০৬:৫৭ পি.এম
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সন্তান হারানোর ফলে মা-মেয়েদের কান্না, বাবা-ব্যথায়, ভাইয়ের আহাজারি এবং আহত যোদ্ধাদের দুঃখ আজ রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রকে ভারী করে তুলেছে।
শনিবার (০৪ জুলাই) জুলাই জাতীয় সম্মেলনে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মুখে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা প্রাণপণ কাঙ্ক্ষित প্রতিটি হত্যার বিচার, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। এই সম্মেলন কেবল ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনের পতনের ২ বছর পরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি এবং আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনটি দেশের নানা প্রান্ত থেকে শহীদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হাজির হয়েছে, যারা তাদের কষ্ট, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং প্রত্যাশার বর্ণনা তুলে ধরেছেন। বক্তব্য দিতে গিয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। পুরো মিলনায়তন কান্না এবং দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: ‘আল্লাহর বাড়ি মানুষ যায় পবিত্র নিয়তে, ওখানে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঠিক না’ হুমায়ুন কবিরের মন্তব্য
শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আব্দুল রব মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠস্বর বলেন, ‘জুলাই এলেই চোখের পানির বাঁধ ভেঙে যায়। ৫ আগস্ট আমার ছেলে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পুলিশের দ্বারা। আমি একজন হতভাগা বাবা হিসেবে এই অন্যায়ের বিচার চাই, প্রতিটি জুলাই যোদ্ধা হত্যার বিচার চাই।’
চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, ‘আমার ছেলে আর ফিরে আসবে না। কিন্তু সরকারের কাছে দাবি, যেন আর কোনো বাবা-মায়ের কোল খালি না হয়। সরকার এখন জুলাই যোদ্ধাদের যারা হাত-পা হারিয়েছে, তাদের সহায়তা করুক। তারা যেন কষ্টে না থাকে।’
আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ভাই ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন দিয়েছে। তার অনুপ্রেরণায় অনেকেই শহীদ হয়েছেন, কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। অনেক পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। তাদের পাশে সরকার দাঁড়াতে হবে। আমি চাই আমার ভাই হত্যার দ্রুত বিচার হোক। পাশাপাশি আমি দেশজুড়ে জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছি।’
শহীদ আব্দুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, ‘আমার বড় ছেলে জাহিদ মারা যাওয়ার পরে আমার ছোট ছেলের ক্যান্সার ধরা পড়ে। আমি অসহায় অবস্থায় এমন কোনো দরজায় গণিনি যেখানে যাইনি, তবে সহায়তা পাইনি। কিন্তু ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর প্রত্যেকটি সদস্য আমাদের পাশে ছিলেন।’
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লন্ডন থেকে আমাদের খোঁজ নিয়েছিলেন, সহায়তা করেছিলেন। এখন বিএনপি সরকারের কাছে একটাই দাবি- সকল জুলাই যোদ্ধাদের হত্যার বিচার চাই। আমি যেভাবে বিএনপির কাছে সহায়তা পেয়েছি, অন্য জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরাও সহায়তা পাক। আমার সন্তানকে তো আমি ফেরত পাব না, তবে সবাই তার জন্য দোয়া করবেন।’
শহীদ আলভীর বাবা আবুল হাসান বলেছেন, ‘আমার ছেলে ৪ আগস্ট মিরপুরে মারা যায়। দুই বছর পার হলেও অন্তবর্তী সরকার বিচারের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিচারের জন্য রাস্তায় আন্দোলন করেছি কিন্তু কিছুই ঘটেনি। তখন আমাদের আশা ছিল যে, তারেক রহমান দেশে ফিরবেন, ক্ষমতায় আসবেন এবং আমাদের সন্তান হত্যার বিচার করবেন। আমরা আশা রাখি, তিনি আমাদের চোখের পানির মূল্য দেবেন।’
দুই পা হারানো জুলাই যোদ্ধা শাহীন মালু বলেন, ‘গত ১৭ বছর জিয়া পরিবার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দেশটাকে ভালো রাখতে হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে থাকুন। শহীদ পরিবার যদি চান তবে তারেক রহমানকে সহায়তা করুন। এই দেশ তার কাছেই নিরাপদ। আজকে বুকটা ভরে যায়; দুইটা পা হারিয়েছি, কিন্তু দুঃখ নেই, তবে জুলাই যোদ্ধাদের হত্যার বিচার যেন দেখতে পারি।’
আহত julho যোদ্ধা মিল্লাত হোসেন বলেন, ‘আমি একজন আহত julho যোদ্ধা। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের দাবিতে নয়াপল্টন থেকে মিছিল নিয়ে প্রেসক্লাবের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন আমি গুলিবিদ্ধ হই। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়, কিন্তু হাসপাতাল পর্যন্ত চিকিৎসা পাইনি। প্রথমে আমার পরিবারকে বলা হয়েছিল আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছি। এরপর থেকে আমার বাবা অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে যান, পরে মারা যান। আমরা শুধু জুলাই যোদ্ধা নই, গত ১৭ বছরের যোদ্ধা। আমি সকল জুলাই যোদ্ধা হত্যার বিচার চাই।’
আরও পড়ুন: ক্ষমা চাইলেন ‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক চাই না’ বলা এমপি রতন
আউটস্ট জুলাই যোদ্ধা সুজন মোল্লা বলেন, ‘লন্ডন থেকে তারেক রহমান একদফার ঘোষনা দিয়েছিলেন। এই জন্য আন্দোলন করেছিলাম। এই একদফা বাস্তবায়িত হয়েছে বলেই স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। জুলাই শহীদ পরিবার থেকে শুরু করে দেশের মানুষ নিরাপদে বাস করছে। তবে আমাদের আক্ষেপ থেকে গেছে। শহীদ যোদ্ধাদের হত্যা মূল্যায়নে বর্তমানে বিচার এখনও হয়নি। তবে রাষ্ট্রযন্ত্র এখন প্রধানমন্ত্রীর হাতে, তিনি চাইলেই দ্রুত জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে পারবেন। আমরা অপেক্ষায় আছি।’
আহত আলামিন জানান, ‘আমার একটা হাত নেই, মাঝে মাঝে ব্যথায় কাঁপতে থাকে। চিকিৎসা করতে পারি না। আমার মতো আরও কত শত যোদ্ধা এমন হাত-পা হারিয়ে আছে তা বোঝা যায় না। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাবো, আমার মতো হাত-পা হারানো যোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।’
জুলাই যোদ্ধা মেহেদী হাসান মিরাজ বলেন, ‘শুধুমাত্র জাতীয়তাবাদী দলের সমর্থক হওয়ার কারণে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। জুলাই যোদ্ধা হিসেবে বিশেষ কোন সহায়তা পাইনি।’
সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। মঞ্চের ব্যানারে লেখা হয়েছে, ‘গর্বিত ইতিহাস, অদম্য চেতনা; ৪ জুলাইয়ের এই দিন হোক সবার অনুপ্রেরণা; যে আত্মত্যাগ ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে।’
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
সকাল সোয়া ১০টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। পরে শহীদদের স্মরণে দোয়া এবং মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং জুলাই আন্দোলনের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে ‘জুলাই স্মৃতি স্মারক’ তুলে দেন। তখন শহীদ মিরাজের বাবা আব্দুল রব মিয়া, শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, আহত julho যোদ্ধা আল মিরাজ এবং julho যোদ্ধা আমিনুল ইসলাম ঈমন প্রধানমন্ত্রী থেকে স্মারক গ্রহণ করেন। পরে উপস্থিত অন্য পরিবারগুলোর কাছেও স্মারক পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
পরে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতেও একটি স্মৃতি স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে সরকারের মন্ত্রী, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ উপস্থিতে ছিলেন।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে ৫ বিষয়ে অগ্রাধিকার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর
২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল ও সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলার সর্বত্র অভূতপূর্ব গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে তা সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন।
সরকারের প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৪। কিন্তু জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে। সূত্র বাসস
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন