প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
দেশের অন্যতম বৃহৎ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) হিসেবে পরিচিত। প্রায় ছয় দশকের পথচলায় শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। তবে, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিভাগের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামো সম্প্রসারণের অভাব দেখা দিয়েছে, যার ফলে আবাসন, শ্রেণিকক্ষসহ বিভিন্ন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণা, আন্তর্জাতিক পরিসরে অবস্থান এবং সময়োপযোগী নতুন বিষয় চালুর ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১তম উপাচার্য হিসেবে ২০২৬ সালের মার্চে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক এবং বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সিনিয়র সহসভাপতি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সমস্যা ও সংকট, দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার পরিস্থিতি, সম্ভাবনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, গবেষণা এবং সরকারের কাছে প্রত্যাশাসহ নানা বিষয়ে আল আরাফের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
আরটিভি: উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়কে কী অবস্থায় পেয়েছিলেন? দায়িত্ব নেওয়ার পর আপনার সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
উপাচার্য: দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম যে বিষয়টি লক্ষ্য করেছি, তা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের গতি। আমার গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করার মতো লোকের অভাব রয়েছে। এর ফলে, আমি যে কোনো সিদ্ধান্ত প্রদান করলে সেটি বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগে। বিশ্লেষণ করে দেখলাম, কাজ না করার যে সংস্কৃতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান, তা আমাদের অনেক সহকর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাদের কাজের স্ট্রিমে ফিরিয়ে আনা ছিল আমার প্রথম চ্যালেঞ্জ।
আরটিভি: বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সমস্যা বা সংকটগুলো কী? বিশেষ করে আবাসন ও অবকাঠামোর পরিস্থিতি কীভাবে দেখছেন?
উপাচার্য: দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো, গত ৯ বছর ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটিও ডিপিপি আসেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবল, শিক্ষক, ছাত্র ও বিভাগের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু উন্নয়নের কাজগুলো হয়নি।
বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো আবাসন সংকট। ছাত্র ও ছাত্রী উভয়ের জন্যই সংকট রয়েছে। নতুন বিষয় বা বিভাগ খোলার জন্য অন্তত পাঁচটি ক্লাসরুম প্রয়োজন। একজন চেয়ারম্যানের জন্য একটি কক্ষ এবং ১০ জন শিক্ষকের জন্য ১০টি কক্ষের ব্যবস্থা করতে হবে। এই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ না করেই বিভাগগুলো খোলা হয়েছে।
আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর বুঝতে পেরেছি, অনেক সহকর্মী ও শিক্ষার্থীর আমার প্রতি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছেন, স্যারের কাছে গেলেই সবকিছু হয়ে যাবে। আসলে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
আরটিভি: তাহলে আবাসন ও অবকাঠামো সংকট নিরসনে কী পরিকল্পনা নিয়েছেন?
উপাচার্য: আমি গত ছয় মাসের মধ্যে দুটি প্রজেক্টকে একত্রিত করতে পেরেছি। প্রথমটি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি নির্মাণ, যা ৬০ বছরে কেউ কখনো চিন্তাও করেনি। আমরা আগামী দুই মাসের মধ্যে টিএসসির কাজ শুরু করতে পারব।
আরেকটি মূল প্রজেক্ট হলো আমাদের ডিপিপি, যেখানে মেয়েদের জন্য একটি হল থাকবে। সেখানে এক হাজার মেয়ে একসঙ্গে থাকতে পারবে। যদি এ বছরের মধ্যে এই দুটি ডিপিপি কার্যকর করতে পারি, তবে পাইপলাইনের মধ্যে আরও অনেক প্রজেক্ট ঢুকিয়ে দেব। শিক্ষার্থী ও বিভাগ বাড়লে আমাদের প্রস্তুতি রাখতে হবে।
আরটিভি: সময়ের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে নতুন বিভাগ বা বিষয় চালুর বিষয়ে কী ভাবছেন?
উপাচার্য: আমাদের নিজস্ব কিছু বিভাগ এখন সময়ের দাবি। আইটি, এআই-বেজড সাবজেক্ট, ডেটা সায়েন্স এই বিষয়গুলো বর্তমানে বুমিং। এগুলো থেকে আমাদের ছাত্রছাত্রীদের দূরে সরিয়ে রাখতে পারি না। ফলে এগুলো সময়ের দাবি।
আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মেডিকেল ফ্যাকাল্টি দরকার, যেখানে আমরা এমবিবিএস ডিগ্রি দেব এবং একটি মেডিকেল ফ্যাসিলিটি থাকবে। এটি এখন সময়ের দাবি, প্রয়োজনের দাবি। এই কাজগুলো করার জন্য আমাদের ডিপিপি প্রয়োজন হবে।
আরটিভি: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাবনার জায়গাগুলো কোথায় দেখছেন? সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
উপাচার্য: বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় একটি সম্ভাবনার জায়গা এবং বিশ্ববিদ্যালয় আসলে সম্ভাবনা তৈরি করে। আমরা সেই সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করেছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা ছাত্র যখন বাইরে যায়, তাদের সঙ্গে যৌথ প্রোগ্রাম করা যায়।
আমি ইতোমধ্যে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স সেল পুনর্গঠন করেছি এবং দক্ষ পরিচালক ও উপপরিচালক নিয়োগ দিয়েছি।
আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় দুঃখ, দেশের অন্যতম বৃহৎ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও যখন ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিং হয়, আমরা দেখি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সেখানে কোনো জায়গায় নেই। এজন্য আমি ইনস্টিটিউশনাল র্যাঙ্কিং সেল গঠন করেছি। ইতোমধ্যে এর পরিচালক এবং সহকারী পরিচালক নিয়োগ করেছি। তারা আগামীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিংয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করবেন।
শুধু তা নয়, আমি যে কাজটা করেছি, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে গবেষণার উর্বর ক্ষেত্র। গবেষণা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন থাকে না। গবেষণার স্পেকট্রাম বাড়াতে, গবেষণার পথ প্রসারিত করতে, আমরা থিসিসের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা করে শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছি।
আরটিভি: দায়িত্ব নেওয়ার সময় আপনি বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার চেয়ে সাড়ে তিনটার বাসের প্রতি বেশি নজর থাকে এবং গবেষণা বাজেটের বড় অংশ ফেরত যায়। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?
উপাচার্য: এমফিল গবেষক দুই বছরের জন্য প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা পাবেন। পিএইচডি গবেষক তিন বছরের জন্য প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা পাবেন। গবেষণা করানোর জন্য সম্মানী রেখেছি।
গত বছর গবেষণার জন্য যে বাজেট পেয়েছিলাম, এ বছর তার চেয়ে প্রায় এক কোটি টাকা বেশি পেয়েছি। অন্যান্য সময়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণার ফান্ড ফেরত গিয়েছে। তবে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ফান্ড ফেরত যাওয়ার তো কথাই নয়। যা পেয়েছি, তার চেয়েও বেশি চাইতে পারি, সেই ব্যবস্থা করছি।
আমরা এমন গবেষণা নিশ্চিত করতে চাই, যা দেশের কল্যাণে সহায়ক হবে। গবেষণা আমাদের ইকোনমিতে, জিডিপিতে যোগ করবে, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করবে। এর জন্য আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণা সহায়তা ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সঙ্গে শিল্প খাতের সংযোগ তৈরিতে কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে?
উপাচার্য: আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি চমৎকার আইডিয়া রয়েছে। এটি বর্তমান সরকারের প্রধান চিন্তার ফল। আমরা ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশন নিশ্চিত করতে চাই। যে দেশে যত বেশি ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক থাকে, সে দেশে গবেষণার ক্ষেত্র তত উন্নত।
সেজন্য আমরা ইতোমধ্যে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সেল গঠন করেছি। পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আগামী মাসের প্রথম দিকে চট্টগ্রামের চেম্বার অব কমার্সের সঙ্গে একটি সমাবেশ করছি। সেখানে আমরা তাদের কীভাবে সাহায্য করতে পারি, তারাও আমাদের সহযোগিতা করতে পারে, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।
আরটিভি: এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের কাছে আপনার চাওয়া বা প্রত্যাশা কী?
উপাচার্য: আমাকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন জিজ্ঞেস করেছেন, ‘ছয় মাস, আপনাদের প্রকল্প কই?’ আমাদের অর্থমন্ত্রী আমাদের জিজ্ঞেস করছেন, ‘আপনাদের প্রকল্প কেন আসছে না?’
সব জায়গা থেকেই আমরা একটি পজিটিভ রেসপন্স পাচ্ছি। অর্থাৎ, যখনই আমাদের প্রকল্পগুলোকে সঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে পারব, তখন সহযোগিতা পাব।
আমাদের অন্যান্য সংসদ সদস্য মহোদয়রাও আমাদের সহযোগিতা করার জন্য মুখিয়ে আছেন। সিনেটে তারা সরাসরি বলেছেন, ‘আপনাদের কী ধরনের সহযোগিতা লাগবে, আমাদের বলুন। প্রয়োজনে আমরা সবাই আপনার সঙ্গে যাব।’
সুতরাং, এটি আমার জন্য বড় ধরনের একটি অনুপ্রেরণা। আমরা আশা করছি, সবার সহযোগিতা নিয়ে আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে যে স্বপ্নটা দেখছি, সেই জায়গায় নিয়ে যেতে পারব।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন