প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
তুলার আমদানি নির্ভরতা কমানোর জন্য এবং স্থানীয় বস্ত্র ও পোশাক শিল্পকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশীয় তুলার আঁশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৯ লাখ গাঁটে উন্নীত করার একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নির্ধারণ করেছে সরকার।
বর্তমানে, বাংলাদেশ ২.২৪ লাখ গাঁট তুলার আঁশ উৎপাদন করে, যা দেশের বস্ত্র খাতের চাহিদার প্রায় ১৬-১৭ শতাংশ পূরণ করে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনার ধারাবাহিকতায়, ২০৩০ সালের মধ্যে তুলার আঁশ উৎপাদন ৫ লাখ গাঁটে পৌঁছানোর পর, ২০৫০ সালের মধ্যে এটি আরও বেড়ে ১৯ লাখ গাঁটে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) তুলা উন্নয়ন বোর্ডের (সিডিবি) উপ-পরিচালক কুতুব উদ্দিন মন্তব্য করেন, হাইব্রিড তুলার জাত উদ্ভাবন, চাষযোগ্য জমির সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের ধারাবাহিক প্রণোদনা সহায়তার মাধ্যমে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
তিনি আরও বলেন, উপযুক্ত জমির ব্যবহার এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধি করে বাংলাদেশে তুলার উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরো জানিয়েছেন, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে দেশটি আমদানিকৃত তুলার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবে এবং পোশাক খাতের সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন)কে আরও শক্তিশালী করা যাবে।
সিডিবির তথ্যমতে, বর্তমানে সারাদেশে ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে তুলার চাষ হয়, যদিও প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমি চাষের আওতায় আনার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার প্রধানত চরাঞ্চল, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকার খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য অনুপযোগী উপযুক্ত সমতল ভূমিতে তুলা চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
কর্মকর্তাদের মতে, এই কৌশলের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তায় কোনো প্রভাব না ফেলেই তুলার উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পের জন্য প্রতি বছর ৯০ লাখ গাঁট কাঁচা তুলার প্রয়োজন হয়, যা দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তুলা আমদানিকারক দেশে পরিণত করেছে। এই চাহিদা পূরণ করতে বাংলাদেশ বছরে আনুমানিক ৭৫-৮০ লাখ গাঁট তুলা আমদানি করে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশীয় চাহিদার যোগান দিতে ৪৫ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ে প্রায় ৭৩ লাখ গাঁট কাঁচা তুলা আমদানি করা হয়েছে, যা দেশের তুলা উৎপাদন বাড়ানোর গুরুত্বকে তুলে ধরে।
সিবিডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু ২০৩০ সালের মধ্যে তুলার আঁশের উৎপাদন ৫ লাখ গাঁটে উন্নীত করতে পারলেই আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব এবং বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা যাবে।
উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে তুলা চাষীদের প্রণোদনা দেওয়া, ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় তুলা চাষীদের আনা এবং কার্বন ট্রেডিং উদ্যোগের মাধ্যমে ঋণ সুবিধার সম্প্রসারণ।
বিশ্বের তুলা উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ৪০তম। অন্যদিকে, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও ব্রাজিল বিশ্বে তুলা উৎপাদনে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
তুলা কেবল দেশের বস্ত্র ও পোশাক শিল্পের প্রধান কাঁচামাল নয়, এটি থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপজাতও পাওয়া যায়। তুলার বীজ প্রক্রিয়াজাত করে ভোজ্যতেল তৈরি করা হয় এবং খৈল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, যা এই ফসলের অর্থনৈতিক মূল্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
উৎপাদনে ধারাবাহিক অগ্রগতি সত্বেও বাংলাদেশে দেশীয় উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে এখনো একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
সিডিবি উপ-পরিচালক ড. মো. তাসদিকুর রহমান বলেন, তুলা চাষ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি- এর মধ্যে রয়েছে নীতিগত পর্যালোচনার অভাব, ফসলের তুলনামূলক দীর্ঘ উৎপাদন সময়, অন্যান্য উচ্চমূল্যের ফসলের সাথে প্রতিযোগিতা, চাষযোগ্য জমির অভাব, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, মূল্যের ওঠানামা এবং কীটপতঙ্গের আক্রমণ।
তিনি বলেন, এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সরকারের ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। সরকার ইতোমধ্যে তুলা উন্নয়ন বোর্ডকে শক্তিশালীকরণ, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং পরিবেশবান্ধব বস্ত্র খাতকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
উৎপাদন ত্বরান্বিত করার জন্য তুলা চাষের এলাকা আরও সম্প্রসারণ, সিডিবির সাংগঠনিক সংস্কার, বৃহত্তর নীতিগত সহায়তা, তুলা চাষিদের জন্য মূল্য ভর্তুকি এবং বিশেষ কৃষি ঋণের প্রয়োজনীয়তার ওপরেও জোর দেন তিনি।
সরকারের সহায়তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তুলা চাষের জন্য প্রণোদনা হিসেবে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের (সিবিডি) মৃত্তিকা উর্বরতা ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. এম গাজী গোলাম মুর্তুজা বলেন, ২৬টি জেলার প্রায় ২৫ হাজার প্রান্তিক কৃষক এক বিঘা জমিতে আন্তঃফসল হিসেবে তুলা চাষের জন্য উন্নত মানের বীজ, সার ও কীটনাশক পাবেন। উৎপাদন খরচ কমিয়ে মুনাফা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকদের আরও বেশি তুলা চাষে উৎসাহিত করাই এই প্রণোদনা কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য।
তুলাকে বাংলাদেশের অন্যতম লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিত করে ড. মুর্তুজা বলেন, পাট চাষ কমে যাওয়ায় এই ফসলটি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। খুব কম ফসলই আছে যা তুলার সমতুল্য আয় দেয়। কৃষকদের তুলা চাষে উৎসাহিত করলে তাদের আয় বাড়ে এবং দেশের আমদানি ব্যয়ও কমে।
সিবিডির নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন বলেন, কৃষকদের জন্য তুলা চাষ অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়। তার মতে, এক বিঘা জমিতে তুলা উৎপাদন করতে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়, যেখানে কৃষকরা প্রায় ১৫ মণ কাঁচা তুলা সংগ্রহ করে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দেশীয়ভাবে উৎপাদিত প্রতি কেজি তুলা সরকারের প্রায় ৪ মার্কিন ডলার আমদানি খরচ সাশ্রয় করে। যা স্থানীয় উৎপাদনকে কৃষক ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে।
সাধারণত জুনের মাঝামাঝি সময়ে তুলার বীজ বপন করা হয় এবং ডিসেম্বরে তা কাটা হয়। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের বিজ্ঞানীরা বলেছেন, উন্নত বীজ প্রযুক্তি এবং উন্নত চাষাবাদের পদ্ধতির পাশাপাশি জিনগতভাবে পরিবর্তিত তুলার জাতের প্রবর্তন উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
তারা আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক এবং জলবায়ুগত পরিস্থিতি তুলা চাষের জন্য অনুকূল। বিশেষ করে দক্ষিণ, পশ্চিম, উত্তর এবং মধ্য অঞ্চলের ৩২টিরও বেশি জেলায় উঁচু ও পাহাড়ি এলাকায় তুলা চাষের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে।
কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, সরকারের ধারাবাহিক সহায়তা, চাষাবাদ সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং কৃষকদের বৃহত্তর অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আগামী দশকগুলোতে অভ্যন্তরীণ তুলা উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে, আমদানিকৃত কাঁচা তুলার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে এবং বিশ্বে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে দেশের বস্ত্র ও পোশাক শিল্পকে শক্তিশালী করতে সক্ষম হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন