০৭:৩১ এম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নয়, বরং এর সবুজ-শ্যামল পরিবেশের জন্যও এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তীর্ণ সবুজের মধ্যে পুরোনো গাছগুলো যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ছায়া দেওয়া এমন একটি গাছ এবার ভেঙে পড়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বেলা ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বিজ্ঞান ভবনের সামনে অবস্থিত সেই ছায়াদানকারী কৃষ্ণচূড়া গাছটি ভেঙে পড়ে।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
কৃষ্ণচূড়া গাছটি ছিল কেবল একটি গাছ নয়; এটি ছিল ক্যাম্পাসের একটি স্মৃতি। রোদে ঘেমে ও বৃষ্টিতে ভিজে ক্লান্ত শিক্ষার্থীরা তার ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিতেন। কেউ বই পড়তেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতেন। পরীক্ষার চাপের মাঝে কিংবা ক্লাস শেষে অনেকের জন্য এই গাছের ছায়া ছিল স্বস্তির একটি স্থান।
কৃষ্ণচূড়ার মৌসুমে দৃশ্যটি আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে উঠত। সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটে থাকা লাল ফুল গাছটিকে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। অসংখ্য শিক্ষার্থী সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছেন। কেউ হয়তো প্রিয়জনের সঙ্গে ছবি তুলেছেন, আবার কেউ একা দাঁড়িয়ে গাছটির সৌন্দর্য স্মৃতিতে ধরে রেখেছেন।
সময়ের সঙ্গে গাছটির বয়স বাড়ছিল। কাণ্ডে বার্ধক্যের ছাপ দেখা যাচ্ছিল, ডালপালা দুর্বল হয়ে পড়ছিল। তবুও, ক্যাম্পাসের ব্যস্ততার মধ্যে গাছটি দাঁড়িয়ে ছিল। নতুন প্রজন্ম এসেছে, পুরোনো প্রজন্ম বিদায় নিয়েছে, কিন্তু কৃষ্ণচূড়াটি একই স্থানে ছিল। তাই এটি অনেকের কাছে একটি গাছ ভেঙে পড়ার ঘটনা নয়; বরং এটি ক্যাম্পাসের একটি স্মৃতির অধ্যায়ের সমাপ্তি।
গাছটি ভেঙে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই শিক্ষার্থীদের অনেকেই সেখানে ছুটে যান। কেউ বিস্ময়ে গাছটির বিশাল কাণ্ড দেখেন, কেউ মোবাইল ফোনে শেষ দৃশ্য ধারণ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকেই গাছটির সঙ্গে জড়িত পুরোনো স্মৃতি শেয়ার করেছেন।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
জুবায়ের রহমান নামের একজন শিক্ষার্থী গাছটির স্মৃতিচারণ করে বলেন, "আমরা যারা প্রথম বিজ্ঞান ভবনের শিক্ষার্থী, তাদের কষ্টটা একটু বেশি। এইতো, কয়েকদিন আগেই আমরা এখানে প্রোগ্রাম করলাম। ডিপার্টমেন্টে যত ধরনের অনুষ্ঠান হোক, এখানে এসে ছবি তুলি। প্রতিদিন বিল্ডিংয়ে ঢুকার আগে পরে চোখে পড়ে। এত এত স্মৃতি কীভাবে ভুলি?"
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, "ক্যাম্পাসের একটা জীবন্ত প্রাণ ও ইতিহাসের একটা অংশ চিরতরে হারিয়ে গেল। থমকে যাওয়া এই ডালে ডালে আজও লেগে আছে অজস্র শিক্ষার্থীর স্মৃতির মায়া।"
মুবতাসির ফুয়াদ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, "ক্যাম্পাসের সবচেয়ে প্রিয় শতবর্ষী কৃষ্ণচূড়া গাছটা ভেঙে পড়েছে। প্রেমিকা মারা গেলে হয়তো এত বেশি দুঃখ হতো না। এই কৃষ্ণচূড়া গাছটা ঘিরে বর্ষা উৎসব করতে চেয়েছিলাম। এই রাস্তাটা দিয়ে আর হাঁটবো কীভাবে? কীভাবে তাকাবো এই অনুপস্থিতির দিকে?"
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবরিনা নাজ বলেন, "কৃষ্ণচূড়া গাছটি অত্যন্ত সুন্দর একটি গাছ ছিল। এই গাছটির নিচে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এত ছবি তুলেছে যে এটি এতটাই জনপ্রিয় ছিল। গাছটার গঠনও খুব সুন্দর ছিল। গাছটাকে দেখে কখনও মনে হয়নি যে এটি ভেঙে পড়বে। ক্যাম্পাসের অন্যান্য বয়স্ক কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোর চেয়ে এ গাছটির গঠনও আলাদা ছিল। আসলে এটি আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা এমন একটি সুন্দর গাছ হারালাম।"
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
একটি গাছ পড়ে গেছে। কিন্তু তার সঙ্গে পড়ে যায়নি তার স্মৃতিগুলো। লাল কৃষ্ণচূড়ার ফুলে, পুরোনো ছবিতে আর অসংখ্য শিক্ষার্থীর গল্পে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ছায়া দেওয়া সেই গাছটি হয়তো বেঁচে থাকবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতির পাতায়।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন