প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এমপি বলেছেন, দেশের বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এক বছরের মধ্যে প্রায় ২০ লাখে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ঢাকায় আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ভার্চুয়ালি ১০টি জেলায় মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিচারাধীন মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে এবং সাধারণ মানুষের জন্য দ্রুত ও সহজলভ্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা (প্রি-ফাইলিং মেডিয়েশন) কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা প্রদান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিভিন্ন জেলার জেলা ও দায়রা জজ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা, আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ ও বিচার বিভাগের কর্মকর্তাসহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নড়াইল, যশোর, ফরিদপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল জেলার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে বিচারকের স্বল্পতার বিপরীতে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, এই বিপুল সংখ্যক মামলার চাপ সুপ্রিম কোর্ট থেকে শুরু করে জেলা ও অধস্তন আদালত পর্যন্ত পুরো বিচারব্যবস্থার ওপর একটি বিরাট বোঝা সৃষ্টি করেছে। তাই প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। তিনি জানান, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে পরিচালিত পাইলট কার্যক্রমে অত্যন্ত ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে পারিবারিক আদালত আইনে ২০২৫ সালের একই সময়ে যেখানে ৩ হাজার ৫৫৯টি মামলা দায়ের হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালের একই সময়ে মামলা নেমে এসেছে ১ হাজার ৭৪৪টিতে। অর্থাৎ মামলার সংখ্যা প্রায় ৫১ শতাংশ কমেছে। একইভাবে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা ২৪টি থেকে কমে ১৮টিতে নেমেছে এবং সিভিল জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বণ্টনসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ২ হাজার ১টি থেকে কমে ৬৬১টিতে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ৬৭ শতাংশ হ্রাস। স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি আইনের প্রি-এম্পশন সংক্রান্ত মামলা ১৭টি থেকে কমে মাত্র ২টিতে এসেছে, যা ৮৮ দশমিক ২৪ শতাংশ হ্রাসের নজির সৃষ্টি করেছে। আইনমন্ত্রী আরো উল্লেখ করেন, নন-অ্যাগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইনের মামলায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস ও পিতামাতার ভরণপোষণ আইনের মামলায় প্রায় ১৯ শতাংশ হ্রাসের তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বিশেষভাবে স্ত্রীদের প্রতি যৌতুক নিরোধ আইনে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলেও জানায়। আইনমন্ত্রী বলেন, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে যেখানে ৫ হাজার ৬০৫টি মামলা দায়ের হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালের একই সময়ে মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮১০টিতে। অর্থাৎ ৬৭ দশমিক ৭১ শতাংশ মামলা কমেছে, যা বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রমের কার্যকারিতার একটি বড় প্রমাণ। মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন আইনে গড়ে ৬২ দশমিক ২ শতাংশ মামলা হ্রাস পাওয়া গেছে। এটি বিচারব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে এবং আরও বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে প্রতিদিন নতুন করে যে বিপুলসংখ্যক মামলা আদালতে জমা হচ্ছে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। আইনমন্ত্রী বিচারকদের উদ্দেশ্যে বলেন, যেসব মামলায় আপস-মীমাংসার সুযোগ রয়েছে, সেগুলোকে প্রাথমিক পর্যায়েই মধ্যস্থতার জন্য জেলা লিগ্যাল এইড অফিস কিংবা অনুমোদিত মধ্যস্থতাকারীদের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এ সময় তিনি আরো বলেন, আদালতে মামলা দায়েরের পরও যদি সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা যায়, তাহলে বিচারপ্রার্থী জনগণের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে। মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, মামলা দায়েরের আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির পাশাপাশি বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যেও কার্যকর মধ্যস্থতা চালানো গেলে আগামী এক বছরের মধ্যে বর্তমানে বিচারাধীন প্রায় সাড়ে ৪৫ লাখ মামলা ২০ লাখে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মামলার পরিচালনার কারণে সাধারণ মানুষ শুধু মানসিকভাবেই নয়, অর্থনৈতিকভাবেও তারা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা প্রদান অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত এই মধ্যস্থতা কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে আরও বেশি সচেতন করতে হবে। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এই সেবা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ যত বেশি জানবে, তত বেশি মানুষ আদালতের বাইরে আইনি উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ গ্রহণ করবে। আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধুমাত্র মামলাই কমাতে চায় না, সরকার অসহায়, দরিদ্র ও বিচারপ্রার্থী মানুষের পাশেও দাঁড়াতে চায়। তাদের ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। তাই গণমাধ্যমকে এই জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের ব্যাপক প্রচারে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি কক্সবাজার জেলার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে সেখানে এক লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যা উদ্বেগজনক। এ সময় আইনমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট জেলা জজ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখানোর আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা প্রদান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুরুল হোসেন বলেন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুত ও কম খরচে ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর মাধ্যম। তিনি আরও বলেন, মাননীয় আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে আজ দেশের ১০ জেলায় বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হওয়া বিচারব্যবস্থার জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। মো. মনজুরুল হোসেন বলেন, অতীতে অনেক প্রকল্প পরীক্ষামূলক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থেকেছে। কিন্তু বর্তমান উদ্যোগের ইতিবাচক ফলাফল বিশ্লেষণ করে, সরকার দ্রুত এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এতে আদালতের ওপর মামলার চাপ কমবে এবং সাধারণ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি মামলা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাবে। মহাপরিচালক আরও বলেন, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা প্রদান অধিদপ্তর বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে দ্রুত, সুষম ও টেকসই বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে। জেলা জজ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের আন্তরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই কার্যক্রম আরও সফল হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নড়াইল, যশোর, ফরিদপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল— এই ১০ জেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন