প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা পতনের জুলাই বিপ্লবটি ছিল ছাত্র-জনতার বিপ্লব। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে পিরোজপুর জেলার পাঁচজন শহীদ হয়েছিলেন। ওই পাঁচজনের মধ্যে তিনজন ছিলেন দিন মজুর এবং দুজন ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা পতনের আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে শহীদ হন জেলার নাজিরপুর উপজেলার মোঃ হাফিজুল ইসলাম ও রফিকুল ইসলাম, মঠবাড়িয়া উপজেলার আবু জাফর হাওলাদার ও মোঃ মামুন খোন্দকার এবং ভান্ডারিয়া উপজেলার মোঃ এমদাদুল হক। তাঁরা যেভাবে শহীদ হন-
শহীদ হাফিজুল: জেলার নাজিরপুর উপজেলার চর রঘুনাথপুর গ্রামের আবু বকর সিকদারের ছেলে মোঃ হাফিজুল ইসলাম ২০২৪ সালের ২০ জুলাই ঢাকার মধ্য বাড্ডায় শহীদ হন। জুলাই শহীদ রিকশা চালক হাফিজুল প্রতিদিনের মতো ঢাকার পূর্ব বাড্ডা’র রূপনগর এলাকার বাসা থেকে তার রিকশা নিয়ে বের হন। রামপুরা, মধ্যবাড্ডাসহ ওইসব এলাকা তখন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে উত্তাল ছিল। তখন সময় ছিল সকাল ১০ টা। আন্দোলকারীদের সাথে বিজিবি-পুলিশের সংঘর্ষ চলছে। ওই সংঘর্ষের মাঝে পড়ে হাফিজুল। এ সময় বিজিবির ছোড়া গুলিতে তার বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায়।
হাফিজুলের বাবা জানান, ঘটনাটি তিনি একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানতে পারেন। তিনি ছুটে গিয়ে দেখতে পান তার ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় ছাত্ররা বাড্ডা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার ছেলে চিকিৎসা দিতে অনীহা প্রকাশ করলে ছাত্রদের চাপের মুখে চিকিৎসা শুরু করে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই পিতার কোলেই হাফিজুলের মৃত্যু হয়, শহীদ হন হাফিজুল।
আবু বকর জানান, গ্রামে আয় করার মত তার অবস্থা ছিলো না। তাই বাড়ী ভিটা ছেড়ে ২১ বছর আগে ঢাকার বাড্ডায় একটি ভাড়া বাসায় থেকে সিএনজি চালিয়ে সংসার চালাতেন। বয়স ভারে তিনি এখন কিছু করতে পারেন না। তাই ছেলে হাফিজুল রিকশা চালিয়ে সংসারের হাল ধরেছিল। ছেলেই সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ছেলের দুটি নাবালক ছেলে-মেয়ে ও প্রতিবন্ধী স্ত্রী আছে। এখন এদের কে দেখবে। আমরা কোথায় যাব। সরকার যে ভাতা দেয় তাতে সংসার চলে না।
শহীদ রফিকুল: বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার পতনের আন্দোলনে শারীরিক, মানসিক ও লেখনীর মাধ্যমে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছিলেন জুলাই শহীদ মোঃ রফিকুল ইসলাম। রফিক পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার সাতকাছেমিয়া গ্রামের মো. আব্দুল জব্বার শিকদারের ছেলে। রফিকুল ১৯ জুলাই অফিস থেকে বেরিয়ে ঢাকার মানিকনগর বিশ্বরোডে প্রতিদিনের মতো আন্দোলনে যোগ দিতে মাগরিবের নামাজ পড়তে মসজিদে যান। এরপর তিনি আর বাসায় ফেরেননি। অনেক খোঁজাখুঁজি শেষে তার স্ত্রী ও সন্তান জানতে পারেন তিনি কেরানীগঞ্জ কারাগারে আছেন। পরে জানতে পারেন তিনি সেখানে নেই। ৫ আগস্ট হাসিনার পতন হলো। ৮ আগস্ট শহীদ রফিকের ভাইয়েরা আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামে গিয়ে লাশের ছবি দেখে রফিকুল ইসলামকে শনাক্ত করেন। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম কর্তৃপক্ষ তাদেরকে জানিয়েছে রফিকুল ইসলামকে ২৪ জুলাই বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে রায়ের বাজার কবরস্থানে অগণিত লাশের সাথে দাফন করা হয়।
স্বজনরা বলছেন, লাশের ছবিতে দেখা গেছে, ঘাতকরা রফিকুল ইসলামকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে হত্যা করেছে। যা নাৎসি বাহিনীকে হার মানিয়েছে। শহীদ রফিকুল ইসলাম এক স্ত্রী এক ছেলে রেখে গেছেন। ছেলেটি তা’মিরুল মিল্ল্লাত কামিল মাদ্রাসার আলিম শ্রেণীর ছাত্র। শহীদ রফিকের স্ত্রী নার্জিয়া ইসলাম বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেছেন।
শহীদ মামুন খোন্দকার: চব্বিশের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের মাত্র ২ ঘন্টা আগে আশুলিয়ার বাইপালে আন্দোলনরত মোঃ মামুন খোন্দকারের কপাল ভেদ করলো পুলিশের বুলেট। রাস্তায় লুটিয়ে পড়লো মামুন। সহযোদ্ধারা তাঁকে ধরাধরি করে নিয়ে গেলো সাভারের এনাম মেডিকেলে। ৭ আগস্ট ওই হাসপাতালে শহীদ হলেন মামলা খোন্দকার। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বেতমোর রাজপাড়া গ্রামের মৃত মজিবুর রহমান খোন্দকারের ছেলে মামুনের আশুলিয়ায় ছোট্ট একটি এম্ব্রয়ডারীর দোকান ছিলো। ওই দোকানের আয়ে ২ ছেলে ২ মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে ৬ জনের সংসার চলতো। এই অবস্থায়ও প্রতিদিন ছাত্র-জনতার ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে আশুলিয়ার বাইপালে নেতৃত্ব দিতো মামুন।
মামুনের স্ত্রী সাথী খোন্দকার জানিয়েছেন, তাদের বড় ছেলে হেলাল খোন্দকার টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র। ছোট ছেলে সাখাওয়াত ও বড় মেয়ে মুনতাহা সাভারের একটি মাদরাসায় হিফজ এর ছাত্র। ৩ বছরের ছোট মেয়ে মাবরুকা জাহিন। সাথী জানান, সরকার থেকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা পান আর নিজে ওই এম্ব্রয়ডারীর দোকান চালিয়ে যে টাকা পান তা দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে সংসার চলে তার। তিনি জানান, স্বামী হত্যায় নিজে বাদী হয়ে মামলা করেছেন। পুলিশ এখনো চার্জশীট দেয়নি। তিনি শহীদ মামুন হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।
শহীদ আবু জাফর: পেশায় বাস চালক মোঃ আবু জাফর। সারা দেশে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা পতনের আন্দোলন চলছে। ছাত্র-জনতার উপর পুলিশ ও আওয়ামী গুন্ডাদের অত্যাচারের দৃশ্য দেখে সইতে না পেরে জাফর নিজেও আন্দোলনে শরীক হয়ে ১৮ জুলাই সন্ধ্যা ৭ টার দিকে ঢাকার গোলাপবাগ এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। জাফর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার ছোট মাছুয়া গ্রামের আঃ মজিদ হাওলাদারের ছেলে। শহীদ জাফর ছিলেন ৬ জনের সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্ত্রী সেতারা বেগম, তিন ছেলে শাওন, নুহু ও নাঈম এবং দাদা এই পাঁচ জনের সংসার চলে বড় ছেলে শাওনের আয়ে। শাওন আইকনিক নামের একটি বাসের সুপারভাইজার। নুহু জানান, তার পিতা শহীদ হওয়ার পর এক মহিলা জাফরকে স্বামী দাবি করলে জাফরের পরিবার সরকারি মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পান না। তিনি জানান, তার বাবা শহীদ হওয়ার পর সরকার থেকে এককালীন ৫ লাখ টাকা পেয়েছিলেন এবং জামায়াত ইসলামী দিয়েছিল ২ লাখ টাকা। এ ছাড়া জামায়াত প্রতি ঈদে ১০ হাজার টাকা করে দিয়েছে। অন্য কোনো সহযোগিতা পাননি। এখন তারা দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন বলে জানান। পিতা হত্যায় কোনো মামলা করেছেন কিনা জানতে চাইলে নুহু বলেন, কার বিরুদ্ধে মামলা করবো, মামলা করলে ওই মামলার পেছনে কে দৌড়াবে।
শহীদ এমদাদুল: ঢাকার উত্তর বাড্ডায় ২০২৪ সালের ২০ জুলাই সকালে মিছিলে শরিক হন মোঃ এমদাদুল ইসলাম। মিছিলটি এ এম জেড হাসপাতালের সামনে গেলে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ঘাতক পুলিশ গুলি চালালে একটি বুলেট তার কপাল ফুটো করে দেয়, শহীদ হন মোঃ এমদাদুল। জুলাই শহীদ এমদাদুল পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলার ধাওয়া গ্রামের মোঃ আবদুস সোবাহান ও হাসিনা বেগমের দুই ছেলের মধ্যে ছোট। রিকশা চালক পিতার ছোট ছেলে এইচএসসি পাশ এমদাদ উচ্চ শিক্ষা লাভের আশায় ঢাকায় যান। কিন্তু পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা সোবাহান রোগাক্রান্ত হলে তার উচ্চ শিক্ষা লাভ হয়ে ওঠেনি। সংসারের হাল ধরতে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরেন এমদাদ।
ঢাকায় শুরু হয় ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার পতনের আন্দোলন। এমদাদও যোগ দেন আন্দোলনে। ২০ জুলাই ঘাতক পুলিশের ছোড়া বুলেটে শহীদ হন এমদাদুল।
শহীদ এমদাদুলের মা হাসিনা বেগম জানান, ‘আমাদের ৮ জনের পরিবারে কোনো জমি নেই। পরের জায়গায় ঘর তুলে আছি। সামান্য বৃষ্টি হলেই ভাঙ্গা ঘরের চাল দিয়ে ঘরে পানি পড়ে। এর মধ্যে আমাদের কষ্ট করে থাকতে হয়।’
জুলাই শহীদ পরিবার হিসেবে সরকার থেকে মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা এবং ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থেকে যে টাকা পায় তার একটি মোটা অংকের টাকা এমদাদুলের পিতার চিকিৎসায় ব্যয় হয়। পরিবারের খরচ মেটাতে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এমদাদুলের বড় ভাই মোঃ হাসান এখন দিন মজুরের কাজ করে।
সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে হাসিনা বলেন, ‘আমাদের কোনো জমি-জমা, ঘর-বাড়ী নেই, সরকার যদি একটু জমি দিতো, তাহলে আমরা ঘর বানিয়ে বসবাস করতে পারতাম।’ ছেলে হত্যার বিচার বিষয়ে হাসিনা বলেন, তারা কোনো মামলা করেননি। শুনেছেন ঢাকায় মামলা হয়েছে। মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে তদন্তে লোক আসতো। তবে এমদাদুলের পরিবার তার হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন