প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
এক দশক ধরে বাবা নেই। অন্যের বাড়িতে কাজ করে অনেক কষ্টে মেয়েকে বড় করেছেন মা। জীবনের নানাবিধ প্রতিকূলতার মোকাবিলা করে মেয়েকে মানবিকভাবে গড়ে তুললেও মেয়ের বিয়ের বয়সে এসে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় তার বিয়ে। সামর্থ্যের অভাবে বড় কোনো আয়োজন নিয়ে চিন্তা করতেই পারেননি মা।
ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়ালেন একজন মানবিক মানুষ। শুধু বিয়ের খরচ বহন করাই নয়, নিজ মেয়ের মতো করে আয়োজন করলেন ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান। বরযাত্রীদের আপ্যায়ন থেকে শুরু করে খাবারের আয়োজন এবং বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা—কোনো কিছুতেই ছিল না কমতি।
এভাবে গত ২৪ বছরে ১১২ জন অসহায়, হতদরিদ্র ও এতিম মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন নাটোরের বড়াইগ্রামের রুহুল আমিন রুবেল। তার উদ্যোগের মাধ্যমে এবার রাজশাহীর চারঘাট উপজেলা এলাকার বালাদিয়া গ্রামের ১৯ বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তার তিথির বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।
শুক্রবার বালাদিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই পুরো বাড়িতে উৎসবের আমেজ। বাড়ির সামনে বিয়ের কারুকাজ করা গেট। অতিথি ও বরযাত্রীদের আপ্যায়নের জন্য chairs এবং tables সাজানো রয়েছে। বাড়ির এক পাশে রান্নার ব্যস্ততা চলছে। গরু, খাসি, মুরগি, ডিম এবং পোলাওসহ নানা পদের খাবার প্রস্তুত করা হচ্ছে।
চারপাশের এই আয়োজন দেখে বোঝার উপায় ছিল না—এটি একজন বাবা হারানো অসহায় মেয়ের বিয়ে।
বাড়ির জরাজীর্ণ একটি কক্ষে তখন বউ সাজানো হচ্ছিল তিথিকে। একদল নারী ব্যস্ত তাকে সাজাতে। বাইরে উৎসবের ব্যস্ততা, ভেতরে কনের সাজ—সব মিলিয়ে মুখর পুরো বাড়ি।
প্রায় ১০ বছর আগে বাবাকে হারান সুমাইয়া আক্তার তিথি। এরপর তার মা জহুরা খাতুনই হয়ে ওঠেন তার একমাত্র অবলম্বন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন এবং সংসার চালিয়েছেন। অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করলেও মেয়েকে আগলে রেখেছেন নিজের মতো করে।
কিন্তু মেয়ের বিয়ের বয়স এলে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েন জহুরা খাতুন। তিনি মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা রাখলেও বড় আয়োজনের সামর্থ্য ছিল না।
এর মধ্যেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুহুল আমিন রুবেলের অসহায় ও এতিম মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার কার্যক্রম দেখতে পান। এরপর তিনি রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নিজাতের টেকনাফ বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেওয়ার পর বিয়ের দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান রুবেল।
এরপর ঠিক হয় দিন-তারিখ। বৃহস্পতিবার রাত থেকে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়। শুক্রবার দিনভর চলে বিয়ের নানা আনুষ্ঠানিকতা।
জুমার নামাজের পর বর তরিকুল ইসলাম ও তার বরযাত্রীরা কনে বাড়িতে এসে উপস্থিত হন। পাশের রাজশাহীর তালাইমারী এলাকার বাসিন্দা তরিকুলকে সোনার আংটি দিয়ে বরণ করে নেন রুহুল আমিন রুবেল। এরপর সম্পন্ন হয় বাঙালি বিয়ের সকল আনুষ্ঠানিকতা।
একটি সাধারণ ঘর সেদিন যেন পরিণত হয় আনন্দের ঠিকানায়। যে বাড়িতে এতদিন অভাব ছিল, সেই বাড়িতেই বেজে ওঠে বিয়ের সানাই। মায়ের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি ও আনন্দ।
তিথির মা জহুরা খাতুন বলেন, মেয়ের বিয়ে নিয়ে তিনি অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলেন। রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তিনি সব দায়িত্ব নেন। নিজের মেয়ের মতো করে বিয়ের আয়োজন করেছেন রুবেল। এমন আয়োজন তাদের পরিবারের কাছে ছিল কল্পনারও বাইরে।
নববধূ সুমাইয়া আক্তার তিথি এবং বর তরিকুল ইসলামও রুবেলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিথি জানান, বাবা না থাকলেও বিয়ের দিন বাবার অভাব তেমনভাবে অনুভব করতে পারেননি। এত বড় আয়োজন দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়েছেন।
বর তরিকুল ইসলামও জানান, কনে বাড়ির আতিথেয়তা এবং বিয়ের আয়োজন তাঁকে মুগ্ধ করেছে। নবদম্পতি তাদের নতুন জীবনের জন্য সবার কাছে দোয়া চান।
স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং এলাকাবাসীও রুবেলের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তাদের মতে, অসহায় ও এতিম মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে বছরের পর বছর বিয়ের দায়িত্ব পালন করা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ এবং মানবিক কাজ। যদি সমাজের বিত্তবানরা এমন কাজে এগিয়ে আসেন, তাহলে আরও অনেক অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফিরবে।
তবে রুহুল আমিন রুবেলের কাছে এসব বিষয় যেন কোন প্রচারের বিষয় নয়। তার ভাষ্য, কোনো উদ্দেশ্যে নয়, পরকালের জন্যই তিনি গত ২৪ বছর ধরে অসহায়, হতদরিদ্র এবং এতিম মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছেন।
রুবেল বলেন, এটি তার ১১২তম মেয়ের বিয়ে। বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে কেউ যোগাযোগ করলে তিনি খোঁজখবর নেন। সত্যিই যদি কেউ অসহায় হয় তবে তিনি নিজের তহবিল থেকে বিয়ের যাবতীয় খরচ বহন করেন। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের দায়িত্ব এবং সৌভাগ্য মনে করেন।
একজন বাবা তার মেয়ের বিয়েতে যে দায়িত্ব পালন করেন, তিথির বেলায় সেই দায়িত্বই যেন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন রুবেল। রক্তের সম্পর্ক নেই, কিন্তু তবুও মেয়ের বিয়েতে বাবার মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
তিথির জীবনে বাবার শূন্যতা হয়তো কখনও পূর্ণ হবে না। তবে বিয়ের এই দিনটিতে একজন মানুষ তাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন—রক্তের সম্পর্কের বাইরেও কিছু সম্পর্ক তৈরি হয় ভালোবাসা, দায়িত্ব এবং মানবিকতা দিয়ে।
১১২টি বিয়ে তাই শুধুমাত্র একটি সংখ্যার হিসাব নয়, এটি ১১২টি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর একটা গল্প। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি নিজের সামর্থ্য দিয়ে অন্যের ঘরে আনন্দের আলো জ্বালিয়ে চলেছেন বছরের পর বছর।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন