার জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন।

ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে শিরানের ট্যুর থেকে সরে দাঁড়ান উদ্বোধনী পরিবেশনার শিল্পী অ্যারন রো, লুকাস গ্রাহাম, ফিনিয়াস এবং তার হাউস ব্যান্ড বিওগাও।

ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার খবর প্রকাশের পর শিরান তার প্রথম কনসার্টে এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি কখনোই অ্যাক্টিভিস্ট সংগীতশিল্পী হতে চাইনি। কিন্তু এই ঘটনা আমাকে বাক্‌স্বাধীনতা এবং বিশ্বের সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তীব্র বিতর্কের মাঝখানে এনে দিয়েছে।’

গত সপ্তাহে শরতের জন্য ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন ট্যুর’ ঘোষণা করেছেন ম্যাকলমোর। তবে এ সফরের কোনো আয়োজনে জিলেট স্টেডিয়াম অন্তর্ভুক্ত থাকবে না।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে সংগীত ও পপ সংস্কৃতির অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি করে আসছে। এ সংঘাতের প্রভাব স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে শুরু করে নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টের কস্টিউম ইনস্টিটিউটের প্রদর্শনীতেও লক্ষ্য করা যায়।

স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর যুদ্ধ শুরু হয়। ওই হামলায় ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।

জ্যাক ব্রায়ান ‘সামথিং ইন দ্য অরেঞ্জ’, কেসি মাসগ্রেভসের সঙ্গে গাওয়া ‘আই রিমেম্বার এভরিথিং’ এবং ‘পিঙ্ক স্কাইজ’ গানগুলোর জন্য পরিচিত। গ্র্যামি পুরস্কারজয়ী এই শিল্পী কয়েক বছর মার্কিন নৌবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময় তিনি গান লেখা ও রেকর্ডিং চালিয়ে গেছেন।

ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

বেঁচে থাকতেই কবর খুঁড়ে ‘চল্লিশার’ আয়োজন, এলাকায় চাঞ্চল্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ক্রাইম বিডি ডেস্ক

রবিবার, ৪ই অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০২:৪৬ পি.এম


বেঁচে থাকতেই কবর খুঁড়ে ‘চল্লিশার’ আয়োজন, এলাকায় চাঞ্চল্য

একটি পাকা কবর, যা ইট-পাথরে মোড়ানো। এর চারপাশে রয়েছে পরিপাটি পরিবেশ, পিলার, ছাদ এবং ছোট ছোট মিনার। প্রথমবার দেখলে এটি সাধারণ কোনো ঘর মনে হতে পারে, কিন্তু এটি আসলে প্রস্তুত রাখা একটি কবর। গত পাঁচ বছর ধরে নিজের হাতে এই কবরটি তৈরি করে রেখেছেন এক বৃদ্ধ, যিনি জীবনের শেষ দিনগুলো গুনছেন এর পাশে বসে।

এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা, যা ঘটেছে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কুশাডাঙ্গা গ্রামে। বৃদ্ধের নাম আব্দুর রহিম। প্রতিদিন নিয়মিতভাবে তিনি এই কবরের যত্ন নেন। ধুলোবালি জমলে নিজ হাতে পরিষ্কার করেন। শুধু নিজের জন্য নয়, মৃত্যুর পর স্ত্রী যেন পাশে ঠাঁই পান, সেই উদ্দেশ্যে স্ত্রীর জন্যও একটি কবর খুঁড়ে রেখেছেন তিনি। আত্মীয়স্বজনদের কাছে তার শেষ আকুতি হলো, মৃত্যুর পর যেন দুজনকে পাশাপাশি দাফন করা হয়।

মৃত্যুর পর সন্তানরা ঠিকঠাক দাফন-কাফন করবেন কি না, এই শঙ্কা ও মানসিক ভাবনা থেকেই মূলত আব্দুর রহিম এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এমনকি, মৃত্যুর পর যেন কারও ওপর বোঝা হতে না হয়, সেই কারণে জীবিত অবস্থাতেই নিজের কুলখানি, চল্লিশা এবং দোয়া মাহফিলের মতো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে রেখেছেন তিনি।

এমন আগাম প্রস্তুতি ও ব্যতিক্রমী কাণ্ড দেখতে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে উৎসুক মানুষ আব্দুর রহিমের বাড়িতে ভিড় করছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ বিষয়টিকে কৌতূহল ও বিস্ময়ের চোখে দেখছেন, তবে কেউ কেউ বলছেন, জীবনের চরম সত্যকে এত কাছ থেকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা সত্যিই বিরল।

পৃথিবীর মায়াজাল ছিন্ন করে একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে পরপারে। কিন্তু মহেশপুরের আব্দুর রহিমের এই প্রস্তুতি কি শুধুই আক্ষেপ ও লোকদেখানো, নাকি মৃত্যুর অবধারিত সত্যকে অতি নিকটে মেনে নেওয়ার এক অদ্ভুত মানসিকতা—এ নিয়ে পুরো এলাকায় আলোচনা ও কৌতূহল এখন তুঙ্গে।

ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ৮ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪২
জোহর ১১:৪৪
আসর ০৩:৫২
মাগরিব ০৫:২৯
ইশা ০৬:৪০
সূর্যোদয় : ০৫:৫৭ সূর্যাস্ত : ০৫:২৯
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%