প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
পোকা ও ছত্রাকের আক্রমণে পচে নষ্ট হয়ে যাওয়া, ফাটা ও গলে যাওয়া খাবার অনুপযোগী আম থেকে পাল্প তৈরির অভিযোগ উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এসব আমের পাল্প কিনে নিচ্ছে দেশের নামি-দামি জুস কোম্পানিগুলো। নামমাত্র মূল্যে ১০০ টাকা মণ দরে এসব নিম্নমানের আম সংগ্রহের পর তা থেকেই প্রস্তুত হচ্ছে আমের জুসের প্রধান কাঁচামাল পাল্প। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই প্রতিদিন শত শত টন এমন আম থেকে তৈরি হচ্ছে আমের পাল্প। স্থানীয় প্রশাসনের গাফেলতি ও উদাসিনতায় এমন পাল্প তৈরির কারখানা গড়ে উঠলেও নেয়া হচ্ছে না কোনো ব্যবস্থা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মৌসুমের শেষ দিকেও জমজমাট কোনাবেচা দেশের সবচেয়ে বড় আমবাজার চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে। এখনো বাজার সরগরম আশ্বিনা জাতের আমে। এ বাজারেই গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক আমের আড়ত। বাজার ও এসব আড়তে কাঁচা ও পাকা জাতের আশ্বিনা আম বিক্রি হচ্ছে ১৫০০-২০০০ টাকা মণ দরে। অথচ একই বাজারে একই জাতের আম মিলছে ১০০ টাকা মণ দরেও। তাও প্রতি মণ আমে কৃষককে দিতে হচ্ছে ৫২-৫৫ কেজি। পোকা ও ছত্রাকের আক্রমণে পচে নষ্ট হয়ে যাওয়া, ফাটা ও গলে যাওয়া খাবার অনুপযোগী এসব আম নামমাত্র মূল্যে কিনে নিচ্ছেন আড়তদাররা। এরপর এসব আম যাচ্ছে পাল্প প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোতে।
আমচাষি ও আড়তদাররা জানান, বিভিন্ন পোকা ও নানারকম ছত্রাকের আক্রমণ এবং অতিরিক্ত বৃষ্টির প্রভাবে চলতি বছর আশ্বিনা আমের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এমনকি পঁচে যাওয়া এসব আম গাছ থেকে পড়েই নষ্ট হচ্ছে। খাবার অনুপযোগী হওয়ায় বাজারে নিতে চান না ক্রেতারা। এমন অবস্থায় নামমাত্র মূল্যে এসব আম কিনছেন কানসাট বাজারের আড়তদাররা। সরেজমিনে দেখা যায়, নিম্নমানের পঁচে নষ্ট ও দাগ লাগা এসব আম কিনে নেয়া হয়। এরপর সবচেয়ে খারাপ আম আলাদা করে তা ক্যারেটভর্তি করে নিয়ে গিয়ে মণপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা লাখে বিক্রি করা হয় পাল্প প্রস্তুতকারক কোম্পানীতে।
কৃষকরা জানান, কৃষকের কাছে সংগ্রহের পর এসব পচা নষ্ট হওয়া এসব আম যায় জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নর আলমপুর এলাকায় গড়ে ওঠা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ ফিটুর মালিকানাধীন চাঁপাই এগ্রো প্রোডাক্ট মার্কেটিং কোম্পানী লিমিটেডের ফ্যাক্টরিতে। এরপর এমন নিম্নমানের আম থেকেই তৈরি হয় জুসের প্রধান কাঁচামাল পাল্প। এসব পাল্প কিনে নেয় দেশের নামি-দামি জুস কোম্পানি। ফ্যাক্টরিতে গিয়েও দেখা যায়, ড্রামে খোলা আকাশের নিচেই রাখা হয়েছে প্রস্তুতকৃত পাল্প। এমনকি এসব পাল্পের ড্রামের উপরে জমেছে বৃষ্টির পানি। এমন পচা, গলে যাওয়া আম থেকে পাল্প তৈরির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি সচেতন আমচাষী, কৃষক নেতা ও অভিভাবকদের।
কৃষক শফিকুল ইসলাম জানান, কানসাট বাজারে অর্ধশতাধিক আড়তে এসব পচা নষ্ট আম কিনে নেয়া হয় নামমাত্র মূল্য দিয়ে। অথচ মাত্র ১০০ টাকারও বেশি খরচ হয় ৫০-৫৫ কেজি আম বাজারে আনতে। কিন্তু কোন উপায় না থাকায় বাধ্য হয়েই এমন দামে আম বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষকদের। এবার রোগবালাইয়ের এত বেশি আক্রমণ হয়েছে যে শ্রমিক, সার, কীটনাশকের খরচই উঠছে না, লাভ তো অনেক দূরের কথা। পথে বসার উপক্রম হয়েছে আমচাষিদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আড়তদার সময় সংবাদকে জানান, সকলেই প্রকাশ্যেই এসব আম কিনছে কানসাট বাজারে। তাই আমরাও কিনছি। এসব নষ্ট হওয়া আম যেহেতু খাবার উপযোগী নয়, তাই বাজারে এর কোনরকম চাহিদা নেই। সেই সুযোগ কম দাম দিয়ে এসব আম কিনে মনপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা লাভে পাল্প কোম্পানিতে বিক্রি করছি। আমরা এসব আম না কিনলে ফেলে দিতে হতো। এসব আম কানসাট বাজার থেকে সরাসরি পাশের উপজেলা গোমস্তাপুরের বোয়ালিয়ায় চাঁপাই এগ্রো প্রোডাক্ট মার্কেটিং কোম্পানী লিমিটেডের ফ্যাক্টরিতে।
বোয়ালিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা ও মুদি দোকানি তারেক রহমান বলেন, এখানে আকিজের আরও একটি প্রতিষ্ঠান আমের পাল্প তৈরি করে। এতে তারা আমের মৌসুমে বিপুল পরিমান আম নিয়ে জুসের জন্য পাল্প তৈরি করে থাকে। কিন্তু তারা একটিও পাকা আম নেয় না। বরং কাঁচা আম সংগ্রহ করে সেগুলো পাকিয়ে তারপর পাল্প তৈরি করে। কিন্তু আ.লীগ গোলাম মোহাম্মদ ফিটুর চাঁপাই এগ্রো প্রোডাক্ট মার্কেটিং কোম্পানী লিমিটেডের ফ্যাক্টরিতে জেলার যতগুলো পাঁকা, পচা, নষ্ট হওয়া আম কিনে নেয়। এসব আম দিয়েই তারা জুসের পাল্প তৈরি করে, এটা এলাকার সবাই জানে।
কৃষক নেতা মুনজের আলম মানিক সময় সংবাদকে জানান, পাল্প তৈরির অনেকগুলো ধাপ থাকে। তবে জীবাণুযুক্ত ও পঁচা নষ্ট হওয়া আম দিয়ে পাল্প তৈরির সময় এসব ধাপে তা বিনষ্ট না করলে এটি কোনভাবেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। আমরা আশা করব, সংশ্লিষ্ট দপ্তর বিষয়টি খতিয়ে দেখবে এবং কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি করবে।
সচেতন নাগরিক ও অভিভাবক শহিদুল ইসলাম, আরিফুল হক, মোজাম্মেল আহমেদ বলেন, জুসের অন্যতম প্রধান অংশ ক্রেতাই হলো শিশুরা। বিজ্ঞাপনগুলোতে নিরাপদ ও সুমিষ্ট আম থেকে জুস তৈরির কথা বললেও পচা নষ্ট হওয়া আম থেকে জুস তৈরির বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। কারন কোমলমতি শিশুরা এতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে। এটি কোনভাবেই কাম্য নয়।
ফ্যাক্টরিতে পচা, নষ্ট, খাবার অনুপযোগী আম আসলেও পাল্প তৈরির প্রক্রিয়ার সময় আমের সেই অংশ কেটে ফেলে দেয়া হয় বলে দাবি ফ্যাক্টরি মালিক ও গোমস্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ ফিটুর। সময় সংবাদকে তিনি বলেন, সকল নিয়ম সঠিকভাবে মেনেই পাল্প তৈরি করা হয়। এছাড়াও আমাদের পাল্প কিনে নেয় দেশের নামি-দামি জুস প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো। আমাদের পাল্প নেয়ার আগে তারা নমুনা সংগ্রহ করার পরই নিশ্চিত হলে কিনে নেয়।
পচা আম দিয়ে পাল্প উৎপাদনকে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি বলছেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো. শাকিলুজ্জামান। তিনি জানান, নিরাপদ খাদ্য আইনে এধরনের আম দিয়ে পাল্প বা জুস তৈরি মারাত্মক অপরাধ। কারন এতে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। আমরা বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
আমের আড়তদারসহ পাল্প তৈরির সাথে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস স্থানীয় প্রশাসনের। শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম সময় সংবাদকে বলেন, এমন আম বিক্রি, কেনা ও পাল্প তৈরির সাথে জড়িতেদর আইনের আওতায় আনা হবে। কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বিক্রেতাদের সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন