১১:১৮ এম
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন সংঘাত ও বিমান হামলার সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সীমান্তে উদ্বেগ বাড়ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ আবারও সীমান্তে আসার চেষ্টা করছে। এর বিপরীতে, যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য বিজিবি ও কোস্টগার্ড সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার কথা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা মতে, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে আশ্রয় নেওয়া বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার চাপ সামলানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কক্সবাজার আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান মন্তব্য করেন, ‘আমরা সবসময় সীমান্ত নিরাপত্তার কথা বলি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, রাতের অন্ধকারে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। যদি সীমান্তে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে এই অনুপ্রবেশ ঠেকানো সম্ভব হবে না। মিয়ানমারের সংঘর্ষ চলুক বা না চলুক, তারা কোনো না কোনো পথ দিয়ে রাতের অন্ধকারে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তাই অনুপ্রবেশ রোধে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।’
এদিকে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার চাপের মধ্যে নতুন করে কাউকে আশ্রয় দেয়ার কোনো সক্ষমতা নেই বলে জানায় শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন। সংস্থাটি আরও বলছে, রোহিঙ্গারা মাতৃভূমি ছেড়ে এলে সংকট আরও বাড়বে এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে যাবে।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান জানান, ‘বর্তমানে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। গত কয়েক বছরে যে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা দেশে এসেছে, তাদের জন্যও পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেকেই পাহাড় কেটে বা পাহাড়ের ভেতরে গর্ত করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে এবং এতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। এই অবস্থায় বোঝা যায়, বাংলাদেশে আর নতুন করে রোহিঙ্গাদের জায়গা দেয়ার মতো সক্ষমতা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাখাইনের পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। সেখানে বিমান হামলা চলছে এবং নতুন যুদ্ধের তীব্রতা বেড়েছে। জানা গেছে, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় আরাকান আর্মির সদস্যরা অবস্থান নেয়ায় ওই অঞ্চলে বিমান হামলা হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গাদের আবারও সীমান্তের দিকে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। ইতিমধ্যে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। প্রতি সপ্তাহে ৩০ থেকে ৫০ জনের মতো বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আরও বেশি মানুষ সীমান্তের দিকে আসতে পারে বলে আমরা শুনছি। তবে বিজিবি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে এবং নতুন অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করবে বলেই আমাদের আশা।’
রোহিঙ্গারা নিজেদের মাতৃভূমি ছেড়ে এলে তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে পড়বে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মো. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতাদের অনুরোধ করেছি, যেন তারা রাখাইনে অবস্থানরত তাদের জনগণকে সেখানেই থাকতে উৎসাহিত করেন এবং বাংলাদেশে আসতে নিরুৎসাহিত করেন।’
রাখাইনে বর্তমানে কতজন রোহিঙ্গা রয়েছে, সে বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও ধারণা করা হয় সেখানে এখনও প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। এছাড়া, প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমারের অন্যান্য অঞ্চলে, বিশেষ করে ইয়াঙ্গুনের দিকে চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
কমিশনার আরও জানান, ‘বর্তমান সংঘাতের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মানুষ প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালিয়ে যায়। তবে আমরা তাদের বারবার বোঝাচ্ছি, যেন তারা নিজেদের স্বজনদের বাংলাদেশে আসতে উৎসাহিত না করেন। কারণ এতে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে যাবে। তাদের উচিত নিজেদের মাতৃভূমিতে থেকেই পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করা, সবমিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং উদ্বেগজনক।’
রাখাইনে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছে বিজিবি। টেকনাফের নাফ নদী থেকে শুরু করে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এবং কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্তে বর্তমানের থেকে বেশি বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক জলযান, ড্রোন প্রযুক্তি ও নিয়মিত টহলের মাধ্যমে সীমান্তে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে কোস্টগার্ড।
কক্সবাজারস্থ ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস. এম. খায়রুল আলম বলেন, ‘বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কিছুটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। সম্প্রতি সেখানে কয়েকটি বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর প্রেক্ষাপটের কারণে ওই এলাকায় অবস্থানরত কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে।’
তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে সীমান্তে সর্বোচ্চ সংখ্যক বিজিবি সদস্য মোতায়েন রয়েছে। আমাদের সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। রোহিঙ্গা হোক বা মিয়ানমারের অন্য কোনো নাগরিক—বাংলাদেশে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করলেই আমরা তাদের শনাক্ত ও আটক করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমাদের নজরদারি যতদূর সম্ভব বিস্তৃত করা হয়েছে, যাতে কেউ আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে।’
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
টেকনাফ কোস্টগার্ড স্টেশনের ইনচার্জ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আরাফাত হোসেন জানান, ‘নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্টগার্ডের বিভিন্ন আধুনিক জলযান দিয়ে ২৪ ঘণ্টা টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন জলযান ও উন্নত ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে নাফ নদীসংলগ্ন এলাকা সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। দিন-রাত সবসময় আমাদের জলযান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহার করে সীমান্ত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্থলভাগেও নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।’
রাখাইনের পরিস্থিতি কোন দিকে এগোচ্ছে, তা সীমান্তের আগামী দিনে চিত্রকে নির্ধারণ করবে। তবে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢল ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন