১১:০১ এম
সরকার পুরান ঢাকাকে ‘আরবান রি-জেনারেশন’ ধারণায় সাংহাই মডেলে পুনর্গঠনের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ করার লক্ষ্য রাখার মাধ্যমে আধুনিক ও পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) আগামী তিন মাসের ভিতরেই কাজ শুরু করবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এমন বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তারা পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা তৈরির পরামর্শও দিয়েছেন।
বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা পুরান ঢাকা এবং চীনের হুয়াংপু নদীর তীরে গড়ে ওঠা সাংহাই; এই দুটি শহরের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কিন্তু আধুনিক, পরিকল্পিত সাংহাইয়ের তুলনায় পুরান ঢাকা নানা সমস্যায় ভুগছে। ‘৫২ বাজার ৫৩ গলি’ এলাকার অন্তর্ভুক্ত শতবর্ষী ভবন, সরু রাস্তা, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, অগ্নিঝুঁকি ও তীব্র যানজট রয়েছে।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
জরুরি মুহূর্তে ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স সময়মতো পৌঁছানো ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণের পরিণামে পুরান ঢাকা এখন ঝুঁকিপূর্ণ ও বসবাসের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, অনেক স্থানে পানি জমে থাকে, এবং সঠিকভাবে নিষ্কাশন হয় না। রাস্তার অবস্থা খারাপ। কোথাও আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারে না এবং অ্যাম্বুলেন্সের চলাচলও প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা অনেক বেশি।
এই বর্তমান বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যে সরকার পুরান ঢাকার জন্য একটি বিশাল মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সাংহাই মডেল অনুসরণ করে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে এলাকাটিকে আধুনিক, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগরে রূপান্তর করতে চায় সরকার। এই লক্ষ্যে প্রকল্পের খসড়াও ইতিমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজউক। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, অনুমোদন মিললেই প্লটভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, হংকং, সাংহাই ও টোকিওর মতো শহরগুলো সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ করেই আধুনিক নগরজীবন গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী মৃতপ্রায় নগরজীবনে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনাই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরান ঢাকার ‘আরবান রি-জেনারেশন’ উদ্যোগটি ইতিবাচক। তবে সরাসরি বড় পরিসরে কাজ শুরু না করে আগে ব্লকভিত্তিক পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করে জনগণকে সম্পৃক্ত করা উচিত। একইসঙ্গে মেগা প্রকল্প সফল করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
নগরবিদ ও পরিবেশকর্মী স্থপতি ইকবাল হাবিব জানিয়েছেন, সরকার, বেসরকারি খাত এবং জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নতুন ধারণা বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে চার-পাঁচটি বড় প্রকল্প হাতে নেয়া যায়, তাহলে আগামী তিন বছরের মধ্যেই পুরান ঢাকায় দৃশ্যমান পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
পুরান ঢাকার এই পুনর্গঠন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ২৫৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, তাহলে আগামী তিন মাসের মধ্যেই প্রাথমিক কাজ শুরু হতে পারে। পুরান ঢাকার বাসিন্দারা আধুনিক নগরের স্বপ্ন দেখছেন, তবে তাদের প্রত্যাশা, উন্নয়নের পাশাপাশি এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি যেন অক্ষুণ্ন রাখা হয়। তাদের বিশ্বাস, এতে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার একটি সুন্দর সমন্বয় গড়ে উঠবে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন