০১:৩২ পি.এম
রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইন্সের বহুতল ভবনের seventh তলায় সাইদুল ইসলাম (২১) নামে এক পুলিশ কনস্টেবলের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আত্মহত্যার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে একটি আবেগঘন দীর্ঘ পোস্ট তিনি দিয়েছিলেন। এদিকে, সাইদুলের আকস্মিক মৃত্যুর খবরে তার গ্রামের বাড়ি ফেনীতে শোকের মাতম শুরু হয়েছে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তার মা, এবং তার আহাজারি কিছুতেই থামছে না।
নিহত সাইদুল ইসলাম ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া ইউনিয়নের উত্তর চাঁদপুর গ্রামের মো. সাদেকের একমাত্র ছেলে। তিনি বাংলাদেশ পুলিশে কনস্টেবল হিসেবে যোগদান করেছিলেন প্রায় ৯ মাস আগে। কর্মসূত্রে তিনি ডেমরা পুলিশ লাইন্সের ২০ তলা ভবনের ৭ম তলায় থাকতেন।
সাইদুলের মৃত্যুর খবর ফেনীর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পরিবারের একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় তার মা। প্রতিবেশীরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পুরো এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে তার কান্নায়। কাঁদতে কাঁদতে সাইদুলের মা বলছিলেন, মাগরিবের নামাজের পরও ছেলের সাথে তার কথা হয়েছিল। পরিবারের অমতে গিয়ে করার মত বিয়েই যেন ছেলের জন্য কাল হলো, এমনটাই বিলাপ করে বলছিলেন শোকাতুর মা।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
নিহত সাইদুল ইসলামের চাচা মো. সোহাগ জানান, কিছুদিন আগে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে সাইদুল ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার এক তরুণীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে বিয়ের পর থেকেই তাদের মধ্যে পারিবারিক কলহ শুরু হয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। বিয়ের মাত্র দেড় মাসের মাথায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারেননি সাইদুল। বিচ্ছেদের পর থেকেই সাইদুল চরম মানসিক বিষণ্নতায় ভুগছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত বিরহ সইতে না পেরেই এই অবস্থা।
লেমুয়ার উত্তর চাঁদপুর গ্রামের বাসিন্দা এম. এমরান পাটোয়ারী জানান, পুলিশ লাইন্স থেকে ফোন করে মৃত্যুর খবরটি পরিবারকে জানানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে বিকেলে ডেমরায় প্রথম নামাজে জানাজা পরবে এবং মরদেহ রাতে বাড়িতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। লাশ বাড়িতে আসলে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। শুক্রবার বিকালে নিহতের বাবা মো. সাদেক ডেমরা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছেন।
ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী মুহাম্মদ ফৌজুল আজিম বলেন, ডেমরাতে সাইদুল ইসলাম নামের এক পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছে বলে লোকজনের মুখে শুনেছি। তার বাড়ি নাকি ফেনীতে। এবিষয়ে খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ডেমরা পুলিশ লাইন্সের নিজ কক্ষে গলায় ফাঁস দেন সাইদুল। পরে সহকর্মীরা তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মোহাম্মদ ফারুক জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করা হয়েছে।
আত্মহত্যার প্রায় ১৬ ঘণ্টা আগে নিজের ফেসবুক আইডিতে স্ত্রীর সঙ্গে পুরোনো কিছু ছবি ও ভিডিও সংযুক্ত করে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন সাইদুল। সেখানে বৈবাহিক জীবনের তীব্র মানসিক কষ্ট, হতাশা ও স্ত্রীর প্রতি ক্ষোভের কথাও তুলে ধরেন।
ফেসবুক পোস্টে সাইদুল লিখেছিলেন-'তোমায় কেন্দ্র করে আমি যে জগৎ সাজিয়ে গুছিয়ে গড়ে তুলেছিলাম একটু একটু করে, হঠাৎ যেন সে জগৎটাকে দুদিনেই চোখের সামনে ভেঙেচুরে চুরমার করে দিলে... সমুদ্রের মাঝখানে তরী ডোবা মানুষ অনেকক্ষণ সাঁতার কাটার পর যেমন কূলের দেখা না পেয়ে শেষমেশ নিয়তিকে মেনে নেয়, সাদরে গ্রহণ করে মৃত্যুকে, তেমনি আমারও যেন কিছুই করার নেই।'
সম্পর্কের ইতি টানা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও লেখেন, 'তোমারে ভালোবাসাটা অপরাধ? নাকি সবকিছু উপেক্ষা করে তোমাকে বিয়ে করাটা অপরাধ? তুমি না বলছিলা, মৃত্যু ছাড়া তুমি কখনোই আমাকে ছেড়ে যাবে না? এখন কই তুমি?' স্ত্রীকে বারবার সুযোগ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেন, "মানুষকে এতটাও বিশ্বাস করতে হয় না যে বিশ্বাস করলে নিজেই আর বাঁচার সুযোগ থাকে না।'
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
পোস্টের শেষ অংশে নিজের বাবা-মায়ের প্রতি ক্ষমা চেয়ে অত্যন্ত আবেগতাড়িত কথা লেখেন এই পুলিশ সদস্য। তিনি লেখেন- ‘দুঃখিত আম্মু-আব্বু, আপনাদের ছেলে আর নিতে পারতেছে না আম্মু, আর পারতেছে না। আর তিলে তিলে মরার শক্তি আমার নাই। মাপ করবেন আপনাদের অযোগ্য ছেলেকে।'
একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে সাইদুলের পরিবারে এখন শুধুই শূন্যতা। ঘটনার পেছনে আরো গভীর কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন