প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
মালয়েশিয়া প্রায় ৫২ বছর ধরে ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রেখে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। ১৯৭৪ সাল থেকে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশটির ইসরায়েলের সঙ্গে কোনও কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং দেশটিতে ইসরায়েলি কোনও নাগরিককে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।
সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। আটজন মার্কিন আইনপ্রণেতা এই ব্যাপারে একটি হুমকি দিয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে কুয়ালালামপুর যদি ইসরায়েলি নাগরিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক প্রশিক্ষণ তহবিল স্থগিত করে দেবে।
কিন্তু মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম মার্কিন সেই হুমকিকে ‘বুড়ো আঙুল’ প্রদর্শন করে বিরোধী মত প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, মালয়েশিয়া প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তার সার্বভৌম অধিকার প্রয়োগ করছে এবং দেশের কোথাও ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, যেসব ইসরায়েলি নাগরিক মালয়েশিয়ায় বাস করছেন, তাদের খুঁজে বের করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খবর দ্য সাউথ চায়না পোস্টের।
মার্কিন আইনপ্রণেতাদের দাবি, মালয়েশিয়ায় বসবাসরত ইসরায়েলি নাগরিকদের, যাদের মধ্যে দ্বৈত নাগরিকরাও রয়েছেন, নির্বাসিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আনোয়ার ইব্রাহিমের সরকার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে।
বুধবার (২২ জুলাই) সেরেম্বানে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। আমাদের মতে, এই নীতি মালয়েশিয়া কয়েক দশক ধরে গ্রহণ করে আসছে। যে কোনো ইসরায়েলি নাগরিকের উপস্থিতির বিরুদ্ধে আমরা অবস্থান নিচ্ছি; এটি ইহুদিদের বিরুদ্ধে নয়। কারণ ইসরায়েলি নাগরিকরা ফিলিস্তিন ও গাজায় হত্যা, অপরাধ এবং ক্রমাগত নিপীড়ন ও উপনিবেশায়নে জড়িত।
সোমবার, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিওকে একটি চিঠি প্রেরণ করেন ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস সদস্যরা, যেখানে তারা আনোয়ার ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে তিনি জাতীয়তার কারণে আমেরিকার এক ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের নাগরিকদের ‘খুঁজে বের করে বহিষ্কার’ করার অঙ্গীকার করেছেন।
এই মার্কিন আইনপ্রণেতারা জানিয়ে দেন যে, আন্তর্জাতিক সামরিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির (International Military Education and Training programme) মাধ্যমে মালয়েশিয়া মার্কিন প্রযুক্তি ও বাজারে প্রবেশাধিকার এবং নিরাপত্তা সহায়তা লাভ করছে। এই কর্মসূচিটি অংশীদার দেশগুলোর কর্মীদের জন্য পেশাদার আমেরিকান সামরিক প্রশিক্ষণে অর্থায়ন করে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তারা একত্রে মালয়েশিয়ার সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক পর্যালোচনা করার আহ্বান জানান চিঠিতে। একইসঙ্গে কুয়ালালামপুর ১৫ দিনের মধ্যে তার নীতি পরিবর্তন না করলে এই কর্মসূচির অর্থায়ন স্থগিত করারও আবেদন জানান। চিঠিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে মালয়েশিয়ার অস্বীকৃতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। এ বিষয়ে আমেরিকান করদাতাদের টাকায় খরচ বহন করা উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ওই আইনপ্রণেতারা আনোয়ার ইব্রাহিমের সরকারকে হামাসের সাথে প্রকাশ্য সম্পর্ক বজায় রাখার জন্যও অভিযুক্ত করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে তারা দাবি করেছেন, হামাস হলো একটি ফিলিস্তিনি জঙ্গি গোষ্ঠী, যা ওয়াশিংটন দ্বারা একটি বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই সংগঠনটির যোদ্ধারা মালয়েশিয়ার মাটিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছে।
আনোয়ার ইব্রাহিম এই অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা (মার্কিন আইনপ্রণেতারা) হুমকি দিতে পারে, কিন্তু আমি মালয়েশিয়ার জনগণের অধিকার দৃঢ়ভাবে রক্ষা করব এবং মালয়েশিয়ায় ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার বিষয়ে মালয়েশীয়দের নেওয়া সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে যাব।
তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। আমরা আমাদের অধিকার প্রয়োগ করি এবং গর্বের সঙ্গে বলতে পারি যে মালয়েশীয়রা নারী-পুরুষের মর্যাদাকে সম্মান করে এবং মানবতার চেতনাকে শ্রদ্ধা করে।
মূলত, জোহর রাজ্যের ফরেস্ট সিটিতে পরিচালিত একটি প্রযুক্তি ও ডিজিটাল নোম্যাড কমিউনিটি ‘নেটওয়ার্ক স্কুল’কে কেন্দ্র করে একটি তদন্ত থেকে বিবাদের সূত্রপাত হয়। অনলাইনে অভিযোগ ওঠে যে, ইসরায়েলিরা দ্বিতীয় দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে সেখানে বসবাস করছে। প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তখন বলেছিলেন, ওই প্রযুক্তি কমিউনিটিতে যদি কোনো ইসরায়েলি নাগরিক পাওয়া যায়, তবে তাকে অবিলম্বে বহিষ্কার করা হবে।
পরে মালয়েশিয়ার অভিবাসন কর্মকর্তারা ৪০টি দেশের ২৬৬ জন বিদেশিকে তদন্ত করে প্রাথমিকভাবে দেখতে পান যে, সকলের কাছে বৈধ কাগজপত্র রয়েছে, যদিও দ্বৈত নাগরিকত্বধারী হিসাবে মনে করা ১১ জনের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
পরিদর্শনে লাইসেন্স এবং প্রাঙ্গণ ব্যবহারের নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ায় জোহর কর্তৃপক্ষ নেটওয়ার্ক স্কুলের ব্যবসায়িক লাইসেন্স বাতিল করে এবং বুধবার থেকে এটিকে বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। রাজ্য সরকার বলেছে, এই পদক্ষেপটি একটি আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নেওয়া হয়েছে এবং অভিবাসন, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থাকে সম্ভাব্য লঙ্ঘনের বিষয়ে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি পাসপোর্টধারীদের প্রবেশের জন্য সাধারণত মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, তবে দ্বিতীয় দেশের পাসপোর্টের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াকরণ জটিল।
এই সাম্প্রতিক বিবাদটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে দেখা যাওয়া উত্তেজনাকে পুনরুজ্জীবিত করেছে, যখন আনোয়ার ইব্রাহিম সংসদে বলেছিলেন যে হামাসকে নিন্দা জানাতে বা এটিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে মালয়েশিয়া তিনটি মার্কিন কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র পেয়েছে। ১৩ এবং ৩০ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুইটি প্রতিবাদপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল, এবং একইসঙ্গে স্টেট ডিপার্টমেন্ট ওয়াশিংটনে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছিল।
আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, এই বিবাদ ওয়াশিংটনের সঙ্গে কুয়ালালামপুরের বৃহত্তর সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। তিনি বলেন, আমরা অন্যান্য দেশের মতোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখছি। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ফিলিস্তিন ও গাজাসহ নিরীহ মানুষ হত্যার নিন্দা জানাতে অনিচ্ছুক বা ভীত হওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব।
এদিকে, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় অনুসারে, ২০২৫ সালে মালয়েশিয়ার সঙ্গে মার্কিন পণ্য বাণিজ্য আনুমানিক ৮৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে মালয়েশিয়া থেকে আমদানি ১৩.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
টেলর’স ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র লেকচারার জুলিয়া রকনিফার্ড বলেছেন, শুধুমাত্র এই বিতর্কটি বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্কে ব্যাপক ফাটল ধরানোর সম্ভাবনা কম, কারণ এই সম্পর্কগুলো বৃহত্তর কৌশলগত বিবেচনার দ্বারা গঠিত। ফিলিস্তিন বিষয়ে মালয়েশিয়ার অবস্থান সুপরিচিত। শুধুমাত্র এই এক ঘটনা দ্বারা বাণিজ্য ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক ক্ষেত্র প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবে, এই বিরোধ ফিলিস্তিন ও গাজাসহ আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণের জন্য মালয়েশিয়ার আমন্ত্রণ পাওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে। রোকনিফার্ডের মতে, ওয়াশিংটন এই ইস্যুতে মার্কিন কর্মসূচির ক্ষেত্রে কুয়ালালামপুরকে ‘শুধু নিরপেক্ষ নয়, বরং বিঘ্ন সৃষ্টিকারী’ হিসেবেও দেখতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন