প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
আধুনিক নগরজীবনে দ্রুতগতির যান্ত্রিক যানবাহনের ভিড়েও পুরান ঢাকার রাস্তায় এখনো দেখা মেলে দেড় শতকের ঐতিহ্য বহনকারী টমটম বা ঘোড়ার গাড়ির। একসময় এটি ছিল অভিজাতদের আভিজাত্যের প্রতীক এবং নগর পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম। তবে সময়ের পরিবর্তনে বর্তমানে টমটম মূলত ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন প্রয়োজনে যেমন দৌড়ানোর পরিমাণ কমে গেছে, তেমনি শখ, বিনোদন কিংবা বিশেষ আয়োজনের জন্য এখন এর ব্যবহার বেশি দেখা যায়।
বর্তমানে সদরঘাট-গুলিস্তান রুটেই টমটম চলাচলের মূল স্থান। কিন্তু যানজট এবং দ্রুতগতির গণপরিবহনের বিস্তার, ঘোড়া রক্ষণাবেক্ষণের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এ ঐতিহ্যবাহী বাহনকে টিকিয়ে রাখা দিন দিন কঠিন করে তুলছে।
ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৫৬ সালের দিকে পুরান ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয়। সেসময় এই বাহনটি ‘ঠিকা গাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল। নবাব, জমিদার ও অভিজাতরা মর্যাদার প্রতীক হিসেবে এই বাহনটি ব্যবহার করতেন, পাশাপাশি এটি ছিল পণ্য পরিবহনের একটি মাধ্যম। একসময় ঢাকা নগরীর অন্যতম গণপরিবহন হলেও আজ টমটম প্রায় বিলুপ্তির পথে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি টমটম তৈরি করতে, কারুকাজ এবং দুটি ঘোড়া কিনতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়। অনেক ক্ষেত্রে খরচ আরো বেশি। একটি টমটমের মধ্যে সাধারণত ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী বসতে পারেন। তবে যাত্রী নিয়ে পিচঢালা সড়কে গাড়ি টানতে ঘোড়াগুলোকে যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক টমটম রক্ষণাবেক্ষণকারী সমকালকে জানিয়েছেন, একসময় ঢাকার বিভিন্ন রুটে প্রায় ৩৬০টি টমটম চলাচল করত। কিন্তু বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৫ থেকে ২৬টিতে। প্রতিটি গাড়ির আলাদা নম্বর রয়েছে।
তিনি বলেন, 'ঘোড়ার খাবারসহ রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। আগের মতো লাভ নেই। এখন ব্যবসার জন্য নয়, মূলত পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্যই টমটম চালিয়ে যাচ্ছি।'
তার ভাষ্য, বর্তমানে সাধারণ যাত্রী পরিবহনের চেয়ে বিয়ে, সুন্নতে খাতনা, চলচ্চিত্র ও নাটকের শুটিংসহ বিভিন্ন আয়োজনেই টমটমের চাহিদা বেশি। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানান তিনি।
এক কোচোয়ান মিজান জানান, তারা মালিকের কাছ থেকে দৈনিক মজুরিতে টমটম চালান। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ঘোড়ার খাবার, পরিচর্যা ও গাড়ি মেরামতের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু সে তুলনায় তাদের আয় বৃদ্ধি পায়নি।
তিনি বলেন, 'প্রতিদিন ঘোড়ার খাবার, পরিচর্যা আর গাড়ি মেরামতেই অনেক খরচ হয়। মালিকেরা আমাদের বেতন বাড়াতে পারছেন না।' ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ঘোড়া রাখার জন্য পর্যাপ্ত আস্তাবলের অভাবও বড় সমস্যা বলে জানান তিনি।
রায়সাহেব বাজার এলাকায় হৃদয় বেগ নামের এক টমটম আরোহীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে শখের বশে টমটমে চড়তে এসেছেন। তিনি বলেন, 'রায়সাহেব বাজার থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত বাসভাড়া মাত্র ১০ টাকা। কিন্তু টমটমে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। তবুও সন্তানদের পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই এই অভিজ্ঞতা নিতে এসেছি।'
তবে টমটমকে ঘিরে ভিন্ন মতও রয়েছে। ধীরগতির এই বাহন অনেক সময় ব্যস্ত সময়ে যানজট বাড়ায় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া তীব্র হর্ন ও যান্ত্রিক কোলাহলে ঘোড়া নিয়ন্ত্রণ হারালে পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের জন্য ঝুঁকির সৃষ্টি হতে পারে।
পুরান ঢাকার প্রবীণ বাসিন্দা হাজী জলিল বলেছেন, 'টমটম আমাদের পুরান ঢাকার ঐতিহ্য। কিন্তু এখন এত যান্ত্রিক গাড়ির ভিড়ে এটি চলাচল করলে অনেক সময় যানজটও তৈরি হয়।'
ঐতিহ্য আর আধুনিক নগরবাস্তবতার টানাপোড়েনে টমটম আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পনা না থাকলে পুরান ঢাকার এই ঐতিহ্য হয়তো একসময় ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন