প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক প্ল্যানটেইন নামক ঔষধি উদ্ভিদ ব্যবহার করে নিরাপদ ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ব্রয়লার মাংস উৎপাদনের একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। প্রায় দুই দশকের গবেষণার ফলস্বরূপ, তারা ‘বাউ-প্লান্টিভ’ নামে একটি ফাইটোজেনিক ফিড অ্যাডিটিভ তৈরি করেছেন, যা প্ল্যানটেইনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ঔষধি বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগায়। একই সঙ্গে, তারা দেশে প্ল্যানটেইনের বীজ উৎপাদন, চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও খামারে ব্যবহারের জন্য একটি দেশীয় ভ্যালু চেইন গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি করেছেন।
গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ আল-মামুন, যিনি বাকৃবির এনিমেল নিউট্রিশন বিভাগের অধ্যাপক। সহযোগী গবেষক হিসেবে রয়েছেন অধ্যাপক ড. তামান্না হক। গবেষণায় স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও যুক্ত রয়েছেন। বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস (বিএএস)-ইউএসডিএ অর্থায়নে ‘সাসটেইনেবল কমার্শিয়ালাইজেশন অব প্ল্যানটেইন অ্যান্ড সিড ভ্যালু চেইন ডেভেলপমেন্ট ফর সেফ অ্যান্ড ফাংশনাল ব্রয়লার মিট প্রোডাকশন’ প্রকল্পের আওতায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।
ড. মোহাম্মদ আল-মামুন জানান, "আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো প্রাকৃতিকভাবে নিরাপদ ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন পোল্ট্রি মাংস উৎপাদন করা।" তিনি বলেন, প্রচলিত ব্রয়লার উৎপাদনে ব্যবহৃত কৃত্রিম মেডিসিন, ভিটামিন ও গ্রোথ প্রমোটরের বিকল্প হিসেবে তারা প্ল্যানটেইন নিয়ে গবেষণা করছেন। তাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র ‘বাউ-প্লান্টিভ’ বাজারে আনা নয়, বরং প্ল্যানটেইন থেকে বীজ, বীজ থেকে ফিড, ফিড থেকে কার্যকরী মাংস এবং গবেষণা থেকে একটি টেকসই বাংলাদেশভিত্তিক বাণিজ্যিক সিড-টু-মিট ভ্যালু চেইন তৈরি করা।
ড. আল-মামুন আরও বলেন, "বাউ-প্লান্টিভ খাওয়ানো ব্রয়লারের হাড়ের গঠন শক্তিশালী হয় এবং হাড়ে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও আয়রনের পরিমাণ বাড়ে।" তিনি উল্লেখ করেন, মুরগির দৈহিক তৎপরতাও বৃদ্ধি পায় এবং পালক ঘন ও উজ্জ্বল হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব মুরগির মাংসে স্বাস্থ্যকর ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বা আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিডের পরিমাণ প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে, মাংসের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য বৃদ্ধি পায় এবং গরমের ধকল বা হিট স্ট্রেস সহ্য করার সক্ষমতাও উন্নত হয়।
গবেষণার প্রতিটি ট্রায়ালে প্রায় ৪৫০টি করে ব্রয়লার মুরগি নিয়ে ৩৫ দিন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তিনটি পৃথক পর্যায়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ময়মনসিংহ ও মানিকগঞ্জে উন্মুক্ত মাঠের পাশাপাশি এসি ও নন-এসি গ্রিনহাউসেও প্ল্যানটেইন চাষ করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে প্ল্যানটেইন উৎপাদনের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।
প্ল্যানটেইন চাষের ক্ষেত্রে বীজের আমদানিনির্ভরতা ছিল অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। আমদানিকৃত প্যারেন্টাল বীজ দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি একরে মাত্র আড়াই কেজি বীজ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে প্রথম প্রজন্মের (জি-১) বীজ উৎপাদন বেড়ে প্রায় ১৪০ কেজিতে এবং দ্বিতীয় প্রজন্মে (জি-২) প্রতি একরে প্রায় ২০০ কেজিতে পৌঁছেছে। বর্তমানে এক একর প্ল্যানটেইন থেকে উৎপাদিত বীজ দিয়ে প্রায় ৮০ একর জমিতে নতুন করে চাষ করা সম্ভব। ফলে ভবিষ্যতে আমদানিকৃত বীজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশে প্ল্যানটেইনের বীজের একটি শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গবেষকেরা জানান, প্ল্যানটেইনকে প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে দেশীয় কয়েকটি ঔষধি উদ্ভিদের সমন্বয়ে ‘বাউ-প্লান্টিভ’ নামে ফাইটোজেনিক ফিড অ্যাডিটিভ তৈরি করা হয়েছে। ব্রয়লার ও দেশি মুরগির ওপর ধারাবাহিক পরীক্ষায় এর ইতিবাচক প্রভাব পাওয়া গেছে। প্রচলিত কৃত্রিম অ্যাডিটিভের তুলনায় বাউ-প্লান্টিভ ব্যবহারে উৎপাদন ব্যয়ও কিছুটা কমে। প্রচলিত মেডিসিন ব্যবহারে প্রতি মুরগিতে গড়ে সাড়ে ৮ টাকা খরচ হলেও বাউ-প্লান্টিভ ব্যবহারে তা প্রায় ৭ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
ড. আল-মামুন বলেন, "বাংলাদেশে প্ল্যানটেইন নিয়ে গবেষণার কাজ আমিই প্রথম শুরু করি।" তিনি জানান, ২০০৪ সালে জাপানে পিএইচডি করার সময় থেকেই তিনি এই ভেষজ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, "ব্রয়লার মুরগিতে প্ল্যানটেইনের ব্যবহার বাংলাদেশ এমনকি বিশ্বেও প্রথমবারের মতো আমরা করেছি।" জাপানে গবেষণার সময় প্ল্যানটেইনের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও পরে বাংলাদেশে এর চাষ, ব্যবহার ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করা হয়েছে। তাদের তৈরি ‘বাউ-প্লান্টিভ’ এখন গবেষণাগার থেকে খামার পর্যায়ে প্রয়োগের পর্যায়ে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, "এখন মূল চ্যালেঞ্জ বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ।" তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের, বীজ কোম্পানির, ফিড মিলের, পোল্ট্রি শিল্পের, এনজিওর এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, "পাশাপাশি আধুনিক প্রসেসিং, বাস্ট ফ্রিজিং ও কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।" এ উদ্যোগ সফল হলে একদিকে নিরাপদ ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ পোল্ট্রি মাংস উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে প্ল্যানটেইন বীজ ও ফিড অ্যাডিটিভ শিল্পের বিকাশ, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জানা যায়, প্ল্যানটেইন একটি ঔষধি উদ্ভিদ। এতে গ্লাইকোসাইড, ক্যাটালপলসহ বিভিন্ন বায়োঅ্যাক্টিভ যৌগ রয়েছে। উদ্ভিদটির শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে উৎপাদিত প্ল্যানটেইনের বায়োঅ্যাক্টিভ উপাদানের মান জাপানে উৎপাদিত প্ল্যানটেইনের কাছাকাছি। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় অক্টোবর থেকে মে পর্যন্ত প্রায় আট মাস এটি চাষ করা সম্ভব।
প্রসঙ্গত, ‘বাউ-প্লান্টিভ’ প্ল্যানটেইন ও দেশীয় কয়েকটি ঔষধি ভেষজের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পটির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে এবং চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। গবেষণার বিভিন্ন ফলাফল নিয়ে ‘পোল্ট্রি সায়েন্স জার্নাল’ ও ‘ইতালিয়ান জার্নাল অব অ্যানিমেল সায়েন্স’সহ বিভিন্ন সাময়িকীতে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। উদ্ভাবিত প্রযুক্তির পেটেন্টের জন্যও আবেদন করা হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন