০৮:০৬ পি.এম
বাংলাদেশ বন বিভাগ এবার বন্য প্রাণীদের নিরাপত্তা ও পাচার রোধে মাইক্রোচিপ বসানোর পরিকল্পনা করছে। এর আগে, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত নজরদারি এবং অরক্ষিত সীমানাদেয়ালের সুযোগ নিয়ে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে একাধিকবার বন্য প্রাণী পাচারের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি, পাচার হয়ে যাওয়া বন্য প্রাণী শনাক্তের জন্য ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের উদ্যোগও নিতে চায় পার্ক কর্তৃপক্ষ।
বন্য প্রাণীর ডিএনএ সনাক্তকরণ সম্ভব হলে নির্দিষ্ট প্রাণীর জেনেটিক ছাপ সংগ্রহ করে রাখা হবে, যা পরবর্তীতে সেই প্রাণী বা তার রক্তের সম্পর্কযুক্ত অন্য প্রাণীকে বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত করতে সহায়তা করবে, যা মানুষের ফরেনসিক ডিএনএ টেস্টের মতো।
মাইক্রোচিপ হলো একটি ছোট ইলেকট্রনিক চিপ, যার মধ্যে একটি মৌলিক নম্বর থাকে। শনাক্তকরণ যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা করলে ওই নম্বরের মাধ্যমে প্রাণীটিকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন: ‘আল্লাহর বাড়ি মানুষ যায় পবিত্র নিয়তে, ওখানে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঠিক না’ হুমায়ুন কবিরের মন্তব্য
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, বন্য প্রাণী হারিয়ে গেলে বা পাচারের পর উদ্ধার হলে সেগুলো সাফারি পার্কের কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। মাইক্রোচিপ বসানোর ফলে এ সংশয় দূর হবে এবং পাচার ঠেকাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
দেশে বর্তমানে দুটি সাফারি পার্ক রয়েছে। একটি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক এবং অন্যটি গাজীপুর সাফারি পার্ক। গাজীপুর সাফারি পার্ক দেশের বৃহত্তম সাফারি পার্ক, যা ২০১০ সালে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলায় বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৩ হাজার ৬৯০ একর এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৩ সালে ৭৩ প্রজাতির ১ হাজার ৫০০ বন্য প্রাণী নিয়ে এ পার্কের কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে এখানে ৮৪ জন জনবল কর্মরত রয়েছে।
বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের এক কর্মকর্তা জানান, ‘আমরা সংবেদনশীল ও দুর্লভ বন্য প্রাণীর ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং মাইক্রোচিপ বসানোর উদ্যোগ নিয়েছি। এ কাজটি বন বিভাগের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট করবে। তাদের ফরেনসিক ল্যাব থেকে এটি সম্পন্ন হবে।’
বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের প্রধান বন সংরক্ষক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘দেশের দুটি সাফারি পার্কের বন্য প্রাণীর দেহে মাইক্রোচিপ বসানো এবং ডিএনএ প্রোফাইলিং করার জন্য আমরা একটি প্রস্তাব পেয়েছি।’
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
তিনি আরও বলেন, কোন কোন বন্য প্রাণীর মাইক্রোচিপ ও ডিএনএ প্রোফাইলিং প্রয়োজন, তা সুনির্দিষ্ট করে কাজ শুরু করা হবে। কিছু মাইক্রোচিপ বন বিভাগের কাছে রয়েছে, বাকিগুলো সংগ্রহ করে কাজ শুরু হবে। ফরেনসিক ল্যাবে কিছু রিএজেন্টের ঘাটতি রয়েছে, যা এক মাসের মধ্যে চলে আসবে।
মাইক্রোচিপ বসালে কী উপকার হবে
২০২৪ সালের ২২ নভেম্বর গাজীপুর সাফারি পার্কের সাফারি কিংডম এলাকা থেকে গ্রিন উইং ম্যাকাও নামের দুটি পাখি চুরি হয়। এ ঘটনায় একটি পাখি উদ্ধার ও একজনকে আটক করা হলেও চুরির রহস্য উদ্ঘাটন করা যায়নি। এরপর ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি একটি নীলগাই হারিয়ে যায় পার্ক থেকে, যা আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালের মার্চে ঘটে সাফারি পার্কের সবচেয়ে দুর্লভ প্রাণী মাদাগাস্কারের লেমুর চুরির ঘটনা। পার্ক থেকে তিনটি রিং-টেইলড লেমুর পাচার হয়ে যায়। এ ঘটনায় করা মামলার তদন্ত শেষে সিআইডি জানায়, এগুলো সীমান্ত পার হয়ে ভারতে পাচার হয়ে গেছে।
বারবার চুরির ঘটনা রোধে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী বন সংরক্ষক তারেক রহমান বন্য প্রাণীর নিরাপত্তার স্বার্থে মাইক্রোচিপ বসানোর জন্য বন অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ে চিঠি দেন। এরপর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শারমীন আক্তারও চিঠিতে একমত পোষণ করেন।
আরও পড়ুন: ক্ষমা চাইলেন ‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক চাই না’ বলা এমপি রতন
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, পার্কের বন্য প্রাণী পাচার বা চুরি হলে মাইক্রোচিপ থাকলে সেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এরপর এক বছর পর মাইক্রোচিপের সঙ্গে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বন অধিদপ্তর।
সহকারী বন সংরক্ষক তারেক রহমান জানান, গাজীপুর সাফারি পার্কের আয়তন সাড়ে তিন হাজার একরের বেশি। বিশাল এ পার্কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বন্য প্রাণীদের নিরাপত্তার স্বার্থে মাইক্রোচিপ ও ডিএনএ প্রোফাইলিং করা অত্যাবশ্যক। এছাড়া, বন্য প্রাণীদের স্বাস্থ্য সম্পর্কেও উপাত্ত পাওয়া যাবে বলে তিনি জানান।
বিশিষ্ট বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান, যিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই সাফারি পার্কে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন, বলেন, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। বিশ্বব্যাপী সাফারি পার্কগুলোতে এ ধরনের চর্চা রয়েছে। তবে সাফারি পার্কে আরও নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা বিদ্যমান।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, খাঁচাগুলো অস্বাস্থ্যকর। বন্য প্রাণীগুলো এ ধরনের আবদ্ধ অবস্থায় অস্বস্তি বোধ করে। বিষয়গুলো বোঝার মতো সাফারি পার্কে জ্ঞানসম্পন্ন লোকবল নেই। ৫০ দশকের পুরোনো পদ্ধতিতে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা চলছে। সেখানে পরিবর্তন আনতে হবে।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন