০৮:৫৭ পি.এম
মমূর্ষ রোগী কিংবা আহত কোনো ব্যক্তিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে বিনা চিকিৎসায় বাড়িতে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। তিনটি গ্রামের মানুষদের একমাত্র সাঁকো পার হয়ে হাতিয়া উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে হতো। এছাড়া দুর্যোগের সময় সাঁকো পার হতে গিয়ে অঙ্গহানীর মতো ঘটনা ঘটেছে অনেক।
উপজেলা সদরের ১০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত তিনটি গ্রাম এই সাঁকোর কারণে অনেকটা বিচ্ছিন্ন ছিল। উন্নত যোগাযোগের অভাবে আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া এখানে লাগেনি। দীর্ঘ ৫০ বছর পর সাঁকোটি ভেঙে কাঠের ব্রিজ তৈরি করেছে প্রশাসন, যা তিন গ্রামের চিত্র বদলে দিয়েছে।
নোয়াখালী হাতিয়ার তমরদ্দি ইউনিয়নের দক্ষিণে কোরালিয়া, পশ্চিম জোড়খালী ও মাইজচরা গ্রামের অবস্থান। এই তিন গ্রামে প্রায় ১০-১৫ হাজার পরিবারের বসবাস। বাসিন্দাদের তমরদ্দি বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় যেতে কাটাখালী খাল পার হয়ে যেতে হতো। স্বাধীনতার পূর্ব থেকে এই খালে নির্মিত সাঁকো পার হয়ে মানুষদের যাতায়াত করতে হয়েছে।
আরও পড়ুন: কমিউনিটি ব্যাংকে চাকরির সুযোগ, বয়স ২৩ হলেই আবেদন করতে পারবেন
স্থানীয়দের মতে, প্রায় দুইশত ফুট দৈর্ঘ্যের এই সাঁকো পার হতে গিয়ে অনেক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। মুমূর্ষ রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সবাইকে এই সাঁকো পার হয়ে প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো। দোকানের মালামাল মাথায় বহন করে এপার ওপার করতে হতো। এই দীর্ঘ সময়ে সাঁকো পার হতে গিয়ে অঙ্গহানীর ঘটনা ঘটেছে অনেক। শিক্ষার্থীদের সাঁকো থেকে পড়ে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মাথায় মালামাল বহন করতে গিয়ে কয়েকজন শ্রমিক পঙ্গু হয়েছেন।
কোরালিয়া গ্রামের খালের পাড়ে বেড়ীর উপর দোকান করেন নুরউদ্দিন শেরআলী (৬০)। আলাপকালে শের আলী জানান, তার দোকানের মালামাল আনতে তমরদ্দি বাজার থেকে আসতে হয়। নির্দিষ্ট ভ্যান গাড়ির চালক মাল নিয়ে এসে খালের ওপারে রেখে মাথায় বহন করে সাঁকো পার হয়ে দোকানে পৌঁছে দেন। গত বছর এভাবে মাল আনতে গিয়ে চিনির বস্তাসহ সাঁকো ভেঙে খালে পড়ে যান নুর ইসলাম নামে এই ভ্যান চালক। এতে তার এক হাত ও এক পা ভেঙে যায়। ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করেও সুস্থ হননি। এখন তিনি পঙ্গু হয়ে ঘরে বসবাস করছেন।
শের আলী আরও জানান, এই সাঁকো পার হয়ে গ্রামের শিক্ষার্থীদের তমরদ্দি উচ্চ বিদ্যালয়ে যেতে হয়। ২০২৫ সালের শেষের দিকে হঠাৎ এক ছাত্রী খালে পড়ে ভেসে যেতে থাকে। সঙ্গে থাকা সহপাঠিদের চিৎকারে দোকান থেকে লোক দৌড়ে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা সিরাজ মিয়া (৮৫) জানান, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় এই গ্রামে মেয়েদের বিয়েতে অনিহা ছিল অন্যান্য গ্রামের মানুষের। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই সাঁকো পার হয়ে তমরদ্দি বাজার আসা যাওয়া করেন। দিনের বেলায় আসা যাওয়া করা সম্ভব হলেও রাতে তা মোটেও সম্ভব ছিল না।
আরও পড়ুন: সপ্তাহে ২ দিন ছুটিসহ ওয়ার্ল্ড ভিশনে চাকরির আবেদন ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত
তিনি আরও জানান, একবার ছেলে বউয়ের প্রথম সন্তান হওয়ার সময় সমস্যা দেখা দেয়। গ্রামের চিকিৎসকরা দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সারারাত অপেক্ষা করে সকালে নৌকা দিয়ে খাল পার করে হাসপাতালে যেতে হয়েছে।
সিরাজ মিয়া আরও বলেন, নির্বাচনের সময় বিভিন্ন সময় জনপ্রতিনিধিরা আশ্বাস দিলেও পরে তা মনে রাখেননি। সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কোনো এক কাজে এই গ্রামে আসতে গিয়ে সাঁকো দেখে থমকে দাঁড়ান। পরে তিনি নিজ উদ্যোগে কাঠের এই ব্রিজ তৈরি করে দেন। নিজের শেষ সময়ে এসে গ্রামের মানুষের এই কষ্ট দেখে বৃদ্ধ সিরাজ মিয়া অনেকটা আবেগ আপ্লুত হয়েছেন।
সম্প্রতি ব্রিজটি সরেজমিনে দেখতে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের অনেক লোক একসঙ্গে জড়ো হয়ে ব্রিজটি দেখছেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই আনন্দে আত্মহারা। শুধু গ্রামের বাসিন্দারাই নয়, অন্যান্য জায়গা থেকে দীর্ঘ এই সেতু দেখতে মানুষ আসছেন। দৃষ্টিনন্দন ব্রিজটি সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। নিচে সিমেন্টের খুঁটি দিয়ে তার উপর কাঠের পাটাতন দেওয়া হয়েছে এবং পাশে হাতল দেওয়া হয়েছে। পুরো ব্রিজটি সম্পূর্ণ রঙ দিয়ে সাজানো হয়েছে। গ্রামের মানুষ সাইকেল ও মোটরসাইকেল চালিয়ে পারাপার হচ্ছে। এ নিয়ে সবার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ বিরাজ করছে। তাদের আশা একসময় এই কাঠের ব্রিজটিও ইট পাথরের ব্রিজ হবে।
প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরত্বে সোনাদিয়া থেকে এই ব্রিজটি দেখতে আসেন আরিয়ান ফরিদ নামে একজন। ফরিদ জানান, লম্বা ব্রিজটি রঙ দিয়ে সাজানো হয়েছে। দূর থেকে দেখতে এটি অনেকটা সুবিশাল ব্রিজের মতো মনে হয়। এটি এখন দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
আরও পড়ুন: দেশ ছেড়ে কেন প্রতিবেশী দেশে যাবেন, এ মাটিই আপনাদের: বরিশাল কমিশনার খলিল আহমেদ
এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, সম্পূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এলাকাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। একটি সাঁকোকে ব্রিজে রূপান্তর করে এই অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। এখানে ইট পাথরের সেতু তৈরি করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন