প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক, যা গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান মাধ্যম, মুখ থুবড়ে পড়েছে।
বরিশাল বিভাগের এক হাজারের বেশি ক্লিনিক বর্তমানে বেহাল দশা বরণ করছে। কোথাও জরাজীর্ণ ভবন রয়েছে এবং কোথাও আবার ঝোপঝাড়ে বিষধর সাপ বাসা বেঁধেছে। এছাড়া এখানে ন্যূনতম তদারকির অভাব ও ওষুধ সংকট প্রতিদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার সরকারি এই উদ্যোগটি সম্পূর্ণ ভেস্তে যেতে বসেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, বরিশাল বিভাগে মোট কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা ১ হাজার ১১৭টি। তবে এই সংখ্যা থেকে একটি বৃহৎ অংশ বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সরকারি নথিতে এগুলোর অধিকাংশই সচল হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।
সরেজমিনে দেখা যায়, বরিশাল নগরীর কাশিপুরের ইছাকাঠি কমিউনিটি ক্লিনিকটি পরিত্যক্ত ভবনের মতো ভেঙে পড়েছে। এর ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, বৃষ্টি হলে পানির কারণে সমস্যা দেখা দেয় এবং মাসের পর মাস বিদ্যুৎ নেই। সেই সাথে ওষুধের সংকট মোকাবেলা করেই এখানে স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখা হয়েছে।
ইছাকাঠি এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ‘সরকারের উদ্দেশ্য ছিল সুবিধা দেয়া, ঘরের কাছে চিকিৎসা পাওয়া। কিন্তু এখানে আসলে ছোটখাটো দুই-একটা বড়ি ছাড়া কোনো ওষুধ পাওয়া যায় না। ভাঙাচোরা ঘরে ঝুঁকি নিয়ে বসতে হয়। সেবা নিতে এসে উল্টো ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’
অন্যদিকে একই এলাকার ভুক্তভোগী নারী মোসাম্মৎ রেহানা বেগম বলেন, ‘বাচ্চাটাকে নিয়ে আমি কাশির ওষুধ আর পরামর্শের জন্য এখানে এসেছিলাম। ডাক্তার (সিএইচসিপি) তো বসেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র নেই। বেশির ভাগ ওষুধই আমাদের বাইরে থেকে কিনতে হয়। ক্লিনিক এখন নামেই আছে, কাজে নেই।’
ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের করুয়াকাঠি কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। মাত্র কয়েক মাস আগে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অফিসে বিষধর সাপ বেরিয়ে আসলে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বাথরুম, মেঝেসহ ক্লিনিকের বিভিন্ন স্থানে সাপের বাসার সন্ধান মেলে। সেই সাপের আতঙ্ক এখনও কাটেনি। করুয়াকাঠি কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) মারজিয়া খানম এ নিয়ে বলেন, ‘এখানে কাজ করা এখন জীবনযাপনের ঝুঁকি নিয়ে। অফিসের মধ্যে কখন কোথা থেকে সাপ বেরিয়ে আসে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়। বর্তমানে সেবা দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
বিশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ঝালকাঠির ৯৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের অধিকাংশই একই সমস্যা বরণ করছে। গ্রামের বনজঙ্গল ঘেরা নিচু জমিতে এই ক্লিনিকগুলো নির্মাণের পর আর কোনো বড় ধরনের সংস্কার করা হয়নি। ফলে সাপের আতঙ্ক এবং ঝোপঝাড়ের মধ্যেই গ্রামীণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবা মিলছে।
এদিকে বরগুনা জেলার পরিস্থিতি আরও হতাশাজনক। শনিবার (৪ জুলাই) সকাল হয়ে দুপুর হলেও সদর উপজেলার খাজুরতলা কমিউনিটি ক্লিনিক তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা জানান, ‘কোনো প্রকার তদারকি না থাকায় সিএইচসিপি সঙ্গীতা ইচ্ছামতো ক্লিনিক খুলে এবং বন্ধ করেন।’ একই অবস্থা পার্শ্ববর্তী বদরখালী ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকেরও। গত বৃহস্পতিবারও বন্ধ ছিল এই ক্লিনিকটি। এতে করে চিকিৎসাসেবা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
অনিয়মিত ক্লিনিক খোলার বিষয়ে খাজুরতলা কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি সঙ্গীতা জানিয়েছেন, ‘ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কিছু জরুরি সমস্যা থাকার কারণে মাঝে মাঝে ক্লিনিকে পৌঁছাতে দেরি হয়। তবে নিয়মিত সেবা দেয়ার চেষ্টা করি। স্থানীয়দের অভিযোগ পুরোপুরি সঠিক নয়।’
করপক্ষের আশ্বাস নিয়ে বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মো. আবুল ফাত্তাহ বলেন, ‘জেলায় যে সকল কমিউনিটি ক্লিনিক জরাজীর্ণ তাদের মধ্যে কিছু সংস্কার করা হয়েছে বেসরকারি এনজিওগুলোর মাধ্যমে।’ তিনি জানান, দায়িত্ব অবহেলার বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে। ঝালকাঠির সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হুমায়ূন কবির বলেন, ‘ঝালকাঠির বেশ কয়েকটি ক্লিনিকের ভবন জরাজীর্ণ এবং নিচু এলাকায় হওয়ায় কিছু সমস্যা হচ্ছে। জরাজীর্ণ ক্লিনিকগুলো দ্রুত সংস্কার ও ওষুধ সরবরাহ বাড়ানোর জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানিয়েছি। আশা করছি দ্রুতই বরাদ্দ আসবে।’ বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম বলেন, ‘অনেক জায়গায় সমস্যা বিদ্যমান। তবে সেবার মান বাড়ানোর জন্য সরকারের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রামীণ জনপদের স্বাস্থ্যসেবা যাতে কোনোভাবে ভেস্তে না যায়, সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন