০৪:৫৭ পি.এম
দ্বীপজেলা ভোলায় গ্যাসের অভাবনীয় প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও, সময়োপযোগী পরিকল্পনার অভাবে শেষ তিন দশকে কাঙ্ক্ষিত শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। এর ফলে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস অলস অবস্থায় পড়ে রয়েছে। নতুন করে সন্ধান পাওয়া গেছে দুটি গ্যাসক্ষেত্রেরও।
চাহিদার তুলনায় বেশি উৎপাদন ক্ষমতার সাথে শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা করছে বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি। এ কারণে ভোলাবাসীরা উন্নয়ন বিচ্ছিন্ন থাকছেন এবং বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা থমকে গেছে। তবে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত শিল্পপার্ক স্থাপনের মাধ্যমে ভোলাবাসী নতুন করে গ্যাসভিত্তিক উন্নয়নের আশা দেখছেন। বিগত দিনের মতো আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে এই ঘোষণার দ্রুত বাস্তবায়ন চান তারা।
১৯৯৫ সালে ভোলার বোরহানউদ্দিনে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে বাপেক্স। সেখানে মজুত আছে প্রায় দুই টিসিএফ গ্যাস। দীর্ঘ ১৪ বছর পর ২০০৯ সালে সেই গ্যাসের বাণিজ্যিক উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে, এই ক্ষেত্র থেকে দৈনিক উত্তোলন ক্ষমতা ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
মাধ্যমে ১৪ জুলাই সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির মাধ্যমে বোরহানউদ্দিনে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সাতটি শিল্পকারখানায় (শেলটেক সিরামিক লিমিটেড, কাজী ফিড, প্রিয় অটো, অ্যাডভান্স অটোব্রিকস, সাগর বেকারি, আল মদিনা ও জিকে ট্রেডার্স) গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। একই সাথে ২ হাজার ৩৪৪টি আবাসিক সংযোগে ৭০ থেকে ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। আবার, অন্যদিকে ইন্ট্রাকো সিএনজি আকারে ঢাকায় নিচ্ছে দৈনিক এক মিলিয়ন ঘনফুট। এর পরেও, প্রতিদিন উদ্বৃত্ত থাকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
এছাড়া, ২০১৮ সালে আবিষ্কৃত ভোলা নর্থ ও ২০২৩ সালে ইলিশা-১ গ্যাসক্ষেত্র থেকে এখনো গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়নি। গ্যাস সংযোগের জন্য বর্তমানে দুটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের আবেদন প্রক্রিয়াধীন। আবুল উলাইয়া টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড ও প্রাণ-আরএফএলসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাজ চলছে।
গ্যাসের মতো মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার পরও ভোলাবাসী কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে রয়েছেন। বেকারত্ব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। বিগত সরকার যা সারকারখানা, ইপিজেড, এলএনজি স্টেশন ও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়ন হয়নি। পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস অন্যত্র নিয়ে যাওয়া বাদ দিয়ে ভোলাতেই ব্যয়সাশ্রয়ী শিল্পকারখানা গড়ে তোলার দাবিতে স্থানীয়রা দীর্ঘ বছর ধরে আন্দোলন করছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে ভোলায় ‘শিল্পপার্ক’ করার ঘোষণা দিলে হতাশা কেটে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু হয়। স্থানীয়রা কম খরচে নৌপথে পণ্য পরিবহন ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎসহ শিল্পকারখানা স্থাপনের অনুকূল পরিবেশ কাজে লাগানোর দাবি জানিয়েছেন।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ভোলা জেলা সভাপতি মো. সোলাইমান জানান, ‘শিল্পকারখানা করার সকল পরিবেশ ভোলায় রয়েছে। বিগত দিনে বহু উদ্যোক্তা এসেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের বাস্তবায়ন হয়নি। এর পেছনে সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে।’
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
উন্নয়ন কর্মী মো. ইকরামুল আলম বলেন, গত ১৭ বছর ধরে তারা শুধু ইকোনমিক জোন ও কলকারখানা হওয়ার আশ্বাস শুনেছেন। ঢাকা থেকে কর্মকর্তারা সরেজমিন দেখে গেলেও বাস্তবে কিছুই হয়নি। তিনি বলেছন, ‘বিভিন্ন উদ্যোক্তারা যখন ভোলায় এসেছেন, তখন বিশেষ শ্রেণি সিন্ডিকেট করে জমির দাম বাড়িয়েছে, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ফলে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নে যেন এমন কোনো সিন্ডিকেট বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সেটি কঠোর হাতে দমন করতে হবে।’
গণমাধ্যম কর্মী আবদুর রহমান হেলালের ভাষ্য হচ্ছে, গ্যাসের পাশাপাশি ভোলায় বিদ্যুৎ ও নদীপথের সহজ যোগাযোগ রয়েছে। বর্তমান সরকার ও বিরোধীদল দুই পক্ষ এখানে শিল্পপার্ক স্থাপনের ব্যাপারে একমত হয়েছে, তাই এর দ্রুত বাস্তবায়ন চান তিনি।
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. রাইসুল আলম জানান, ‘ভোলার উন্নয়নের পাঁচটি দাবির অন্যতম হলো গ্যাসভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপন। যার মাধ্যমে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান দুটোই হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি শিল্পপার্ক স্থাপনের কাজ শুরুর দাবি করেন। এর ফলে গ্যাসের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নের জন্য অবদান রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন এই বিএনপি নেতা।
ভোলার গ্যাস খুলনা বা বরিশালে নিয়ে শিল্পায়ন করাকে বিপুল অর্থের অপচয় মনে করেন ভোলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর। তিনি বলেন, ‘গ্যাস কেবল বরিশাল পর্যন্ত নিয়ে যেতে ১১শ কোটি টাকা খরচ হবে। এই বিপুল টাকা খরচ না করে ভোলাকেই শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এতে ভোলার মানুষের পাশাপাশি সারা দেশের মানুষ উপকৃত হবে। নৌপথের সুবিধা কাজে লাগিয়ে সারকারখানা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, ইপিজেড ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গ্যাসভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠার ব্যাপক অবকাশ রয়েছে এখানে।’
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য সচিব ও প্রবীণ ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম খান বলেন, ‘সম্পদের তুলনায় ভোলা উন্নয়নের সূচকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ভোলার গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করেন। এরপর উত্তোলন শুরু হলেও প্রয়োজনীয় উন্নয়ন হয়নি। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিল্পপার্কের ঘোষণা দিয়েছেন, সেটি আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি।’
এদিকে শিল্পকারখানা স্থাপনে সরকারের নির্দেশনা পালনে সব ধরনের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ডা. শামিম রহমান। তিনি বলেন, ‘গ্যাসভিত্তিক উন্নয়ন ভোলাবাসীর প্রাণের দাবি। স্থানীয় প্রশাসন জমি বরাদ্দসহ যা যা প্রয়োজন সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। এখানে ছোট ইন্ডাস্ট্রির পাশাপাশি ভারী ইন্ডাস্ট্রি করার সুযোগ রয়েছে।’ দেশের উন্নয়নে ভোলার গ্যাসের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
ভোলার এই গ্যাসের উত্তোলন সীমাবদ্ধ না রেখে সরকার দ্রত শিল্পপার্ক গড়ে তুলবে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে; এমনটাই প্রত্যাশা জেলার ২০ লাখ মানুষের।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসআরবি পরিচয়ে ব্যবসায়ীকে অপহরণ, পুলিশ উদ্ধার অভিযান
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন