প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
বান্দরবানের বিলুপ্তপ্রায় রেংমিটচ্য ভাষা জানা ছয়জনের একজন মারা গেছেন। বর্তমানে মাত্র পাঁচজন এ ভাষায় কথা বলতে পারেন। ভাষাটির গবেষক আফসানা ফেরদৌস আশা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব বয়সী দুজন অসুস্থ।
মারা যাওয়া রেংমিটচ্য ভাষী হলেন মাওয়াই ম্রো (৬৪)। তিনি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দুর্গম সাংপ্লং পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। তার দুই ভাই হলেন মাংপুং ম্রো (৭৪) ও রেংপুং ম্রো (৭০)। বর্তমানে এই দুই ভাইও অসুস্থ রয়েছেন। তিন জনই আলাদা আলাদা জায়গায় বসবাস করতেন।
আফসানা ফেরদৌস আশা বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনে রেংমিটচ্য ভাষার তথ্যচিত্র (ডকুমেন্টেশন) সংক্রান্ত পিএইচডি গবেষণা করছেন। তিনি জানিয়েছেন, আলীকদম উপজেলার তৈনখালের ক্রাংসি পাড়ার কয়েকজন ম্রো বাসিন্দা সম্প্রতি তাকে ফোন করে মাওয়াই ম্রোর মৃত্যুর খবর জানিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, গত ৫ মে দুপুর ১২ টার দিকে মাওয়াই ম্রো মারা যান। ঐসময় মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল থাকায় তিনি বিষয়টি জানার জন্য বিস্তারিত জানতে পারেননি।
গবেষণার কাজে গত বছর টানা সাত মাস আলীকদমে ছিলেন আফসানা ফেরদৌস আশা। সেই সময় তিনি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছয়জন রেংমিটচ্য ভাষীকে নতুনভাবে খুঁজে বের করে তাদের ভাষার তথ্যচিত্র সংগ্রহ করেন।
মাংওয়াই ম্রো বহুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। তিনি লিভার সমস্যা নিয়ে ভুগছিলেন। গত বছর টাইফয়েডও হয়েছিল। পেইন কিলার ঔষধ খেয়ে থাকতেন তিনি। অবশেষে মারা যাওয়ার খবর পেলাম। খবরটি পাওয়ার পর থেকে আমি ছুটি কাটাই না। আমি দিন-রাত কাজ করি। আরেকজন চলে গেলে মানতে কষ্ট হয়।
তিনি আরও বলেন, গত বছর মাংওয়াই ম্রোকে আমি অনেক কষ্ট করে নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে আলীকদমের তৈনখালের ক্রাংসি পাড়ায় নিয়ে এসেছিলাম। তিন ভাইকে এক জায়গায় জড়ো করেছিলাম। তারা খুব খুশি হয়েছিলেন। অনেক বছর পর আমার জন্য দেখা হয়েছে তাদের। মাংওয়াই ম্রো তখন তিন-চারদিন ছিলেন ক্রাংসি পাড়ায়। পরে নাইক্ষ্যংছড়িতে তার পাড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম।
আফসানা জানান, রেংমিটচ্য ভাষা নিয়ে একটি বই প্রকাশের কাজও চলছে। তিনি বলেন, আমি যতটুকু পারি কাজ করছি। রেংমিটচ্য ভাষা নিয়ে ১৫০০ শব্দের একটি বইয়ের ড্রাফট তৈরি হয়েছে। জীবিত যে কজন আছেন, তাদের সঙ্গে বসে আরেকবার সংশোধন করা বাকি আছে।
এর আগে, বিলুপ্তপ্রায় রেংমিটচ্য ভাষা সংরক্ষণের প্রয়াস হিসেবে ওই ভাষার দৈনন্দিন কথোপকথন নিয়ে 'মিটচ্য তখক' নামে একটি বই প্রকাশ করেছেন ম্রো ভাষার লেখক ও গবেষক ইয়াংঙান ম্রো। রেংমিটচ্য ভাষার নিজস্ব লিপি না থাকায় বইটি ম্রো ও বাংলা ভাষায় প্রকাশ করা হয়। ২৮ পৃষ্ঠার বইটিতে তিন হাজারের বেশি শব্দ সংকলিত হয়েছে।
বইটি প্রকাশের সময় ইয়াংঙান ম্রো বলেছিলেন, সবার একটা আশঙ্কা, এই ভাষার ছয়জন মানুষ মারা গেলে চিরতরের জন্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে রেংমিটচ্য ভাষাটি। এই ভাষায় কথা বলা ও চর্চা করা মানুষ আর কেউ থাকবে না। হয়ত চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আগে স্মৃতিস্মারক হিসেবে এই বইগুলো বেঁচে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময় এই ভাষা নিয়ে কাজ করার সময় তাদের দৈনন্দিন জীবনের কথোপকথনগুলো সংগ্রহ করে রেখেছি। মূলত এই বইয়ে সেগুলোই তুলে ধরা হয়েছে।
বান্দরবানের আলীকদমের দুর্গম এলাকায় ম্রো জনগোষ্ঠীর একটি গোত্রের মাতৃভাষা রেংমিটচ্য। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আরও কিছু মানুষ এ ভাষা বুঝতে পারলেও সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন মাত্র পাঁচজন। তারা হলেন— আলীকদম সদর ইউনিয়নের ক্রাংসি পাড়ার বাসিন্দা মাংপুং ম্রো (৭৪), কুনরাও ম্রো (৬১), আরেক কুনরাও ম্রো (৭৪), নয়াপাড়া ইউনিয়নের মেনসিং পাড়ার বাসিন্দা থোয়াই লক ম্রো (৬০) এবং নাইক্ষ্যংছড়ি ইউনিয়নের ওয়াইবট পাড়ার বাসিন্দা রেংপুং ম্রো (৭০)।
এর মধ্যে কুনরাও ম্রো নামে দুজনই নারী, বাকিরা পুরুষ।
ভাষা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অবশিষ্ট বক্তারাও মারা গেলে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে রেংমিটচ্য ভাষা।
তবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, বিপন্নপ্রায় এ ভাষার তথ্যচিত্র (ডকুমেন্টেশন) সংরক্ষণের মাধ্যমে ভাষাটিকে ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া, কয়েকজন গবেষকের ধারণা, রেংমিটচ্য ভাষীরা মূলত একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী। পরে ম্রো ভাষার সঙ্গে কিছুটা মিল থাকায় তারা ম্রোদের সঙ্গে মিশে তাদের পদবি গ্রহণ করেছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন