প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (বিসিসি) ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৬৪৭ কোটি ৫৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩০৯ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে। এই বাজেট নতুন কোনও কর বৃদ্ধি ছাড়াই করা হয়েছে। বাজেটে নগর উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নারী ও শিশু কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, এবং ডিজিটাল নাগরিক সেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিকেলে নগর ভবনে বাজেট ঘোষণার সময় বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন যে, সীমিত রাজস্ব আয়ের মধ্যেও নাগরিক সেবার মান বাড়াতে কর বৃদ্ধি না করেই এ বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি বলেন, "ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিকল্পিত, সবুজ, পরিচ্ছন্ন, নারী ও শিশুবান্ধব স্মার্ট মহানগরী গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।" ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৫২০ কোটি ৮৬ লাখ ১৬ হাজার ৯২৮ টাকা, আর সংশোধিত বাজেট দাঁড়িয়েছে ৪৬২ কোটি ৮৬ লাখ ২২ হাজার ৮৩৭ টাকা।
বাজেটের মধ্যে নগরীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জেলখাল, আমানতগঞ্জ, সাগরদী ও লাকুটিয়া খাল পুনঃখনন এবং খালের পাড় সংরক্ষণ করার জন্য ৭৬৯ কোটি ৪০ লাখ টাকার প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান আশা করা হচ্ছে। তাই একই সঙ্গে কীর্তনখোলা নদীর পশ্চিম তীরে শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ৫৩৩ কোটি টাকার প্রকল্পও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের নতুন উদ্যোগের অধীনে বাজেট বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রূপাতলী সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালু হয়ে গেছে এবং বেলতলা ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালুর প্রস্তুতি চলছে। ভবিষ্যতের পানির চাহিদা পূরণের জন্য কীর্তনখোলা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নতুন পাইপলাইন স্থাপন অব্যাহত রয়েছে। গত অর্থবছরে ১ হাজার ৬৪টি নতুন পানির সংযোগ অনুমোদন করা হয়েছে। নাগরিকদের জন্য নতুন পানি সংযোগের আবেদন থেকে অনুমোদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া এখন অনলাইনে চালু করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে নগরীতে পানির এটিএম বুথ স্থাপনেরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির উপর গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে যে প্রতিদিন সিটি কর্পোরেশন প্রায় ২০০ টন বর্জ্য অপসারণ করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটাও তুলে ধরা হয় যে, গত ঈদুল আজহায় মাত্র ৬ ঘণ্টায় কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে, যা সরকারের নির্ধারিত ১২ ঘণ্টার চেয়ে কম সময়।
নারী, শিশু ও সামাজিক সুরক্ষায় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে নারীদের জন্য আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ মার্কেট, অসচ্ছল নারীদের আইনি সহায়তা, এবং কর্মজীবী নারীদের জন্য হোস্টেল নির্মাণের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। শিশুদের জন্য গ্রীন সিটি পার্ক সংস্কার, নতুন রাইড স্থাপন, খেলাধুলার সরঞ্জাম ক্রয়, এবং বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজনের জন্যও বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগামী অর্থবছরে ৫০ হাজার বৃক্ষরোপণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনে নতুন ফোয়ারা, পার্ক উন্নয়ন, আলোকসজ্জা, এবং "সবার আগে বাংলাদেশ" নামে মানচিত্র ভাস্কর্য নির্মাণের বিষয়গুলিও বাজেটে উঠে এসেছে।
ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে কর আদায়, ট্রেড লাইসেন্স, ভবনের নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবাকে অনলাইনে নিয়ে আসার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসকের মতে, এতে সেবার গতি বৃদ্ধি পাবে এবং হয়রানি কমবে।
সড়ক, ড্রেন ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব গ্রহণের পর ৪২ কিলোমিটার বিটুমিনাস কার্পেটিং সড়ক, ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার আরসিসি সড়ক, ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার সিসি সড়ক, এবং ১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণের তথ্যও বাজেটে তুলে ধরা হয়েছে। নগরীর আলোকায়নে প্রায় ২৪ কোটি ৭৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকার প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে যা অনুমোদন পেলে ১৬ হাজারের বেশি বৈদ্যুতিক খুঁটি ও ২০ হাজারের বেশি নতুন সড়কবাতি স্থাপন করা হবে।
স্বাস্থ্য ও টিকাদান কর্মসূচির আওতায় গত অর্থবছরে ১০ হাজার ৪৭৯ জন নারী ও শিশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়েছে। হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে ৪৩ হাজার ৮৫০ জন, এবং ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইনে ৫৮ হাজার ৫৫৭ জন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগামী অর্থবছর থেকে নগরীর তিনটি জোনে নারী ও শিশুদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
সাংবাদিকদের জন্য বরাদ্দের মধ্যে সাবেক প্রেসক্লাব ও বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির ভবন সংস্কারের জন্যও ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অবশেষে, বাজেট বক্তব্যের শেষের দিকে প্রশাসক উল্লেখ করেন যে, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে নাগরিক সেবার মান উন্নত করবে। তিনি নগরবাসী, সাংবাদিক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এবং সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, "কর বৃদ্ধি না করেও নগরবাসী আগের চেয়ে আরও বেশি নাগরিক সুবিধা পাবেন। আমরা সবাই মিলে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও স্মার্ট বরিশাল গড়ে তুলতে চাই।" উল্লেখ্য, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের এটি ২৪ তম বাজেট। বাজেট ঘোষণার সময়ে নগরীর গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন