প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে ড্রেন তৈরি হয়েছে। বিপুল অর্থ রক্ষণাবেক্ষণেও ব্যয় করা হচ্ছে। অথচ সামান্য বৃষ্টিতে যে দেশের প্রথম শ্রেণির পৌরসভা যশোর, সেটি ডুবছে।
জানা যায়, শহরের বিভিন্ন সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। পরিকল্পনার ঘাটতি, অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ এবং খাল-ড্রেন সংযোগের দুর্বলতায় প্রতি বছরই একই ভোগান্তির পুনরাবৃত্তি ঘটছে, এমন অভিযোগ এলাকাবাসীর।
পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সারিয়ে তোলা হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যশোর দেশের প্রাচীন ও প্রথম শ্রেণির পৌরসভা। এ পৌরসভার পানি নিষ্কাশনে ৯টি ওয়ার্ডে মোট ড্রেনের দৈর্ঘ্য ২৫১ দশমিক ৯৬ কিলোমিটার। এসব ড্রেনের প্রায় অর্ধেক শত কোটি টাকা ব্যয়ে পাকা করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা কমাতে পাশাপাশি ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে দুই কোটির অধিক বরাদ্দ থাকে। বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় হলেও যশোর পৌরসভার বাসিন্দাদের মধ্যে কোনো স্বস্তি নেই। সামান্য বৃষ্টিতে শহরের বিভিন্ন সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় পানি জমে যেতে দেখা যায় জলাবদ্ধতা।
বিশেষ করে ৫ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ঘরে এবং বাইরে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় তাদের জীবন বিষিয়ে উঠছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ হলো, প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও পরিকল্পনার ঘাটতি, অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ এবং খাল-ড্রেন সংযোগের দুর্বলতায় প্রতি বছর একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এর ফলে মানসিক ও অর্থনৈতিক দুইভাবেই ক্ষতির শিকার হচ্ছেন তারা।
শহরের শংকরপুর এলাকার বাসিন্দা অপু আহমেদ বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টি হলেই আমাদের এলাকায় পানি জমে যায়। পুরো শহরের পানি ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্য দিয়ে হরিণার বিলের দিকে যায়। মাঝখানে একটি দীর্ঘ রেললাইন রয়েছে। সেখানে ছোট দুটি রেল কালভার্ট আছে, তবে তা দিয়ে পর্যাপ্ত পানি বের হয় না। তারপরে রয়েছে মহাসড়ক, যেখানে মাত্র একটি কালভার্ট। ফলে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। তার সঙ্গে পানি নিষ্কাশনের ড্রেনগুলো ঠিকমত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয় না। বছরে দুই থেকে তিনবার যদি ড্রেন পরিষ্কার করা হয়, তাহলে জলাবদ্ধতা কমে যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন পানি জমে চরম ভোগান্তি বাড়ছে। ঘরের ভেতরে ময়লা পানি জমে রয়েছে, বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাড়ি থেকে বের হতে পারছি না। বাড়ির বাচ্চাসহ সবাই ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও পরিকল্পনার অভাবে তা কাজে আসছে না।’
শহরের টিবি ক্লিনিক এলাকার বাসিন্দা শাহিন হোসেন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় অপেক্ষাকৃত নিচু। দুই দশক ধরে আমরা বর্ষার সময় জলাবদ্ধতার শিকার। বৃষ্টি হলেই ড্রেনের পানি উপচে সড়ক ও বাড়ি ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ আমাদের ময়লা পানির মধ্যে থাকতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘এ জলাবদ্ধতার একটাই কারণ, তা হলো ড্রেনেজ ব্যবস্থা। শহরের ড্রেনগুলো ভৈরব নদীর দিকে মুখ না করে হরিণার বিলমুখী করা হয়েছে। বিলের পাশ দিয়ে বাইপাস মহাসড়ক, বিলের ভিতর বাসস্ট্যান্ড, মেডিকেল কলেজ, বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। ফলে ড্রেনের পানি বিলে নামতে পারছে না। এছাড়া ড্রেন অপ্রশস্ত ও অগভীর হওয়ায় তা উপচে পানি সড়ক ও বাড়ি ঘরে ঢুকে পড়ছে। এসব সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ না নিয়ে প্রতিবছর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার নামে কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে; যা কোনো কাজে আসছে না। এজন্য পৌর কর্তৃপক্ষকে নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে।’
বেজপাড়া আনসার ক্যাম্প এলাকার বাসিন্দা জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, ‘বর্তমানে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের অধিকাংশ ঘরে পানি জমে আছে। ড্রেন থেকে পানি ক্লিয়ার হচ্ছে না, জ্যাম হয়ে রয়েছে। পানি নিষ্কাশনের স্থান নির্মাণ না করেই কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা ড্রেন তৈরি করা বা পরিষ্কার করানোর মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। এটা হচ্ছে সেই ‘গাড়ির আগে ঘোড়াজুড়ে দেয়ার’ মতো অবস্থা। আমরা বৃষ্টিতে কী অবস্থায় আছি, তা দেখতে পারছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের শহরের বুকের ওপর দিয়ে একটি নদী এবং আমাদের বগলের তলা দিয়ে আরেকটি নদী ভৈরব ও মুক্তেশ্বরী গেছে। আমাদের পানি ভৈরব-মুক্তেশ্বরীতে গিয়ে পড়বে, সেই যাওয়ার জায়গাটা তৈরি করতে হবে। নদী দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে।’
জিল্লুর রহমান ভিটু আরও বলেন, ‘পাশাপাশি আরেকটি কাজ রয়েছে—নাগরিকদের সচেতন করার উদ্যোগ দরকার। আমরা দেখি অনেকে ড্রেনের মধ্যে ময়লাটা ফেলে দিচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে। এর জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যদি এর জন্য অর্থ ব্যয় করতে হয়, তাহলে পরিকল্পিতভাবে নাগরিকদের সচেতন করতে হবে। কিন্তু পৌরসভা থেকে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।’
এ সময় পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. রফিকুল হাসান দাবী করেছেন, পানি নিষ্কাশনের জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারা আশ্বাস দিয়েছেন অল্প সময়ের মধ্যে পানি নেমে যাবে। ফলে এই বছর জলাবদ্ধতা কম হবে। শহরের যেসব এলাকায় বেশি জলাবদ্ধতা হচ্ছে, সেগুলো এরই মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। মূলত শহরের পানি হরিণার বিল হয়ে মুক্তেশ্বরী নদীতে যায়। পৌরসভার সীমানা শেষে জমির মালিকরা তাদের জমিতে পানি প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন।
তিনি জানান, অনেক স্থানে মাটি ফেলে উঁচু করা হয়েছে। মুক্তেশ্বরী নদীতে পানি নিতে হলে জমি অধিগ্রহণ করা জরুরি। কিংবা মহাসড়কের পাশ দিয়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করে ভৈরব নদীতে নিতে হবে; যা ব্যয় বহুল। স্থানীয় এমপি ও প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। সরকার থেকে বরাদ্দ পেলে পর্যায়ক্রমে এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা হবে।
প্রসঙ্গত, যশোর পৌরসভায় ১৪ দশমিক ৭২ বর্গ কিলোমিটার আয়তনে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের বসবাস। নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার এই ত্রুটি দ্রুত দূর করার দাবিতে রয়েছে নগরবাসী।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন