সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
০৩:২৬ পি.এম
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন তিনি, এর আগে তার পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে এই অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটসের সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি এবং তাদের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন বিমানবন্দরে ও জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে সুশৃঙ্খল স্বাগত জানাতে ইতোমধ্যে ৩৪টি প্রস্তুতিমূলক সভা সম্পন্ন করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের নব গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক শান্তি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে। বিশেষ করে ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ আয়োজিত একটি বিশেষ বৈঠকে যোগ দিয়ে তিনি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য বৈশ্বিক সমর্থনের আহ্বান জানাবেন।
এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ক্ষতিপূরণ ও অর্থায়নের দাবিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠকে উদ্বোধনী ভাষণ দেবেন তারেক রহমান। সফরের সময় ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেনের সঙ্গে বৈশ্বিক অসমতা দূর করার জন্য বৈঠক এবং মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্য বিষয়ক নিজস্ব সাইড ইভেন্টেও অংশগ্রহণ করবেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘের এই সফরকালে বিশ্বনেতাদের পাশাপাশি প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। তিনি কুয়েতের যুবরাজ, ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। একই সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট এবং শরণার্থী ও মানবাধিকার কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে।
কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি মেটা ও ওয়াল স্ট্রিটের আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, প্রযুক্তি খাত এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলো এসব আলোচনায় উপস্থাপন করা হবে। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সফর শেষ করে দেশে ফিরবেন তিনি।
এবারের অধিবেশনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় সফরটি বাংলাদেশের জন্য বাড়তি মর্যাদা বহন করছে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যার ঘটনায় কুমিল্লা স্তব্ধ হয়ে গেছে। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের দাবি, অপ্রতিমকে হত্যার কারণ ছিল তার সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। এই ঘটনায় চারজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। আটককৃতদের কাছ থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে।
যেভাবে নিখোঁজ অপ্রতিম
শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতিম। এরপর সে আর বাসায় ফেরেনি। রাত পর্যন্ত ছেলের সন্ধান না পেয়ে তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন। একই সঙ্গে ছেলে নিখোঁজের খবর জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দেন অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম।
পরে ‘মুন অ্যালার্ট’-এর মাধ্যমে অপ্রতিমের ছবি ও নিখোঁজের তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা ব্যাপকভাবে অপ্রতিমের সন্ধান চেয়ে পোস্ট দিতে থাকেন।
শেষবার ফোনের অবস্থান
অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত ফোনটির অবস্থান কুমিল্লার গন্ধমতী এলাকায় শনাক্ত করা যায়। এরপর ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে পুলিশ। ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে সাইফুল ইসলাম তুহিন নামে এক তরুণকে দেখা যায়।
জঙ্গল থেকে উদ্ধার মরদেহ
শনিবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গলে বাঁশ কাটতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আবদুল কাদের জিলানী ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন একটি শিশুকে পড়ে থাকতে দেখেন।
পরে কাছে গিয়ে তারা শিশুটির মাথার দিকে রক্ত দেখতে পান। ভয়ে তারা ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। পরে স্থানীয় মামুন নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সন্তান নিখোঁজ থাকার খবর জানতে পারেন জিলানী। এরপর তিনি মামুনকে সঙ্গে নিয়ে আবার ঘটনাস্থলে যান এবং পড়ে থাকা শিশুটিই অপ্রতিম বলে শনাক্ত করেন। বেলা একটার দিকে ঘটনাস্থল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
সিসিটিভি ফুটেজে তুহিন, এরপর একে একে আটক
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে প্রথমে সাইফুল ইসলাম তুহিনকে আটক করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার রাতে তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের আইফোন উদ্ধার করা হয়।
পরে তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুই কিশোর এবং মো. সিয়াম নামে এক কলেজছাত্রকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
আটক ব্যক্তিরা হলেন, সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), কামরুল হাসান (১৫), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৬) ও মো. সিয়াম (১৯)।
পুলিশ জানিয়েছে, তুহিন ও অপর দুই কিশোরের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। সিয়ামের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে।
পুলিশের ভাষ্যে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা
রোববার দুপুরে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের দাবি, শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে শালবন এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন স্থানে তিনজন অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। অপ্রতিম বাধা দিলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়।
একপর্যায়ে তুহিন প্রথমে এবং পরে সঙ্গে থাকা দুই কিশোর বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে। পরে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। তুহিন অপ্রতিমের আইফোনটি নিয়ে যায় বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশ সুপার বলেন, তদন্তে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে এবং আইফোনটি তুহিনের দেখানো মতে তার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, সে বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পরিবারের প্রশ্ন আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে?
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর তার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় ছেলেকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম বলেন, "আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে? আমাকে জবাব দেন, আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে?"
এ সময় এমপি মনিরুল হক চৌধুরীও আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, "এর কোনো জবাব আমার কাছে নেই মা।"
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, একজন শিশুকে রক্ষা করতে না পারায় তিনি লজ্জিত ও দুঃখিত। এ ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার কথাও জানান তিনি।
জানাজা ও দাফন
রোববার সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সহপাঠী ও স্থানীয় লোকজন অংশ নেন।
পরে কোটবাড়ির গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১১টার দিকে গন্ধমতিতে বাসার পাশের কবরস্থানে অপ্রতিমকে দাফন করা হয়।
দ্বিতীয় জানাজার আগে ছেলে হারানোর বেদনায় অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, অপ্রতিম দুই বছর বয়স থেকে এই এলাকায় বড় হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক ছিল। তাই তাদের কাছেই ছেলেকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।
দাফনের পর তিনি বলেন, এখন তার একটাই দাবি সন্তান হত্যার উপযুক্ত বিচার।
তিনি বলেন, "সামান্য একটা আইফোনের জন্য আমার ছেলেকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে এ কথা আমার মন কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না।"
বিচার দাবিতে শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক অবরোধ
অপ্রতিম হত্যার বিচার ও জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে রোববার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম জানাজা শেষে মিছিল নিয়ে কোটবাড়ি বিশ্বরোডের নন্দনপুর এলাকায় যান তারা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মহাসড়কের উভয়মুখী লেনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
তারা হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানান এবং ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেন। পরে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক থেকে সরে যান। এ সময় মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
এ ছাড়া অপ্রতিম হত্যায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানববন্ধন করেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সংহতি জানান।
দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার আশ্বাস
রোববার সচিবালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, দ্রুততম সময়ে হত্যাকাণ্ডের পারিপার্শ্বিক তথ্য-উপাত্ত উদ্ধারের জন্য পুলিশের প্রশংসা করতে হবে। অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত দেওয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
পুলিশও জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
এখন পরিবারের দাবি, তদন্ত দ্রুত শেষ করে হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থী আইয়ুব আলীকে মারধরের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চারজন রেলকর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।
রেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ রেলওয়ে, রাজশাহী কার্যালয় থেকে জারি করা এক দপ্তরাদেশে এ তথ্য জানানো হয়।
সাময়িক বরখাস্ত হওয়া চারজন রেলকর্মী হলেন—মো. আরিফ হোসেন, মো. রোকন উদ্দীন, মো. শফিকুল ইসলাম এবং মো. শাহানুর হোসেন।
দপ্তর আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে সংঘটিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তারা কমাড্যান্ট-এর নিকট দৈনিক হাজিরা দেবেন।
তবে চার রেলকর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাকসু ভিপি। তিনি বলেন, "এর আগেও আন্দোলনের পর রেল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করেনি। আজও আন্দোলন থামাতে তড়িঘড়ি করে বরখাস্ত করা হয়েছে কি না, পরে আবার তাদের বহাল করা হবে কি না—এ নিয়ে আমাদের শঙ্কা আছে।"
এসময় তিনি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, স্টেশনে সব ট্রেনের যাত্রাবিরতি এবং অন্যান্য দাবির বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত রাকসু ও হল সংসদ নেতৃবৃন্দকে স্টেশনে অবস্থানের আহ্বান জানান।
এর আগে, রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে চাচাকে নিতে গিয়ে রেলওয়ে স্টাফদের মারধরের শিকার হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আইয়ুব আলী। এ ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা প্রথমে রেললাইন অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।
ঘটনা জানার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও রেল কর্তৃপক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় শিক্ষার্থীরা ‘মার্চ টু রাজশাহী রেলস্টেশন’ কর্মসূচি নিয়ে স্টেশনের উদ্দেশে যাত্রা করেন। পরে তারা স্টেশন ঘেরাও করে ভাঙচুর করেন। একপর্যায়ে চার রেলকর্মীকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত জানায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার প্রথম ভাষণে বাংলাদেশের স্বনির্ভর উন্নয়নের সংগ্রামের বিষয়টি উপস্থাপন করেন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
ভাষণে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের উন্নয়নের কঠিন চ্যালেঞ্জসমূহ তুলে ধরেন, যার মধ্যে জনসংখ্যার চাপ, বেকারত্ব, ভূমিহীনতা এবং নিম্ন মাথাপিছু আয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের স্বনির্ভরতা বৃদ্ধির উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, "বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই বাংলাদেশের।" বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব জাপান ও নেদারল্যান্ডসের তুলনায় দ্বিগুণ। দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ বেকার বা ভূমিহীন কৃষক, অনেকেই মৌসুমি কাজের ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ২০ লাখ মানুষের খাদ্য-সংস্থান করতে হয়।
এত কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে জানান তিনি। জিয়াউর রহমান বলেন, "তবুও আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাইনি এবং হবোও না।"
প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন বাংলাদেশের এই রাষ্ট্রপতি। ১৯৮৫ সালের মধ্যে জন্মহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং বিদ্যালয় ও হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যের কথাও জানান। তিনি বলেন, "কোনো নারী, পুরুষ বা শিশু যাতে খাদ্য, আশ্রয় ও পোশাক থেকে বঞ্চিত না হয়" তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেন।
তিনি জানান, "আমাদের অগ্রাধিকার কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন।" দেশের প্রায় ৯ কোটি মানুষকে উন্নয়নকাজে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি জোর দেন।
জিয়াউর রহমান বলেন, "গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আমাদের অঙ্গীকার কোনোমতেই নড়চড় হবে না।" স্বনির্ভরতাকে তিনি দেশের মূলমন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, "আমাদের সফল হতেই হবে, কারণ ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ আমাদের নেই।"
ভাষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টি। আঞ্চলিক শান্তির সঙ্গে জাতীয় উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার সম্পর্ক তুলে ধরে জিয়াউর রহমান এ অঞ্চলে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, "এ অঞ্চলের কাছে কিংবা দূরে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অবনতি নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ।"
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশ সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর একটি শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তাব দিয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে উঠলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক ভিত্তিতে সহযোগিতা বাড়াতে এখনও তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, "আমাদের প্রথম লক্ষ্য হবে একত্রিত হওয়া এবং এ অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক কল্যাণের জন্য সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করা।"
অন্য অঞ্চলের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, "আঞ্চলিক সহযোগিতা উত্তেজনা কমাতে এবং অভিন্ন স্বার্থে পরস্পরের প্রতিপক্ষ দেশগুলোর অবস্থান নমনীয় করতে সহায়তা করেছে।"
তিনি আরও বলেন, "দক্ষিণ এশিয়ায় এখন আমাদেরও শুরু করার সময় এসেছে।"
জিয়াউর রহমান বিশ্বের উন্নত উত্তর ও উন্নয়নশীল দক্ষিণের মধ্যে বর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, "বিশ্বের বড় একটি অংশ দারিদ্র্য ও বঞ্চনার মধ্যে থাকলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।"
তিনি বলেন, "শান্তিকে যেমন খণ্ডিত করা যায় না, তেমনি বিশ্বকে ধনী ও দরিদ্র- এভাবে পৃথক অংশে বিভক্ত করেও রাখা যায় না। এটি করা হলে বিশ্বশান্তি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।"
তিনি ব্রান্ডট কমিশনের সুপারিশের প্রতি সমর্থন জানান। উন্নয়ন সহায়তা বৃদ্ধি, সম্পদ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বাড়ানো, ন্যায্যতর বাণিজ্য এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য আরও শক্তিশালী সহায়তার ভিত্তিতে নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
তিনি উন্নত দেশগুলোকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য সহায়তা দ্বিগুণ করতে এবং শর্তহীনভাবে তা অনুদান হিসেবে দেওয়ার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে স্বল্পমূল্যে তেল সরবরাহ এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জ্বালানি সম্পদ উন্নয়নে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেন।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে সহায়তায় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ভুমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
ভাষণের শেষ পর্যায়ে জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সাহসী ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও প্রযুক্তি বিশ্বে রয়েছে।"
তিনি বলেন, "আমি আন্তরিকভাবে আশা ও প্রার্থনা করি, আমরা যেন সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি।"
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। এ কারণে জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের ভাষণটি নতুন করে তাৎপর্য বহন করছে।
তারেক রহমান তার ভাষণে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গা ইস্যু তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। এরপর তার মা প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন।
তারেক রহমানের আসন্ন ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সঙ্গে জিয়া পরিবারের চার দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় যোগ করবে। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্ব সংস্থাটির সামনে বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে দেশের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবেন। সূত্র: বাসস
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তার প্রথম ভাষণে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রতি বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরার পাশাপাশি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর অধিকার সুরক্ষা এবং আরও ন্যায়সংগত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আহ্বান জানান।
১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে খালেদা জিয়া উল্লেখ করেন, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পরস্পরকে শক্তিশালী করে। তিনি বলেন, দারিদ্র্য মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সাফল্য অনেকাংশে নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পরস্পরকে শক্তিশালী করে।’ উন্নয়নশীল বিশ্বে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে লালন করতে উন্নত দেশগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। খালেদা জিয়া বলেন, পুঁজির স্বল্পতা ও প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা সহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ এককভাবে উন্নয়নের কাজ সম্পন্ন করতে পারে না।
তিনি বলেন, ‘সম্পদের সীমাবদ্ধতায় আমরা যখন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি, তখন একা এই কঠিন কাজ সম্পন্ন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়; আমাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’
বাংলাদেশের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মানবাধিকার, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে যুক্ত করেন খালেদা জিয়া। উদীয়মান শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এসব সুরক্ষায় জাতিসংঘকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সুসংহত করার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ সমাজ ও অর্থনীতি গড়ে তোলাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
বৃহৎ ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও দুর্বল দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
নদীর পানিবণ্টন, সমুদ্র আইন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং শরণার্থী, অর্থনৈতিক অভিবাসী ও বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের মর্যাদা ও অবস্থানের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের এখতিয়ার সর্বজনীনভাবে গ্রহণের আহ্বান জানান।
প্রযুক্তি ও তথ্যের অবাধ প্রবাহের আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান ব্যাপক প্রযুক্তিগত ব্যবধান দূর করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ চাই।’ প্রযুক্তি হস্তান্তর ও তথ্যপ্রবাহের ওপর বিধিনিষেধ একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তার ভাষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল পরিবেশ সুরক্ষা ও উন্নত দেশগুলোর দায়িত্বের বিষয়টি। তিনি বলেন, শিল্পোন্নত দেশগুলো পরিবেশদূষণের জন্য প্রধানত দায়ী। তাই পরিবেশগত ক্ষতি নিরসনের ব্যয় তাদেরই বহন করা উচিত। অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্পদ অনেক কম এবং দূষণে তাদের অবদানও তুলনামূলকভাবে সামান্য।
বাংলাদেশের পাটশিল্পের বিষয়টিও তুলে ধরেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, রাসায়নিক ও কৃত্রিম বিকল্প পণ্যের তুলনায় পাটজাত পণ্য পরিবেশের জন্য অধিক গ্রহণযোগ্য। তিনি সতর্ক করে বলেন, কৃত্রিম তন্তুর প্রসার পাটশিল্প এবং এর ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের জীবিকার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শুধু বৈদেশিক সহায়তা কোনো দেশকে স্বনির্ভর করে তুলতে পারে না।
উন্নত দেশগুলোকে বৈষম্যমূলক বাণিজ্যিক ব্যবস্থা দূর করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি সমতার ভিত্তিতে উত্তর-দক্ষিণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার এবং উরুগুয়ে রাউন্ডের আলোচনা দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরা বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছি।’ উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কার, কৃষি, শিল্প ও শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে।
তিনি ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি, ২০০০ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য, খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রচেষ্টা এবং দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের মৌলিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে নেওয়া ‘ডাল-ভাত’ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন।
স্যানিটেশন ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীদের সম্পৃক্ত করাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়েও কথা বলেন।
আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের বহুপক্ষীয় উদ্যোগের পরিপূরক হিসেবে সার্কের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তৎকালীন সার্ক চেয়ারপারসন হিসেবে তিনি বলেন, সাত সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা জোরদারে তিনি কাজ করছেন। তিনি ১৯৯৩ সালের এপ্রিলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সপ্তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে গৃহীত কর্মসূচির পাশাপাশি বাণিজ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক উদ্যোগগুলোর কথাও উল্লেখ করেন।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত পানিবণ্টন সমস্যা, বিশেষ করে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়েও তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে এবং অভিন্ন নদীগুলোর পানিসম্পদের ওপর বাংলাদেশের ‘অন্তর্নিহিত ও আইনগত অধিকার’ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, শুষ্ক মৌসুমে ভারত একতরফাভাবে ফারাক্কা বাঁধের উজানে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে নেয়। এর ফলে বাংলাদেশে খরা দেখা দেয়। অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, ‘ফারাক্কা বাঁধ আমাদের জন্য জীবন-মরণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে।’
নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে মরুকরণ, লবণাক্ততা, নৌচলাচলের সক্ষমতা হ্রাস এবং কৃষি, শিল্প ও জীবিকার ক্ষতির যোগসূত্র তুলে ধরেন তিনি।
গঙ্গার পানিসম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে একটি জরুরি ও স্থায়ী চুক্তির আহ্বান জানান খালেদা জিয়া।
তিনি সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বাংলাদেশের নীতির কথাও তুলে ধরেন। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যাগুলো শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার নিজ বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাওয়া উপজাতীয় শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত সমঝোতার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। তাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টিতে বাংলাদেশ মিয়ানমার ও জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর)-এর সঙ্গে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক সংঘাতের বিষয়ে খালেদা জিয়া বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় সহিংসতা ও জাতিগত নিপীড়নের নিন্দা জানান। বসনিয়ার জনগণের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় জাতিসংঘ ও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। এ প্রসঙ্গে নামিবিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল, কুয়েত, কম্বোডিয়া, সোমালিয়া ও মোজাম্বিকে বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
জাতিসংঘের আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং বিশ্ব সংস্থাটির শান্তিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে ধনী সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সহযোগিতার আহ্বান জানান খালেদা জিয়া।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও) ও ইসরাইলের মধ্যে তৎকালীন সাম্প্রতিক চুক্তিকে স্বাগত জানান তিনি। একইসঙ্গে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।
সমঅধিকার ও সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণের সংগ্রামের প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
ভাষণের শেষ পর্যায়ে খালেদা জিয়া ১৯৮০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে তার স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দেওয়া ভাষণের কথা স্মরণ করেন।
মানবজাতির উন্নত জীবনের জন্য ‘সাহসী ও সৃজনশীল পদক্ষেপ’ এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানিয়ে জিয়াউর রহমান যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা উদ্ধৃত করে খালেদা জিয়া বলেন, তার সেই কথাগুলো এখন তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার অগ্রযাত্রায় আমরা একটি সংকটপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছি।’
আইনের শাসন জোরদার, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত নিরসন এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি এমন একটি বিশ্বসমাজের স্বপ্ন তুলে ধরেন, যেখানে ‘গণতন্ত্র, শান্তি, উন্নয়ন ও মানবকল্যাণ’ সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত হবে। তিনি বলেন, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পেছনে এ লক্ষ্যই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে তার প্রথম ভাষণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। এ প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়ার ভাষণটি নতুন তাৎপর্য লাভ করেছে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন ও জবাবদিহি, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসবে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। এরপর খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর প্রথমবারের মতো সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। জাতিসংঘের নথিপত্রে ৪৮তম অধিবেশনের ১৩তম পূর্ণাঙ্গ সভায় তার ভাষণ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সঙ্গে এ পরিবারের চার দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হবে। এ ভাষণে তিনি বিশ্ব সংস্থার সামনে বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে দেশের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবেন। সূত্র: বাসস
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ