০৭:৫৫ পি.এম
আজ ২ অক্টোবর জাতীয় পথশিশু দিবস। দেশের বিভিন্ন শহরের রাস্তায় জীবন কাটাচ্ছে বহু শিশু, যারা শিক্ষা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক শৈশবের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। বিভিন্ন জরিপ ও প্রতিবেদনে তাদের কঠিন জীবনযাপন, শিশুশ্রম, নির্যাতন ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে পথশিশুর মোট সংখ্যা নিয়ে সরকারি নির্দিষ্ট হিসাব হালনাগাদ নেই। তবে ২০২৪ সালের ইউনিসেফের ‘চিলড্রেন লিভিং ইন স্ট্রিট সিচুয়েশনস ইন বাংলাদেশ ২০২৪’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে ৩৪ লাখের বেশি শিশু মা-বাবার সরাসরি যত্ন ছাড়া পথের পরিস্থিতিতে রয়েছে। এই প্রতিবেদনটি ৪০০-এর বেশি শিশুর অভিজ্ঞতা ও দেশের বিভিন্ন জেলার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
স্কুলের বদলে রাস্তায় শৈশব
আরও পড়ুন: ‘আল্লাহর বাড়ি মানুষ যায় পবিত্র নিয়তে, ওখানে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঠিক না’ হুমায়ুন কবিরের মন্তব্য
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘পথশিশু জরিপ ২০২২’ অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগ ও ঢাকার বিভিন্ন পথশিশুদের হটস্পট থেকে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৭ হাজার ২০০ শিশুর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৪০ শতাংশ পথশিশু কখনো কোনো স্কুলে ভর্তি হয়নি। স্কুলে যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ পঞ্চম শ্রেণি শেষ করতে পারেনি। মাত্র ৮ দশমিক ৮ শতাংশ পঞ্চম শ্রেণি শেষ করতে সক্ষম হয়েছে।
একই জরিপে দেখা যায়, ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ পথশিশু পড়তে বা লিখতে পারে না। অর্থাৎ, শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের একটি বড় অংশ তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে কাটছে।
জীবিকার জন্য শিশুশ্রম
‘পথশিশু জরিপ ২০২২’ অনুযায়ী, পথশিশুদের একটি বড় অংশ জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। ছেলে পথশিশুদের ৯২ দশমিক ১ শতাংশ এবং মেয়ে পথশিশুদের ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো না কোনো কাজে যুক্ত রয়েছে।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
কাজের ধরনেও বৈচিত্র্য রয়েছে। ২০ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু আবর্জনা সংগ্রহ করে, ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ ভিক্ষা বা ভিক্ষায় সহায়তা করে, ১৬ শতাংশ পরিবহন ও নির্মাণসংক্রান্ত কাজে যুক্ত এবং ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ দোকান, রেস্তোরাঁ ও চায়ের দোকানে কাজ করে। এছাড়া ৫ শতাংশের কম শিশু ঝাড়ু দেওয়া ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে যুক্ত রয়েছে।
জরিপে আরও দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক কর্মজীবী পথশিশুকে নয় বছর বয়সের আগেই কাজে নামতে হয়েছে। বেশির ভাগ শিশু সপ্তাহে ৩০ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করে এবং তাদের বড় অংশ সপ্তাহে এক হাজার টাকারও কম আয় করে।
কেন পথে আসে শিশুরা
‘পথশিশু জরিপ ২০২২’-এ প্রায় ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, দারিদ্র্যের কারণে তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পথে এসেছে। পরিবারে অশান্তি, খাদ্যসংকট, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও কাজের সন্ধানে অনেক শিশু রাস্তায় আসে। জরিপে প্রায় ১৩ শতাংশ শিশুকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এবং প্রায় ৬ শতাংশকে এতিম অথবা বাবা-মা জীবিত কি না সে বিষয়ে অনিশ্চিত হিসেবে পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন: ক্ষমা চাইলেন ‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক চাই না’ বলা এমপি রতন
নিরাপদ ঘুমের জায়গাও নেই
পথশিশুদের একটি বড় অংশের স্থায়ী বা নিরাপদ আশ্রয় নেই। ‘পথশিশু জরিপ ২০২২’ অনুযায়ী, ৩০ শতাংশের বেশি শিশু জনসাধারণের খোলা জায়গায় বসবাস ও ঘুমায়। তাদের অনেকে ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, পার্ক ও অন্যান্য জনবহুল এলাকায় রাত কাটায়।
জরিপে দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক শিশু মাটির ওপর চট, কার্টন, পলিথিন বা পাতলা কম্বল বিছিয়ে ঘুমায়। রাতে ঘুমানোর সময়ও তারা সহিংসতার শিকার হয়।
কাজের জায়গায় নির্যাতনের ঝুঁকি
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
পথে বসবাস ও কাজ করা শিশুদের জন্য নির্যাতনের ঝুঁকিও বড়। ‘পথশিশু জরিপ ২০২২’ অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে প্রায় ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে। পথচারীদের কাছ থেকেও হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনা পাওয়া গেছে।
এছাড়া জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা ও পানিবাহিত রোগসহ বিভিন্ন অসুস্থতার তথ্য পাওয়া গেছে। অনেক শিশুই অসুস্থ হলে সহজলভ্য স্থানীয় চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে।
মেয়েশিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি
মেয়েশিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি। ‘পথশিশু জরিপ ২০২২’ অনুযায়ী, পথের ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী মেয়েশিশুদের ৬৪ শতাংশ মাসিকের সময় অস্বাস্থ্যকর কাপড় ব্যবহার করে। ৭৩ শতাংশ একই পুরোনো কাপড় বারবার ব্যবহারের কথা জানিয়েছে।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
করোনায় আরও কঠিন হয়েছিল জীবন
করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় পথশিশুদের সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে। আগের একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে ৭২ শতাংশ পথশিশু খাদ্যসংকটে পড়েছিল, ৬৫ শতাংশ কাজ হারিয়েছিল এবং ৫৩ শতাংশ থাকার জায়গা হারিয়েছিল।
পথে থাকা শিশুর সংখ্যা নিয়ে নেই হালনাগাদ হিসাব।
পথশিশুদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন হিসাব পাওয়া গেলেও এগুলোর মধ্যে সময় ও পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে। ‘পথশিশু জরিপ ২০২২’ মোট পথশিশুর সংখ্যা নির্ধারণ করেনি। অন্যদিকে, ইউনিসেফের ‘চিলড্রেন লিভিং ইন স্ট্রিট সিচুয়েশনস ইন বাংলাদেশ ২০২৪’ প্রতিবেদনে ৩৪ লাখের বেশি শিশুর কথা বলা হয়েছে, যারা মা-বাবার সরাসরি যত্ন ছাড়া পথের পরিস্থিতিতে রয়েছে। তাই বিভিন্ন উৎসের সংখ্যাকে একই ধরনের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
জাতীয় পথশিশু দিবসে জরিপগুলোর তথ্য বলছে, পথশিশুদের জন্য শুধু সাময়িক আশ্রয় বা পুনর্বাসন নয়, তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিবারভিত্তিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট ও শিশুশ্রমের মতো যে কারণগুলো শিশুদের পথে ঠেলে দেয়, সেগুলো মোকাবিলা না করলে নতুন করে পথশিশু তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পথশিশুদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা জরুরি। দারিদ্র্য ও খাবারের অভাবের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক নানা সংকট শিশুদের পথে আসার অন্যতম কারণ। তাই এসব কারণ দূর করার উদ্যোগ না নিলে নতুন করে পথশিশু তৈরির প্রবণতা বন্ধ করা কঠিন হবে।
জাতীয় পথশিশু দিবস তাই শুধু পথে থাকা শিশুদের কথা মনে করার দিন নয়; বরং তাদের শিক্ষা, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, খাবার, বাসস্থান ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার নতুন করে স্মরণ ও তা বাস্তবায়ন করার দিন।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন