প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
একসময় শখের বশে বাড়ির ছাদে কিছু গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন শারমিন আক্তার। এই ছোট্ট উদ্যোগই আজ পরিণত হয়েছে সফল উদ্যোক্তা জীবনের এক দৃষ্টান্তে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী শারমিন বলছেন, তিনি নিজের হাতে গড়ে তোলা ছাদ বাগান থেকে চারা ও টব বিক্রি করে বছরে প্রায় ১২ লাখ টাকা আয় করছেন।
পরিবেশবান্ধব এই উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার–২০২৫’-এ ‘ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সৃজিত ছাদ বাগান’ বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন শারমিন। জাতীয় বৃক্ষমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে, যা রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন।
রাজশাহীর বিনোদপুরে তিনতলা বাড়ির নিচতলা ও ছাদ জুড়ে গড়ে ওঠা তার বাগান এখন স্থানীয়দের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘কৃষিবাড়ি’ নামে। তবে ছাদ বাগানের আসল নাম হচ্ছে ‘ন্যাচার’স টাচ’। শারমিন আক্তারের স্বামী একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মকর্তা। সংসার, সন্তান এবং পারিবারিক দায়িত্ব সামলেও তিনি নিয়মিত সময় দেন বাগানে। অফিসের পর তার স্বামীও বাগানের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেন। দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ নিল তাদের স্বপ্ন।
সরেজমিনে বাগান ঘুরে দেখা গেছে, পুরো ছাদের নিচে যেন সবুজের অসাধারণ একটি জগৎ। দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির গাছ, রঙিন ফুল এবং বাহারি পাতার সমাহারে বাগানটি শহরের মধ্যেই এক টুকরো প্রকৃতির অভিমুখ। লাল, নীল, বেগুনি, হলুদ ও সবুজের রঙিন বৈচিত্র্যে সাজানো প্রতিটি কোণ সবার কাছে ভিন্ন সাড়া প্রদান করে।
২০২২ সালে তিনি নিজ বাড়ির ছাদে ছোট পরিসরে বাগান শুরু করেন। বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৬০০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে তিন স্তরের আধুনিক ছাদ বাগান গড়ে তুলেছেন। এখানে দেশি-বিদেশি প্রায় ১১০ প্রজাতির সাড়ে তিন হাজারের বেশি গাছ রয়েছে। বর্তমানে তিনি অনলাইন ও অফলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা এবং টব বিক্রি করছেন। এই ব্যবসা থেকেই প্রতি মাসে গড়ে প্রায় এক লাখ টাকা এবং বছরে প্রায় ১২ লাখ টাকা আয় করছেন। তার উদ্যোগে বর্তমানে তিনজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। আগামীতে রাজশাহীতে অর্ধশতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনাও জানিয়েছেন তিনি।
বাগানে রয়েছে ইনডোর ও আউটডোর গাছ, ফুল, ফল, সবজি, ঔষধি, বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় নানা প্রজাতির উদ্ভিদ। ইনডোর গাছের মধ্যে রয়েছে অ্যাডেনিয়াম, অ্যাগলোনিমা, এনথুরিয়াম, পিস লিলি, স্নেক প্ল্যান্ট, সাকুলেন্ট, ইউফোরবিয়া, পাথোস, জেডজেড প্ল্যান্ট, ফার্ন, ক্যাকটাস এবং মানি প্ল্যান্ট।
ঔষধি গাছসমূহের মধ্যে রয়েছে লেমন গ্রাস, স্টেভিয়া, কালমেঘ, ইনসুলিন গাছ, নিম, রোজমেরি, অরেগানো, পাথরকুচি ও উলটকম্বল। পাশাপাশি পারিজাত, মিষ্টি তেঁতুল, সাদা জাম, ফিডল লিফ ফিগ, সাইকাসসহ নানা বিরল প্রজাতির গাছও সংরক্ষণ করছেন তিনি।
অন্যদিকে কর্পূর, অশোক, হিজল, পলাশ, মহুয়া ও বটের মতো হুমকির মুখে থাকা দেশীয় গাছ সংরক্ষণেও কাজ করছেন শারমিন। তিনি আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, স্ট্রবেরি, রামবুটান, অ্যাভোকাডো, আপেলসহ বিভিন্ন ফলজ গাছ এবং মরিচ, টমেটো, লাউ, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শসা, বেগুন, করলা, সজনেসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষও করছেন।
তার এই সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন এলাকার বাসিন্দারাও। প্রতিবেশী আব্দুল হাকিম বলেন, শারমিনের ছাদ বাগান শুধু একটি বাগান নয়, এটি আমাদের এলাকার গর্ব। আগে ছাদে এমনভাবে বাণিজ্যিক বাগান করা যায়, সেটা আমরা ভাবতেই পারিনি। তার সাফল্য দেখে অনেকেই নিজেদের বাসার ছাদে গাছ লাগাতে আগ্রহী হচ্ছেন। ভবিষ্যতে আয়ের পথ খোজার ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি।
শারমিন আক্তার বলেন, ছাদ বাগান শুধু শখের বিষয় নয়, এটি পরিবেশ রক্ষা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের একটি সম্ভাবনাময় খাত। আমি চাই আরও বেশি মানুষ ছাদ বাগানে আগ্রহী হয়ে উঠুক এবং এটিকে আয়ের একটি মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলুক।
তিনি আরও বলেন, আমি বিজনেস স্টাডিজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছি। কিন্তু ছোট থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল কৃষি নিয়ে কাজ করা। পরিবার থেকে মানা করা সত্ত্বেও আমি কৃষির কাজ ছাড়িনি। এ যাত্রায় আমার স্বামী সবসময় পাশে ছিলেন এবং বাগানের একটি অংশে সময় দিয়ে কাজ করেন। ভবিষ্যতে আমি কৃষিতে বিপ্লব ঘটাতে চাই এবং রাজশাহীতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে আমি বদ্ধপরিকর।
শারমিন আক্তার আরো জানালেন, প্রথমে অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছিল। বাগান শুরু করার সময়ে অনেকেই ছোট করে দেখতেন এবং কটু কথা বলতেন। এখন বাগান বড় হওয়ায় এবং জাতীয় পুরস্কার পাওয়ায় সবাই প্রশংসা করছেন। তারা এখন জানতে চান কীভাবে বাগান করে আয় করা যায়। এর ফলে কখনো পেছনে তাকানোর সময় নেই।
জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি সম্পর্কে জানালে তিনি বলেন, এই ইচ্ছাটা অনেকদিনের স্বপ্ন ছিল। সেটি পূরণ হওয়ায় আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। প্রধানমন্ত্রী থেকে পুরস্কার না পেলে জানতেন না, তিনি প্রকৃতিপ্রেমী এবং কৃষিবান্ধব মানুষ। তিনি আমাকে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন এবং ছাদ বাগানে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে বলেছেন। স্বামীর সহযোগিতা পেয়ে আমি ছোটবেলার শখকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় পুরস্কার পেয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত।
নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার বিষয়ে শারমিন বলেন, সবারই উচিত স্বাবলম্বী হওয়া। বাসার কাজ শেষে টেলিভিশন বা ফেসবুকিংয়ের পরিবর্তে কোনো একটি কাজে সময় দেওয়া উচিত। সেই কাজটি একসময় আপনার আয়ের উৎস হয়ে উঠবে। প্রথমে ধাক্কা খেতে পারেন কিন্তু এতে বিচলিত না হয়ে সামনে এগিয়ে গেলে ভবিষ্যতে ভালো কিছু হবে, ইনশাল্লাহ।
শারমিন আক্তারের স্বামী মোহা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ছোটবেলা থেকে গাছের প্রতি স্ত্রীর দুর্বলতা রয়েছে। রাজশাহীর বানেশ্বরে চাকরি করা অবস্থায় আমি আমাদের ছাদ বাগানে বেশিরভাগ সময় স্ত্রীর পরিচর্যা ও দেখাশোনার কাজে সহযোগিতা করি। বাগানটি এখন বাণিজ্যিক রূপ নেওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা অর্ডার করছেন। চারাগুলো কুরিয়ারের মাধ্যমে তাদের কাছে পৌঁছে দিতে সহায়তা করি। জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পেছনে আমার স্ত্রীর প্রচুর পরিশ্রম রয়েছে। তার সাফল্যে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান মৌরী বলেন, রাজশাহীতে এখন ছাদ বাগান নিয়ে অনেকেই কাজ করছেন। কৃষি বিভাগ থেকে আমরা বিভিন্ন কারিগরি সহায়তা এবং নানা ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকি। রাজশাহীতে তাপমাত্রা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেকটাই বেশি। সেই দিক থেকে ছাদ বাগান তাপমাত্রা কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
শারমিন আক্তারকে অভিনন্দন জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, সারা দেশে সৃজিত ছাদ বাগান ক্যাটাগরিতে রাজশাহী থেকে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন শারমিন। এটি আমাদের জন্য অবশ্যই গর্বের এবং আনন্দের। আমরা আশা করি এই ধারা বজায় রাখতে হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন