১০:০৬ এম
১৯ জুলাই উত্তাল জুলাইয়ের অন্যতম রক্তাক্ত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। সেদিন টানা তৃতীয় দিনের মতো সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। র্যাব, পুলিশ এবং বিজিবির গুলিতে অন্তত ৬৬ জন নিহত হন। এ দিন প্রথমবারের মতো আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে হেলিকপ্টার থেকে গুলি শুরু হয়, যা ৫ আগস্ট পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এর পাশাপাশি সরকার আলোচনার আহ্বান জানালেও শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করে ৯ দফা দাবি ঘোষণা করেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রনেতারা জানাচ্ছেন, এই ৯ দফার মধ্যেই একটি দফার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, যা সবার সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হয়।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের ঘটনাবলী শুরু হয় কমপ্লিট শাটডাউনের দ্বিতীয় দিন থেকে। সারা দেশে টানা তৃতীয় দিনের মতো ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। জুমার নামাজের পর ছাত্র-জনতা রাজপথে নামেন। দেশজুড়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি বেসরকারি কোনো হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে সারাদেশে অন্তত ৫৫ থেকে ৬৬ জন নিহত হন। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে সংঘর্ষটি সবচেয়ে বড় আকার ধারণ করে, যা টানা ৭২ ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে।
যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের। তিনি সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, জুমার নামাজ শেষে যখন মসজিদ থেকে মিছিল বের হয়, তখনই গুলি চালানো শুরু করা হয়। এতে মুহূর্তের মধ্যে ৫ থেকে ৭ জন নিহত হন। ফ্লাইওভারের ওপর থেকে মানুষদের মাথা, হাত ও পা লক্ষ্য করে গুলি করা হচ্ছিল।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
১৯ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিএনপি বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। সেখান থেকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে গ্রেফতার করা হয়। অন্যদিকে পল্টন এলাকায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পুলিশ গুলিতে ওই দিন ছাত্রদলের তিন নেতা-কর্মী নিহত হন।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির জানান, নয়াপল্টন ও পুরানা পল্টনে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। তিনি নিজেও রাবার বুলেটে আহত হন, তার তিন সহকর্মী শহীদ হন।
রক্তাক্ত ১৯ জুলাই আন্দোলন দমাতে হেলিকপ্টার থেকে প্রথমবারের মতো গুলি চালাতে শুরু করে র্যাব। বসিলা ব্রিজ এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। মোহাম্মদপুরের আবাসিক এলাকায়ও হেলিকপ্টার থেকে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়। এই অভিযান ৫ আগস্ট পর্যন্ত চলছিল।
মোহাম্মদপুর থানা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র ফেরদৌস হাসান সোহান সেই দিনের স্মৃতি তুলে ধরে জানান, তিন রাস্তার মোড়ে ব্যাপক গোলাগুলি চলছিল। মানুষ ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছিল। তার সামনে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান, মাথায় গুলি করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
১৯ জুলাই আন্দোলনে যোগ দিতে অভিভাবকরাও এসে যোগ দেন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পর। এই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয়ক আব্দুল কাদের সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ৯ দফা দাবি ঘোষণা করেন। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল ছাত্র হত্যার দায় স্বীকার করে শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার এবং সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর পদত্যাগ।
আব্দুল কাদের বলেন, আড়াই ঘণ্টার আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে ৯ দফা চূড়ান্ত করা হয়। এটি কোনো একক ব্যক্তি বা সংগঠনের সিদ্ধান্ত ছিল না; ৯ দফার মধ্যেই একটি দফার বীজ নিহিত ছিল।
ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রসংগঠনের নেতারাও নিশ্চিত করেন, সবার সঙ্গে সমন্বয়ের মধ্যে দিয়েই ৯ দফা ঘোষণা করা হয়েছিল। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিগবাতুল্লাহ জানান, ৯ দফা জনগণকে শেখ হাসিনা সরকার পতনের আন্দোলনে আরও উজ্জীবিত করে। নিরাপত্তার কারণে আবদুল কাদেরকে একাধিকবার নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে।
এদিকে ১৯ জুলাই মধ্যরাতে কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূরকে পুলিশ আটক করে। আন্দোলন দমাতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই সময়ে রাত ১২টা থেকে কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
আরও পড়ুন: সদরঘাটে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানের আকস্মিক পরিদর্শন
বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সেই সময়ে ৯ দফা আন্দোলনের নতুন দিকনির্দেশনা। এর মধ্যেই এক দফার ভিত্তি তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে যায়।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন