প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
প্রবল বর্ষণে কক্সবাজারে গত ছয় দিনে পাহাড়ধসে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ১৬ জন। এরপরও বাধ্য হয়ে পাহাড়ের ঢালে ও পাদদেশে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে।
পাহাড়ধসের এই ঝুঁকি শুধুমাত্র প্রাকৃতিক নয়; এর সঙ্গে মানুষের আচরণ, আস্থার সংকট এবং আশ্রয়কেন্দ্রের বাস্তব সীমাবদ্ধতাগুলোও নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস নিরুৎসাহিত করা এবং সংস্কৃতিসংবেদনশীল মানুষবান্ধব আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারলেই প্রাণহানির ঘটনা কমানো সম্ভব।
৫০ বছর বয়সী ছৈয়দা খাতুন। তিনি অসুস্থ স্বামী এবং পরিবারের ১৬ সদস্যকে নিয়ে কক্সবাজার শহরের বাঘঘোনা এলাকার একটি পাহাড়চূড়ার বসতিতে বাস করছেন, যা তার শেষ আশ্রয়। প্রতিবছরই বর্ষায় পাহাড় ধসে তার ঘর ভেঙে যায়, তবুও যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই তাদের। এবারও বসতির পাশের পাহাড়ে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে; যেকোনো মুহূর্তে ধসে যেতে পারে সবকিছু। মৃত্যুঝুঁকি জেনেও তাই পাহাড় ছেড়ে যেতে পারছেন না তিনি।
ছৈয়দা খাতুন বলেন, ‘পাহাড়ের ওপর বসতি করে প্রায় ২০ বছর হয়ে গেছে। প্রতি বর্ষা মৌসুমেই পাঁচ-ছয়বার করে ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হয়। একবার পাহাড়ধসে আমাদের পুরো বসতি তছনছ হয়ে গিয়েছিল। পরে ফিরে এসে দেখি ঘরের সবকিছু চুরি হয়ে গেছে। আরেক বছর প্রবল বর্ষণের সময় ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনিদের নিরাপদে স্বজনদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। আমি একা ঘরে ছিলাম। হঠাৎ পাহাড়ধসে একটি বাঁশ এসে আমার শরীরে আঘাত করে। গুরুতর আহত হয়েছিলাম। আল্লাহর রহমতে সেদিন প্রাণে বেঁচে যাই।’
তিনি আরও জানান, ‘এতবার জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি হলেও আমরা কোনো সরকারি সহায়তা পাইনি। দিনমজুরির আয়েই কোনোরকমে সংসার চলে। আমার স্বামী বয়স্ক ও অসুস্থ। তিনি আর কাজ করতে পারেন না। কয়েক দিন আগে ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ের মাটি পরিষ্কার করতে গিয়ে আঘাত পান। গত সাত-আট দিন ধরে তিনি অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী।’
অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর ঝুঁকি মাথায় নিয়েই পাহাড়ে বসবাস করছি। কারণ যাওয়ার মতো আমাদের আর কোথাও কোনো জায়গা নেই।’
শুধু ছৈয়দা খাতুন নন; কক্সবাজার শহরের লাইট হাউজ, পূর্ব ও পশ্চিম লারপাড়া, ডিককুল, গুচ্ছগ্রাম, শুকনো ছড়ি, দরিয়ানগরসহ ২০টিরও বেশি পাহাড়ে হাজারো মানুষ প্রতিদিন মৃত্যুঝ Risiko নিয়ে বসবাস করছেন। অনেক এলাকায় এখনও চলছে পাহাড় কেটে নতুন বসতি নির্মাণ। ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের ভাষ্য, দারিদ্র্য, ভূমিহীনতা ও মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকার অসহায়ত্বই তাদের পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে জীবন বাজি রেখে বসবাসে বাধ্য করেছে।
কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের বাঘঘোনা এলাকার মাহিয়া আক্তার বলেন, ‘আমরা খুবই অসহায় অবস্থায় আছি। আয়-রোজগার কম, নিজের জমি বা নিরাপদ জায়গা নেই। অনেক কষ্ট করে পাহাড় কিনে সেখানে ঘর করে বসবাস করছি। এখন পাহাড়ধসের ঝুঁকির কারণে থাকা যাচ্ছে না, আবার ছেড়ে যাওয়ার মতো অন্য কোনো জায়গাও নেই। আমাদের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই।’
ঝিলংজা ইউনিয়নের পশ্চিম লারপাড়া এলাকার সাবেকুন্নাহার বলেন, ‘প্রশাসন যখন পাহাড় ছেড়ে যেতে বলে, তখন আমরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। কারণ পাহাড় ছেড়ে গেলে পরিবার নিয়ে কোথায় থাকব, কীভাবে জীবন চালাব, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমরা ঝুঁকিমুক্তভাবে বাঁচতে চাই; কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার পথও আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
পাহাড়ধসে প্রাণহানির অন্যতম কারণ শুধু প্রাকৃতিক ঝুঁকি নয়, বরং মানুষের অনীহা, সামাজিক বাস্তবতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা। ঢাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নিগার সুলতানা সময় সংবাদকে বলেন, ‘পাহাড়ধস শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এর পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে সামাজিক ও আচরণগত সমস্যার। ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও অনেক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনাগ্রহী হন; কারণ এসব কেন্দ্রে তাদের বাস্তব চাহিদা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো অনেক সময় যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়া হয় না।’
তিনি বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, আশ্রয়কেন্দ্রের অস্বস্তিকর পরিবেশ, নারী-পুরুষের একসঙ্গে অবস্থান, খাদ্য ও শিশুদের বিশেষ প্রয়োজন এবং পরিবারের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার উদ্বেগ মানুষকে সেখানে যেতে নিরুৎসাহিত করে। তাই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে আরও মানবিক, কমিউনিটি-ভিত্তিক ও সংস্কৃতিসংবেদনশীল করতে হবে।’
ড. নিগার সুলতানা আরও বলেন, ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দুর্যোগ-পূর্ব ও দুর্যোগ-পরবর্তী প্রস্তুতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষকে আগে থেকেই সচেতন করতে হবে যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস ও পাহাড় কাটা কতটা বিপজ্জনক। মানুষের আস্থা ও সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিই কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।’
ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পাহাড়ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রচারণা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসাইন সময় সংবাদকে বলেন, ‘পাহাড়ধসের ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে আমরা নতুন কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। খুব শিগগিরই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ব্যানার টাঙানো, হ্যান্ডবিল বিতরণ এবং ব্যাপক প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো মানুষকে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আগেভাগেই সচেতন করা, যাতে তারা সতর্ক থাকে এবং প্রয়োজনের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে যেতেও উদ্বুদ্ধ হয়।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের সব পর্যায়ের কর্মকর্তারা মাঠে রয়েছেন। পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে, যাতে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের দ্রুত ও নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন