০৩:০৭ পি.এম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন পুনরায় গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি জোরালো করে তুলছেন, ঠিক সেই সময়েই ট্রাম্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মার্কিন তেল কোম্পানি গ্রিনল্যান্ডে তেল অনুসন্ধানের জন্য কূপ খননের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই এই কাজ শুরু করেছে।
সম্প্রতি, গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে দুর্গম এলাকায় তেল অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নামানো হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রিনল্যান্ড সরকার ‘কড়া সতর্কবার্তা’ দিয়ে জানিয়েছে, তাদের কাছে সরঞ্জাম নামানোর কোনো অনুমোদন দেয়া হয়নি।
গ্রিনল্যান্ড সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের সব ধরনের লজিস্টিক কার্যক্রম পরিচালনার আগে সংশ্লিষ্ট খনিজ সম্পদ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে এবং তাদের অনুমোদন নিতে হবে।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
এই ঘটনার দুই দিন পরে, ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে গ্রিনল্যান্ডের একটি গ্রামের ওপর নিজের ছবি বসিয়ে একটি হুমকিসূচক পোস্ট দেন।
গ্রিনল্যান্ডে তেল অনুসন্ধান প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান **গ্রিনল্যান্ড এনার্জি** তাদের কার্যক্রম নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য ডানপন্থি সাবেক টকশো উপস্থাপক ফিল ম্যাকগ্রাকে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি ‘ড. ফিল’ নামেই বেশি পরিচিত এবং ট্রাম্পের ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তথ্যচিত্রের মাধ্যমে ‘আধুনিক সময়ের এই ওয়াইল্ডক্যাটারদের মিশন’ তুলে ধরা হবে। ওয়াইল্ডক্যাটার বলতে সাধারণত বড় কোম্পানির বাইরে স্বাধীনভাবে তেল অনুসন্ধানে নামা ব্যক্তিদের বোঝানো হয়।
গ্রিনল্যান্ড এনার্জি আরও একজন মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক সদস্যকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ওই ব্যক্তি বর্তমানে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচি ‘গোল্ডেন ডোম’-এর সঙ্গে কাজ করছেন। গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণকে ট্রাম্প এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
গ্রিনল্যান্ড এনার্জির চেয়ারম্যান ও বড় শেয়ারহোল্ডার ল্যারি সোয়েটসের ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে যোগাযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তিনি দাবি করেছেন, গ্রিনল্যান্ডে তেল অনুসন্ধান প্রকল্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখলের কোনো সম্পর্ক নেই।
জুন মাসে, জেমসন ল্যান্ড এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের এক বৈঠকে কোম্পানির এক প্রতিনিধি ভুলভাবে দাবি করেছিলেন যে, তেল অনুসন্ধানের সরঞ্জাম তীরে নামানোর জন্য তাদের অনুমতি রয়েছে। পরে সোয়েটস বলেন, প্রকল্পটির প্রতি তাদের অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যাতে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
কিন্তু পরের মাসেই ওই বিরল জনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা দেখতে পান, একটি টাগবোট একটি বার্জকে তীরের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এবং সেখানে থেকে প্রায় এক ডজন কনটেইনার নামানো হচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ড সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জেমসন ল্যান্ডের নুনাপ কেক্কা এলাকায় পরিকল্পিত তেল অনুসন্ধান কূপ খননের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তীরে নামানোই ছিল ওই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
ডেনমার্কভিত্তিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ড্যানওয়াচ ওই জাহাজ পরিবহনকারী কোম্পানির প্রধানের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সরঞ্জামগুলো গ্রিনল্যান্ড এনার্জির জন্যই পাঠানো হয়েছিল।
গ্রিনল্যান্ড এনার্জি এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার শেয়ারহোল্ডারদের পাঠানো এক চিঠিতে কোম্পানিটি জানিয়েছে, প্রকল্পের নেতৃত্বস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রক ও তদারকি কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো ইতিবাচক ছিল।
চিঠিতে বলা হয়েছে, কূপ খননের জন্য প্রয়োজনীয় বাকি অনুমোদনগুলো পাওয়ার পথে অগ্রগতি হচ্ছে এবং এ সম্পর্কে কোম্পানি আশাবাদী। প্রাথমিকভাবে একটি কূপ খননের মাধ্যমে প্রকল্প শুরু করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড এনার্জির একজন প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তাদের প্রায় ৩০০ কনটেইনারে থাকা তেল অনুসন্ধান সরঞ্জাম নিয়ে একটি জাহাজ আগামী ১২ সেপ্টেম্বর কানাডা থেকে গ্রিনল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে। অক্টোবরেই কূপ খননের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডবিষয়ক দূত ও কট্টর ডানপন্থি হিসেবে পরিচিত লুইজিয়ানার গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রি এরই মধ্যে জানিয়েছেন, আগামী বছরই গ্রিনল্যান্ডে তেল উত্তোলন শুরু হতে পারে।
ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত কর্তৃপক্ষের হাতে। ফলে তারা এখন একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি রয়েছে।
একদিকে তারা তেল অনুসন্ধানের অনুমতি দিতে পারে, অন্যদিকে পরিকল্পিত কূপগুলো জলাভূমি সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক রামসার কনভেনশনের আওতাধীন একটি সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে পড়ে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
আবার অনুমতি না দিলে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন কোনো অজুহাত তৈরি হতে পারে বলেও স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ বিদ্যমান।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে ৫ বিষয়ে অগ্রাধিকার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর
গ্রিনল্যান্ড সরকার অবশ্য জানিয়েছে, সরঞ্জামগুলো তীরে নামানোর পর সেগুলো আবার সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া ‘অনুপাতসম্মত হবে না’। একই সঙ্গে তেল অনুসন্ধানের অনুমতির আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে তারা জানিয়েছে।
ফলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার আগেই তেল অনুসন্ধানের সরঞ্জাম গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছে যাওয়ার এ ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এটি দেখায় যে, দ্বীপটির প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকারের কর্তৃত্ব কতটা কার্যকর এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো সেখানে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারছে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন